ইরানের দুর্বল অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ বৃহস্পতিবার দেশটির গ্রামীণ প্রদেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন।
রাজধানী তেহরানে বিক্ষোভের গতি কিছুটা কমলেও দেশের অন্যান্য এলাকায় তা বিস্তৃত হয়েছে। বুধবার একজন এবং বৃহস্পতিবার পাঁচজন নিহত হন।
নিহতদের ঘটনাগুলো ঘটেছে তিনটি শহরে, যেগুলো মূলত ইরানের লুর জাতিগোষ্ঠীর অধ্যুষিত এলাকা।
আধা-সরকারি ফার্স সংবাদ সংস্থা জানায়, সেখানে তিনজন নিহত হয়েছেন। অন্যান্য গণমাধ্যম, বিশেষ করে সংস্কারপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো, ফার্সের বরাত দিয়ে এ খবর প্রকাশ করলেও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো আজনা বা অন্য কোথাও সহিংসতার বিষয়টি পুরোপুরি স্বীকার করেনি।
চাহারমাহাল ও বাখতিয়ারি প্রদেশের লর্ডেগান শহরে অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় জড়ো হয়েছেন এবং পেছনে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। ভিডিওগুলোর দৃশ্য লর্ডেগানের পরিচিত স্থানের সঙ্গে মিলে যায়, যা তেহরান থেকে প্রায় ৪৭০ কিলোমিটার (২৯০ মাইল) দক্ষিণে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘আব্দুররহমান বরৌমান্দ সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান’ জানায়, সেখানে দুইজন নিহত হয়েছেন এবং তারা বিক্ষোভকারী ছিলেন বলে সংস্থাটি দাবি করে। সংস্থাটি আরও একটি স্থিরচিত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে বডি আর্মার পরা ও শটগান হাতে এক ইরানি পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়।
বুধবার রাতে আলাদা একটি বিক্ষোভে আধাসামরিক বিপ্লবী গার্ডের বাসিজ বাহিনীর ২১ বছর বয়সী এক স্বেচ্ছাসেবকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা ওই গার্ড সদস্যের মৃত্যুর খবর দিলেও বিস্তারিত জানায়নি। বাসিজের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ‘স্টুডেন্ট নিউজ নেটওয়ার্ক’ নামের একটি ইরানি সংবাদ সংস্থা লোরেস্তান প্রদেশের উপ-গভর্নর সাইয়্যেদ পুরালির বক্তব্য উদ্ধৃত করে সরাসরি বিক্ষোভকারীদের দায়ী করেছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই গার্ড সদস্য জনশৃঙ্খলা রক্ষার সময় এই শহরের বিক্ষোভে দাঙ্গাকারীদের হাতে শহীদ হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ১৩ জন বাসিজ সদস্য ও পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।
পুরালি বলেন, যে বিক্ষোভগুলো হয়েছে, সেগুলো অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার ওঠানামার কারণে এবং তা মানুষের জীবনযাত্রা-সংক্রান্ত উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ। নাগরিকদের কণ্ঠস্বর সতর্কতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে শোনা উচিত, কিন্তু মানুষ যেন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে তাদের দাবি বিকৃত হতে না দেয়।
এই বিক্ষোভটি হয়েছে কুহদাশত শহরে, যা তেহরান থেকে ৪০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। স্থানীয় কৌঁসুলি কাজেম নাজারি জানান, বিক্ষোভের পর ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং শহরে পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে। বিচার বিভাগের সংবাদ সংস্থা মিজান এ তথ্য জানিয়েছে।
মুদ্রার পতনে বিক্ষোভ
সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বাধীন ইরানের বেসামরিক সরকার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছার ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে পেজেশকিয়ান স্বীকার করেছেন, তার করার মতো খুব বেশি কিছু নেই, কারণ ইরানের রিয়াল দ্রুত অবমূল্যায়িত হয়েছে। বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের দাম প্রায় ১৪ লাখ রিয়াল।
এদিকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আলাদাভাবে জানায়, সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে পাঁচজনকে রাজতন্ত্রপন্থী এবং আরও দুজনকে ইউরোপভিত্তিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টিভি আরও জানায়, অন্য এক অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনী ১০০টি চোরাচালান করা পিস্তল জব্দ করেছে, তবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
ইরানের সরকার বুধবার দেশটির বড় একটি অংশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। তারা শীতের আবহাওয়ার কথা বললেও ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘ ছুটির সুযোগ দিয়ে মানুষকে রাজধানী তেহরান থেকে বাইরে পাঠানোর উদ্দেশ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ইরানে সাপ্তাহিক ছুটি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার। আর শনিবার ইমাম আলীর জন্মদিন, যা অনেকের জন্য আরেকটি সরকারি ছুটি।
অর্থনৈতিক ইস্যু থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভে বিক্ষোভকারীরা ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধেও স্লোগান দিচ্ছেন। জুন মাসে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই দেশটির নেতারা চাপে রয়েছেন। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
ইরান জানিয়েছে, তারা দেশের কোনো স্থাপনাতেই আর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে না—পশ্চিমাদের কাছে আলোচনার দরজা খোলা আছে এমন বার্তা দিতে চেয়েই এই অবস্থান। তবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সম্ভাব্য আলোচনা এখনো শুরু হয়নি। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তেহরানকে আবার পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে সতর্ক করে দিয়েছেন।




