বিশ্বকে বদলে দিচ্ছে এআই। সেই চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের সামনেও। ঝুঁকি ও বাস্তবতা নিয়ে তিন পর্বের বিশেষ প্রতিবেদনের দ্বিতীয় কিস্তি।
একটি পোশাক কারখানার উৎপাদন বিভাগে কাজ করেন মো. আলাউদ্দিন আলাল। আগে তিনি হাতে চালানো মেশিনে কাজ করতেন। তখন কাজের চাপ ছিল অনেক বেশি। দীর্ঘ সময় কাজ করতে গিয়ে শরীরে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছিল।
পরে কারখানায় স্বয়ংক্রিয় বা অটো মেশিন চালু হলে পরিস্থিতি বদলায়। কাজের চাপ কমে আসে। আগের মত শারীরিক পরিশ্রমও আর করতে হয় না।
আলাল বলেন, এখন তার স্বাস্থ্য ভালো থাকে। সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া বাড়তি বিশ্রামের দরকার পড়ে না।
তিনি জানান, আগে ২০০টি ম্যানুয়াল মেশিন চালাতে ২০০ জন শ্রমিক লাগত। এখন একই কারখানায় ৫০০টি অটোমেটেড মেশিন বসানো হয়েছে। কিন্তু একজন শ্রমিক একসঙ্গে একাধিক মেশিন চালাতে পারায় শ্রমিকের সংখ্যা কমেনি। বরং কিছু ক্ষেত্রে আরও লোকবল লাগছে।
তার ভাষায়, অটোমেশন চাকরি কেড়ে নেয়নি। বরং কাজের পরিবেশ ভালো করেছে, উৎপাদন বাড়িয়েছে এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো হয়েছে।
তবে এই অভিজ্ঞতার উল্টো চিত্রও আছে। বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বেশি মানুষ কাজ করেন পোশাক খাতে। কিন্তু এই খাতে নতুন নিয়োগ এখন প্রায় বন্ধ। কারণ, আধুনিক অনেক মেশিন আছে, যেগুলোতে কম লোক দিয়েই বেশি উৎপাদন করা যায়।
এ ধরনের প্রযুক্তির ফলে ভবিষ্যতে চাকরি বা কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ার ঝুঁকি দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
চ্যালেঞ্জ বদলে গেছে
কৃষি ও ব্যাংকিং খাতে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে যেমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, তেমনি প্রস্তুতির ঘাটতি থাকায় ঝুঁকিও রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা ও ঝুঁকি একসঙ্গে সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায় তৈরি পোশাক খাতে।
দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে এই শিল্প থেকে। তাই এখানে এআই ব্যবহারের সুযোগ যেমন বেশি, তেমনি প্রস্তুতি না থাকলে ঝুঁকিটাও বড়।
টেক্সটাইল ও পোশাক খাতে অটোমেশন নতুন কিছু নয়। এক দশকের বেশি সময় ধরে আধুনিক মেশিন ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। ক্রেতারা ভালো মানের পণ্য চান। টেকসই উৎপাদন চান। ক্রয়াদেশের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার চাপও বেড়েছে। তাই শুধু মেশিন থাকলেই হবে না, এখন দরকার এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর দ্রুত এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত।
দেশের কিছু আধুনিক কারখানায় এআই দিয়ে কাপড়ের ত্রুটি ধরা হচ্ছে। মেশিন কখন নষ্ট হতে পারে, সেই আভাসও আগেই মিলছে। তাতে অপচয় কমছে; ‘রিওয়ার্ক’ কম হচ্ছে; পণ্যের মান ভালো হচ্ছে। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা বাড়ছে। ক্রয়াদেশ ও আয় দুটোই বাড়ছে।
নতুন ডিজাইন তৈরিতেও এআই কাজে আসছে। ফ্যাশনের নতুন ট্রেন্ড, আগের অর্ডার আর ক্রেতার পছন্দ বিশ্লেষণ করে দ্রুত নতুন নকশা বানানো যাচ্ছে। এতে সময় সাশ্রয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারের সঙ্গে তাল মেলানোটাও সহজ হচ্ছে।
প্রযুক্তি আছে, কিন্তু দক্ষতা নেই
এই সম্ভাবনার বিপরীতে বাস্তবতা হল, এআই চালু করার মতো দক্ষ লোক আর ভালো উপাত্ত বা ডেটা অনেক কারখানায় নেই। অনেক জায়গায় আধুনিক মেশিন থাকলেও ঠিকভাবে ডেটা সংগ্রহ করা হয় না। সেই ডেটা নিরাপদ রাখার ব্যবস্থাও দুর্বল। ফলে এআইয়ের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
একটি বড় কারখানায় পূর্ণাঙ্গ এআইনির্ভর ব্যবস্থা চালু করতে এখন ৬ থেকে ১২ মাস সময় লেগে যাচ্ছে। অথচ দক্ষ টিম থাকলে ২ থেকে ৩ মাসেই কাজ শেষ করা সম্ভব। দেরি হওয়ার কারণে খরচ বাড়ে, উৎপাদন কমে এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হয়।
সরকার কী ভাবছে
