নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি বিনির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করা এনসিপি এখন জামায়াতের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির টেবিলে। তারুণ্যের রাজনীতি কি জোটের সমীকরণে পথ হারাচ্ছে ?
পুরোনো ধারার বাইরে গিয়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি শুরুর কথা বলে যাত্রা শুরু করেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অনেকেই মনে করেন এনসিপির তরুণ নেতাদের সেই ঘোষণা শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। তখন না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দলটির নির্বাচনি জোটের যে গুঞ্জন উঠেছে, তা সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। এই গুঞ্জন যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় গড়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে এবং দলটি ধীরে ধীরে জামায়াতের ছায়ায় বিলীন হয়ে যেতে পারে।
গত ফেব্রুয়ারিতে এনসিপি গঠনের পরে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম লিখেছিলেন ‘নতুন দল কি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করবে?’ ওই লেখায় তার বক্তব্য ছিল এরকম—“বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক দল প্রয়োজন, যেটি তারুণ্যের শক্তিতে ভরপুর, দেশপ্রেমে উজ্জীবিত এবং গরিব ও নিপীড়িত মানুষকে সত্যিকারেই ভালোবাসবে। এমন একটি দল প্রয়োজন, যারা অত্যাচার ও শোষণের শৃঙ্খল মুক্ত ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখবে। এমন একটি দল দরকার, যারা আমাদের সামনে এগিয়ে নেবে, পেছনে নয়। দীর্ঘদিন ধরে আমরা এমন রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের শাসনে আছি, যাদের একমাত্র লক্ষ্য ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থরক্ষা। আমাদের দরকার একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক দল—যারা সবার অধিকার ও জনগণের সমৃদ্ধির জন্য কাজ করবে।” (ডেইলি স্টার, ১৪ মার্চ ২০২৫)।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বেশ কয়েক মাস ধরেই বলে আসছিলেন যে, এনসিপি এককভাবে নির্বাচন করবে। সেই লক্ষ্যে প্রথমপর্বে ১২৫টি আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়। দ্বিতীয়পর্বে বাকি আসনে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত করে দলটি। যদিও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন—এই তিন দলের সমন্বয়ে গত ৭ ডিসেম্বর একটি জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই জোটের নাম ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’।
তবে সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে। আবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তার সঙ্গে আসন সমঝোতার বিষয়ে এনসিপির আলোচনার হতে পারে বলেও শোনা যাচ্ছে। বিপরীতে এরকম কথাও শোনা যায় যে, বিএনপিবিরোধী জোট শক্তিশালী করতেই জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি জোটে যাচ্ছে এনসিপি। কারণ এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেহেতু অংশ নিতে পারবে না, অতএব বিএনপির বিরুদ্ধে বাকি সব শক্তি ঐক্যবদ্ধ হলে কোনো নতুন দল বা নতুন জোট ক্ষমতায় আসবে। যদিও এই সময়ের বাংলাদেশে এটি কতটা সম্ভব—তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
শোনা যাচ্ছে, জামায়াতের কাছে এনসিপি অন্তত ৫০টি আসনে ছাড় চেয়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর দিক থেকে এ সংখ্যাকে বেশি মনে করা হচ্ছে। অবশ্য জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার আলোচনা সামনে আসার পর দলটির একাংশের মধ্যে প্রতিক্রিয়াও হয়েছে তীব্র। এরইমধ্যে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন জামায়াতবিরোধী অংশের নেতা হিসেবে পরিচিত মীর আরশাদুল হক।
বাস্তবতা হলো, এনসিপির যে ১২৫ জন প্রার্থীর নাম এরই মধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের অনেকেই নির্বাচনি প্রচার শুরু করেছেন। গণসংযোগ করছেন। যদি জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির ২৫ থেকে ৫০টি আসনে সমঝোতা হয়, তাহলে এরই মধ্যে ঘোষিত বাকি প্রার্থীদের অধিকাংশই বাদ পড়বেন। তাতে বাদ পড়া প্রার্থীদের অনেকেই বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারেন বা দল থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন। বিশেষ করে এনসিপির ভেতরে যে অংশটি জামায়াতবিরোধী হিসেবে পরিচিত, তাদের তো দল থেকে বেরিয়ে যাওয়া অনিবার্য হয়ে পড়বে।
অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে দেশের রাজনীতিতে ডানপন্থার উত্থান (কোথাও কোথাও উগ্রপন্থা) নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। বিভিন্ন ঘটনায় দেশে সক্রিয় ইসলামপন্থি দল ও সংগঠনগুলো অনেক বেশি সোচ্চার হয়েছে। এর একটি কারণ হতে পারে এই যে, বিগত বছরগুলোয় তারা কোণঠাসা ছিল। ফলে আওয়ামী লীগের পতনের পরে তারা তাদের পুঞ্জীভূত রাগ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে নানাভাবে। কিন্তু বাংলাদেশে ইসলামপন্থি দলের ভোট ও জনপ্রিয়তা কেমন তা নিয়ে যেহেতু প্রশ্ন আছে এবং বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ হলেও তাদের অধিকাংশই যেহেতু কট্টরপন্থা সমর্থন করে না; বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোও যেহেতু বাংলাদেশে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি, পারছে না বা পারার সম্ভাবনাও ক্ষীণ—ফলে বাংলাদেশে মধ্যপন্থী দলগুলোকেই অধিকাংশ মানুষ পছন্দ করে, সেটি প্রমাণিত। মূলত এ কারণেই বাংলাদেশে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি ছাড়া আর কোনো দল সরকার গঠন করতে পারেনি। জামায়াত সরকারের অংশীদার হলেও তারা এককভাবে সরকার গঠনের আসন কখনোই পায়নি।
