একজন জাঁদরেল এমডিকে ডেপুটি গভর্নর হিসেবে পাশে চান গভর্নর

1773848803-bbd544fd2afe698e8198ca07313f4c8e

একজন জাঁদরেল ব্যাংক এমডিকে ডেপুটি গভর্নরের পদে বসাতে চান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহামন। ব্যাংক খাতের এমডিদের মধ্যে এমন একটি আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে ডেপুটি গভর্নরের দৌড়ে এখন পর্যন্ত যাদের নাম এসেছে তারা বলছেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকের উচ্চ বেতনের চাকরি ছেড়ে তুলনামূলক অনেক কম বেতন ও অন্যান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধা কম থাকায় তাদের পক্ষে ডেপুটি গভর্নরের পদে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

কারণ এত দিন তারা যে ধরনের জীবন যাপন করে আসছেন সেই অভ্যস্ততায় ছেদ পড়বে। তাছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজের ক্ষেত্রে কতটা স্বাধীনতা তারা পাবেন তা নিয়েও সন্দিহান। এসব কারণে ডেপুটি গভর্নর পদে যোগ দেওয়ার বিষয়ে তাদের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।
এখন পর্যন্ত ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগের জন্য দুইজন উচ্চ বেতনে কর্মরত ব্যাংক এমডির নাম জানা গেছে।

এরা হলেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন ও ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি আলী রেজা ইফতেখার।
এর মধ্যে ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডির চাকরির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১৬ এপ্রিল। এ কারণে ব্যাংক খাতের অনেকের ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে তিনি হয়তো ডেপুটি গভর্নর পদে নিয়োগে আগ্রহী হতে পারেন।

তবে এ বিষয়ে তারও কোনো বক্তব্য পায়নি ।

তবে ইবিএলের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র জানিয়েছে, ৬৫ বছর বয়স হয়ে যাওয়ায় এমডি হিসেবে ওই ব্যাংকে আর এমডির দায়িত্বে থাকছেন না আলী রেজা ইফতেখার।
সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি, তবে লোকমুখে এসব শুনছি। জানি না উৎস কী! কিন্তু আমি এই মুহূর্তে ক্যারিয়ার পরিবর্তনের কথা একটুও ভাবছি না। সিটি ব্যাংককে আরো উঁচু জায়গায় নেওয়ার মিশন আছে।’

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ড. আহসান এইচ মনসুরকে অব্যাহতি দিয়ে গভর্নর হিসেবে মো. মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দেয় সরকার।

এরপর থেকে মোস্তাকুরের ব্যবসায়ী পরিচয়কে সামনে এনে অনেক ধরনের সমালোচনা শুরু হয়। এসব সমালোচনার মধ্যে কিছু ইতিবাচক সমালোচনাও ছিল। অনেকেই বলেছেন, নতুন গভর্নর বাস্তব অর্থনীতির মানুষ হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে জানেন। এ কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে চাঙ্গা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তিনি সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ায় ভূমিকা রাখতে পারবেন।

নতুন গভর্নরকে ঘিরে আরও একটি আলোচনা ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় এই দায়িত্ব তিনি সফলভাবে পালন করতে পারবেন কি না। এর জবাবেও অনেকে বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৭-৮ হাজারের বেশি কর্মী রয়েছে। অতএব গভর্নর হিসেবে তার নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মকর্তারা কাজ করলে এই দায়িত্ব পালন করা তার জন্য কঠিন হবে না।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম আরও ভালোভাবে পরিচালনা এবং ব্যাংক খাতের প্রকৃত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের জন্য ব্যাংক খাতের একজন অভিজ্ঞ এমডিকে ডেপুটি গভর্নর করার বিষয়টিও ভাবছেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, এমন একটি আভাস পেয়েছে ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, ডেপুটি গভর্নর নিয়োগের প্রক্রিয়াটি অর্থমন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। এ লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় থেকে সার্স কমিটি করা হয়। ওই কমিটি বিভ্ন্নি যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করে দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়। সেখান থেকে আসা আবেদনের প্রার্থীদের মধ্যে থেকে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করা হয় এবং তাদের মৌখিক সাক্ষাৎকার নিয়ে এই নিয়োগ চূড়ান্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাউকে ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও তা অর্থমন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হতে হবে বলে জানিয়েছে ওই সূত্রটি।

বর্তমানে চারজন ডেপুটি গভর্নর রয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। এরা হলেন নুরুন নাহার, ড. মো. হাবিবুর রহমান, মো. জাকির হোসেন চৌধুরী ও কবির আহাম্মদ।

তবে এর মধ্যে একজন ডেপুটি গভর্নরের পারফর্ম্যান্স নিয়ে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাছাড়া আরেক ডেপুটি গভর্নরের কিছু অনিয়ম নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্তও শুরু করেছিল।

ফলে নতুন গভর্নরের কার্যক্রম সুচারু রূপে সম্পন্ন করতে ডেপুটি গভর্নরের পদগুলো কিছুটা নতুন করে গোছানো অস্বাভাবিক নয় বলেই মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এক ডেপুটি গভর্নর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পরপরই ৭ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকে মব সৃষ্টি করে দুইজন ডেপুটি গভর্নরকে জোরপূর্বক চাকরি থেকে অব্যাহতি নিতে বাধ্য করা হয়। তৎকালীন অন্তর্বতী সরকারও সেই অব্যাহতি মেনে নিয়ে নতুন দুইজন ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ দেয়। তবে ওই সময় যে দুইজন ডেপুটি গভর্নরের চাকরি ছাড়তে হয় তারা ছিলেন অন্যদের চেয়ে অনেক যোগ্য।

এভাবে যোগ্যদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক কম যোগ্যদের দিয়ে চললে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার সঠিক গন্তব্যে পৌছাতে পারবে না বলে মনে করেন সাবেক ওই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, নিয়োগের আগে দেখতে হবে যাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে তিনি দক্ষ কি না। বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাজ আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ এক নয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকে ভালো করলে তিনি যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ভালো করবেন এমনটা নিশ্চিত করেও বলা যায় না।

তিনি আরও বলেন, ডেপুটি গভর্নর হিসেবে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে হোক আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তর থেকে হোক না কেনো নিয়োগ দেওয়ার আগে দেখতে হবে, যে ধরনের যোগ্যতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় মানদন্ড একজন ডেপুটি গভর্নরের থাকা দরকার সেসব গুনাবলী ওই ব্যক্তির মধ্যে আছে কি না।

‘সঠিক জায়গায় সঠিক ব্যক্তিকে বসানো হচ্ছে কি না, সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে কি না তা দেখতে হবে। একজনকে ধরে এনে বসিয়ে দিয়ে তার কাছ থেকে ভালো কাজ আশা করাটাও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর ইনজাস্টিস করা হবে,’ যোগ করেন মুস্তফা কে মুজেরি।

তবে একজন ভালো ডেপুটি গভর্নর নিয়োগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন এই অর্থনীতিবিদ।

মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতর থেকে বা বাইরে থেকে নেওয়ার বিষয়ে বড় ধরনের কোনো তফাৎ নেই। তবে সঠিক লোকটাকে সঠিক জায়গায় বসানোটাই হলো মূল চ্যালেঞ্জ।’

Pin It