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, পোশাকসহ উৎপাদন খাতে এআই আনা মানে শুধু মেশিন বসানো নয়। তার সঙ্গে দক্ষ মানুষ, ডেটা প্রস্তুতি ও স্পষ্ট নীতির বিষয়ও জড়িত।
তিনি জানান, সরকার জাতীয় ডিজিটাল রূপান্তর কৌশলের অংশ হিসেবে একটি ‘এআই-দক্ষতা তৈরির জাতীয় কাঠামো’ নিয়ে কাজ করছে। এতে তৈরি পোশাক খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ সহকারীর কথায়, শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কাজ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং আর ডেটা ব্যবহার শেখানো হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই— যেন অটোমেশন চাকরি কেড়ে না নেয়, বরং কাজের ধরন বদলে উৎপাদন বাড়ায়।
শ্রমিকদের চোখে এআই: চাকরি নয়, কাজ বদলাচ্ছে
এআই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে এআইয়ে দক্ষতা না থাকলে চাকরির ঝুঁকি বাড়তে পারে, এমন কথা উঠে এসেছে নানা প্রতিবেদনে।
ইউনেস্কোর বাংলাদেশবিষয়ক এআই র্যাম রিপোর্ট বলছে, এআই ও অটোমেশনের কারণে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মশক্তি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে দেশে মোট শ্রমশক্তি প্রায় ৭ কোটি ৩৭ লাখ।
বিশ্ব ব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় ৭ শতাংশ কর্মসংস্থান বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। আবার প্রায় ১৫ শতাংশ চাকরি এআই শিখলে আরো শক্তিশালী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে একঘেয়ে কাজের ওপর। যেমন ডেটা এন্ট্রি, কল সেন্টার বা হিসাব-নিকাশের কাজ। তবে নতুন কাজও তৈরি হচ্ছে। যেমন ডেটা লেবেলিং বা ‘অ্যানোটেশনের’ মত কাজে লোক লাগতে পারে।
একসময় সোয়েটার কারখানায় ম্যানুয়াল মেশিনে কাজ করতেন শাহীন আলম। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি বেকার হন। পরে একটি অটোমেটেড কারখানায় কাজ পান এবং নিজেই নতুন প্রযুক্তি শিখে নেন। কিন্তু বড় কারখানার সঙ্গে টিকতে না পেরে সেই কারখানাও বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তাকে পেশা বদলাতে হয়।
শাহীন আলম বলেন, এআই ভালো বা খারাপ, এভাবে দেখার সুযোগ নেই। এআই চাকরি পুরোপুরি কমিয়ে দেবে না। বরং কাজের ধরন বদলাবে।
“অনেক সময় প্রশিক্ষণ না দিয়েই শ্রমিকদের ওপর বেশি মেশিন চালানোর চাপ দেওয়া হয়। এতে কাজের মান নষ্ট হয়; চাপও বাড়ে।”
একই পরিস্থিতিতে পড়েন সালমা বেগম। কারখানা বন্ধ হওয়ার পর তিনি বেকার হন। পরে স্বামীর সঙ্গে ছোট একটি চা-দোকান চালু করেন।
ভিয়েতনাম কেন এগিয়ে
বিজিএমইএর পরিচালক ও কিউট ড্রেস ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মোস্তাফিজ বলেন, প্রযুক্তিগত দক্ষতায় পিছিয়ে পড়ায় ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বাজার হারাচ্ছে।
তিনি বলেন, ভিয়েতনাম নিয়মিত বিনিয়োগ করছে আধুনিক উৎপাদন, সফটওয়্যার, ডেটা ব্যবহার ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। ফলে তাদের খরচ কমে, সময় সাশ্রয় হয় ও পণ্যের মান ভালো থাকে।
এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, “সমাধান হল, কারখানায় ঠিকভাবে ডেটা সংগ্রহ, ডেটা একভাবে রাখা এবং মাঝারি পর্যায়ের দক্ষ লোক তৈরি করা। ছোট ও মাঝারি কারখানার জন্য প্রশিক্ষণ সহজ করাও জরুরি।
“ডেটা ঠিক থাকলে এআই দিয়ে রিওয়ার্ক ও রিজেকশন ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো যায়। উৎপাদনশীলতা ২ থেকে ৬ শতাংশ বাড়তে পারে। মেশিন নষ্ট হয়ে কাজ বন্ধ থাকার সময়ও অনেক কমে। তবে দক্ষ লোক না পাওয়ায় অনেক সময় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে খরচ বাড়ে, ডেটার নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়ে।”
শেখ হোসেন মোহাম্মদ মোস্তাফিজের মতে, শুধু প্রযুক্তি কেনা নয়, দেশের লোকদের নতুন দক্ষতা শেখানোই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে ভালো সমাধান।
সব মিলিয়ে তৈরি পোশাক খাতে এআই আনার সঙ্গে শ্রমিক, দক্ষতা, বিনিয়োগ আর নীতির বিষয় জড়িয়ে আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, এই পরিবর্তন কীভাবে সামলানো হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা।