অভ্যুত্থানের পরে ইসলামপন্থি দল, বিশেষ করে জামায়াতের ভোট বেড়েছে বলে মনে করা হলেও সেই ভোট এককভাবে সরকার গঠনের মতো যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আবার সবগুলো ইসলামপন্থি দল এক একটি প্ল্যাটফর্মে এসে নির্বাচন করলেও তারা সরকার গঠনের জন্য দেড়শোর বেশি আসনে জয়ী হবে, সেটি বলা মুশকিল। তাছাড়া সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, জোটবদ্ধ হলেও প্রার্থীদের নির্বাচন করতে হবে নিজস্ব দলীয় প্রতীকে। যেমন জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফতে মজলিসহ ৮টি ইসলামপন্থি দল নির্বাচনি জোট করলেও সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের পোস্টারে ও ব্যালটে প্রতীক থাকবে যার যার দলের। অর্থাৎ আগে যেমন জোটবদ্ধ দলের সকল প্রার্থী জোটের মূল দলের (যেমন নৌকা বা ধানের শীষ) প্রতীকেই নির্বাচন করার সুযোগ পেতেন, এবার সেই সুযোগ নেই। সুতরাং, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাদে অন্য যে কোনো ইসলামপন্থি দলের প্রার্থীদের নিজস্ব প্রতীকে জয়ী হয়ে আসা বেশ কঠিন।
জোটের আসনগুলোয় একজন প্রার্থী থাকবেন। যেমন যে আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী থাকবেন, সেখানে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বা জোটভুক্ত অন্য দলগুলোর প্রার্থী থাকবেন না। কিন্তু খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন বা বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির প্রার্থীরা তাদের দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে আসতে পারবেন কি না, সেটি বড় প্রশ্ন। সেখানে জোটের প্রার্থীর পক্ষে জোটবদ্ধ বাকি ইসলামপন্থি দলগুলো যতই নির্বাচনি প্রচার চালাক না কেন, প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ এবং তার দলের শক্তিও ভূমিকা রাখবে।
এরকম বাস্তবতায় জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি জোট করলে এনসিপি আখেরে কয়টি আসনে পাবে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার মধ্য তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় বিনির্মাণের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসবে। শুরু থেকেই তারা ‘জামায়াতের বি-টিম’ বলে যে প্রচার তৈরি হয়েছিল, সেই প্রচারণাটি আরও বদ্ধমূল হবে কি না—সেই প্রশ্নটি এনসিপির ভেতরেই আছে।
অস্বীকার করা যাবে না, গণঅভ্যুত্থানের পরে অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী তরুণদের রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির ব্যাপারে মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটি শুরু থেকেই নানা কারণে ধাক্কা খেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের নতুন ও বিতর্কিত বয়ান, বঙ্গবন্ধু ও বাহাত্তরের সংবিধানের ব্যাপারে বিষোদ্গার এবং দলের অনেক নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ; বাংলাদেশের স্বাধীনতা তথা স্বাধিকার আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ড ঘটানো সমর্থন দেওয়াসহ নানা কারণে এনসিপির ব্যাপারে সাধারণ মানুষের অনেকেরই মোহভঙ্গ হয়েছে। অথচ তারা যদি এসব পথে না গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের ‘পুরোনো ধারা’র রাজনীতির বাইরে গিয়ে সত্যিই একটা নতুন ধরনের ইনক্লুসিভ রাজনীতি তথা দেশের বড় দলগুলোর চেয়ে উন্নত রাজনীতি উপহার দিতে পারত—তাহলে এবারের নির্বাচনেই সরকার গঠনের মতো আসন না পেলেও রাজনীতিতে তাদের একটা শক্ত অবস্থান তৈরি হত, যা তাদেরকে চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি বড় শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারত।
কিন্তু এনসিপির ভেতরে হয়তো একধরনের তাড়া আছে। একটা ভয়ও আছে। তারা হয়তো মনে করে যে, ভবিষ্যতে আবারও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাবে বা তারা রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাবে। এ কারণে তারা এবারই ক্ষমতায় আসতে চায়। তারা হয়তো বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মতো দল গঠনের পরপরই ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, জিয়াউর রহমানের দল গঠনের পরই বিএনপির ক্ষমতায় আসা এবং এরশাদের দল গঠনের পরেই জাতীয় পার্টির ক্ষমতায় আসার সময়ের বাংলাদেশ আর বর্তমান বাংলাদেশ এক নয়। এই মুহূর্তে দেশে এনসিপির চেয়েও শক্তিশালী একাধিক দল সক্রিয়। আবার অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা তরুণদের দল মানেই সেই দলকে ভোটাররা চোখ বন্ধ করে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে, ভোটের অঙ্ক এত সরল নয়।
এনসিপির উচিত ধীরে চলা। দল গঠনের পর থেকে তারা যেসব কারণে বিতর্কিত হয়েছে বা সাধারণ মানুষের কাছে তারা যেসব কারণে অপছন্দের কারণ হয়েছে, সেগুলো দূর করে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের চেয়ে উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি উপহার দিতে পারলে মানুষ ধীরে ধীরে তাদের ছাতার তলে দাঁড়াবে। তাদের বুঝতে হবে, বাংলাদেশে রাজনীতি করে ক্ষমতায় যাওয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার। সে কারণে এবারের নির্বাচনে তাদের এককভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা উচিত। তারা যদি একটি আসনেও না জেতে, তারপরও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় বিনির্মাণের জন্য তাদের উচিত হবে চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন টার্গেট করে কাজ করা। দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য অন্য দলগুলোর মতো আচরণ করলে নতুন বন্দোবস্ত ও নতুন রাজনীতির স্বপ্ন সেখানে মার খাবে।





