বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও জনবান্ধব ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম ও ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ-সদস্য আবদুল বাতেনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, জনগণের জানমাল রক্ষা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনকে দল-মত নির্বিশেষে শান্তি, শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, নায়েবে আমির আবদুর রহমান মুসা এবং উভয় আসনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা।
সভায় ঢাকা-১৪ ও ঢাকা-১৬ নির্বাচনি এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নাগরিকদের নিরাপত্তা, মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধ এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। জাতীয় সংসদ-সদস্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিরা মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা তুলে ধরেন। সভায় ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম ও আবদুল বাতেন এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি অপরাধ দমনে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জনগণের সহযোগিতা কামনা করেন এবং চলমান বিশেষ অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের বিষয়ে অবহিত করেন।
২৯ মিন্টো রোডের বাসায় উঠছেন জামায়াত আমির
দুই যুগ ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে ছিল লাল রঙের বাড়িটি * ২৫ বছর ধরে এখানে কোনো বিরোধীদলীয় নেতা বসবাস করেননি।
অবশেষে প্রাণ ফিরতে যাচ্ছে রাজধানীর মিন্টো রোডের বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবন হিসাবে পরিচিত ২৯ নম্বরের বাড়িটিতে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এই বাড়িতে উঠছেন। ইতোমধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তার নামে এই বাসভবন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখন জোরেশোরে চলছে বাড়িটির মেরামত ও সংস্কারসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাজ।
ব্রিটিশ আমলে প্রায় আড়াই একর জায়গার ওপর এই বাড়িটি নির্মিত হয়। এটি মূলত একটি দোতলা লাল রঙের ভবন; যা ‘লাল বাড়ি’ নামে পরিচিত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক স্থান হিসাবে পরিচিত। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এই বাড়িতে উঠেছিলেন। এরপর ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত এখানেই নিয়মিত অফিস করেছেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বাড়িটি তখন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে সরগরম থাকত। মানুষের যাতায়াতে প্রাণবন্ত থাকত চারপাশ। ২০০১ সালে তিনি বাসাটি ছেড়ে দেওয়ার পর ২৫ বছর ধরে এখানে কোনো বিরোধীদলীয় নেতা বসবাস করেননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এই বাসভবন বিরোধী দলের নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নামে ইতোমধ্যে বরাদ্দ দিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। যথাযথ নিয়মে তারা এরই মধ্যে ভবনটির মেরামত এবং সংস্কারের কাজ জোরেশোরে চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন কেউ না থাকায় বাসভবনটি অনেকটাই জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পূর্ত মন্ত্রণালয় দাবি করছে, বিরোধীদলীয় নেতার বসবাসের মতো উপযোগী করতে এখনো তাদের এক থেকে দেড় মাস সময় লাগতে পারে।
বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন প্রকৌশলী নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, এই বাড়িটির প্রায় নব্বই ভাগ কাজ সম্পূর্ণ করা আছে। এখন রাস্তার অংশ আর রঙের ফিনিশিং কাজ চলছে। আসবাবপত্র দেওয়া হবে যিনি থাকবেন তার চাহিদার ওপর। তিনি আরও বলেন, গত ২৫ বছর এই বাসভবনে কেউ থাকেননি। এবার যদি কেউ থাকেন তার সঙ্গে কথা বলে এবং সর্বোচ্চ এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে সব কাজ শেষ করার চেষ্টা চলবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বাড়িটি ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোটের আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল। বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাসহ জোটের শীর্ষ নেতারা এখানে অসংখ্যবার বৈঠক করেছেন। গত ২৫ বছরে কেউ না উঠলেও এবার জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিরোধীদলীয় নেতা হিসাবে এখানে উঠবেন বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও দলটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর একজন শীর্ষ নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, তাদের দলের আমির বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি শপথের পর এবং আগে বলেছেন জামায়াত ইতিবাচক রাজনীতি করবে। যেহেতু বাড়িটি বিরোধীদলীয় নেতার জন্য বরাদ্দ তাই সেখানে তিনি উঠতে পারেন এমনটি ধারণা করা যায়। তবে এখন পর্যন্ত দলীয়ভাবে বা আমিরের পক্ষ থেকে ওই বাড়িতে ওঠার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সংসদ সচিবালয় বা সরকার নিয়ম অনুসারেই বিরোধীদলীয় নেতার জন্য ২৯ মিন্টো রোডের বাড়ি বরাদ্দ দিয়েছেন। ওই বাড়িতে তিনি উঠবেন কিনা বা উঠলে কবে নাগাদ উঠবেন তা এখনো ঠিক হয়নি। এ ব্যাপারে দলের কোনো ফোরামে এখন পর্যন্ত আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, সংসদ তো এখনো বসেনি। অধিবেশন শুরু হোক, তখন আমরা দলীয় নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা করে জানাব।
গৃহায়ন গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান বেগম রওশন এরশাদ বাড়িটি বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিলেন। তবে তখন তার নামে বাড়িটি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। পরে ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাড়িটি তার নামে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিলে তার নামেও বাড়িটি তখন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
সবশেষ গত ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বাড়িটি বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিলেন। তার নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের কারণে জিএম কাদেরের আর এই বাড়িতে ওঠা হয়নি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে মূলত সরকারি কর্মকর্তাদের কথা ভেবেই এই বাসভবন তৈরি করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একসময় এটি জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার জন্য নির্ধারণ করা হয়। তবে দীর্ঘদিন কেউ না থাকায় বাসভবনটি এখন অনেকটাই জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। একটি নিভৃত বাসভবন হিসাবে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে মন্ত্রিপাড়াখ্যাত মিন্টো রোডের এই বাড়িটি। দুই দশকের বেশি সময় ধরে অব্যবহৃত থাকা এই বাসভবনের আশপাশে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, ডিএমপি কমিশনার, একজন বিচারপতি, একজন নির্বাচন কমিশনার, পররাষ্ট্র সচিব, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) বাসভবন রয়েছে।





