এবার রাজপথে প্রতিরোধ-মিছিলে ইরানের প্রেসিডেন্ট

Untitled-14-69652097df252

ইরানের রাজধানী তেহরানে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এক বিশাল সরকারপন্থি সমাবেশে যোগ দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। টানা সহিংস বিক্ষোভ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আয়োজিত এই কর্মসূচিকে ‘জাতীয় প্রতিরোধ মিছিল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, সোমবার (১২ জানুয়ারি) ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারপন্থিরা সমাবেশ করেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে রাজধানী তেহরানের এক বড় সমাবেশে হাজারো মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। ওই সমাবেশে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে মিছিলরত মানুষের সঙ্গে হাঁটতে, জাতীয় পতাকা হাতে থাকা নাগরিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা যায়।

এর আগে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এই জাতীয় প্রতিরোধ মিছিলে অংশ নিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। দুই সপ্তাহ ধরে চলা প্রাণঘাতী সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান জানাতেই এই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়।

সমাবেশের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অসন্তোষ নিরসনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, তার সরকার বিক্ষোভকারীদের কথা শুনতে প্রস্তুত। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, যেন ‘দাঙ্গাবাজ’ ও ‘সন্ত্রাসীরা’ এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে না পারে।

এর আগেও চলমান বিক্ষোভের মধ্যে বড় ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান। তিনি দেশজুড়ে টানা দুই সপ্তাহের সহিংসতার প্রেক্ষাপটে দুর্বল অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন। রোববার (১১ জানুয়ারি) আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সরকার জনগণের কথা শুনতে প্রস্তুত এবং অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উসকে দিতে ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হলেও সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।

গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানের মুদ্রার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে হঠাৎ মুদ্রার পতনে নিত্যপণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরমে পৌঁছায়। শুরুতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ হলেও ধীরে ধীরে আন্দোলন সরকারবিরোধী রূপ নেয়।

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, মানুষের উদ্বেগ বাস্তব। আমাদের উচিত তাদের সঙ্গে বসা এবং দায়িত্ব থাকলে সমস্যার সমাধান করা। তবে আরও বড় দায়িত্ব হলো, কিছু দাঙ্গাবাজ যেন পুরো সমাজকে ধ্বংস করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।

তিনি আবারও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইচ্ছাকৃতভাবে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে এবং জনগণকে তথাকথিত দাঙ্গাবাজ ও সন্ত্রাসীদের থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান।

আল জাজিরার মতে, ২০২২-২৩ সালে মাহসা আমিনির হেফাজতে মৃত্যুর পর যে আন্দোলন হয়েছিল, তার পর এটিই ইরানে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সরকারপন্থী মিছিল ‘বিদেশি শত্রুদের পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে’: খামেনি

 ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশজুড়ে হওয়া সরকারপন্থী মিছিলে অংশ নেওয়া মানুষদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই মিছিল আমেরিকার জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া একাধিক পোস্টে খামেনি সরকারপন্থী বিক্ষোভকারীদের ছবি শেয়ার করেন। তিনি বলেন, ‘তারা খুব ভালো কাজ করেছে’ এবং ‘বিদেশি শত্রুদের সেই পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে, যা দেশের ভেতরের বিশ্বাসঘাতক দালালদের দিয়ে বাস্তবায়ন করার কথা ছিল’।

খামেনি আরও বলেন, ‘ইরানের মহান জাতি তাদের দৃঢ়তা ও পরিচয় শত্রুদের সামনে তুলে ধরেছে।’ তিনি যোগ করেন, ‘এটি ছিল আমেরিকান রাজনীতিকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যেন তারা প্রতারণা বন্ধ করে এবং বিশ্বাসঘাতক দালালদের ওপর ভরসা না করে।’

এদিকে বৃহস্পতিবার রাতের তুলনায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এখন অনেকটাই কমে এসেছে। রাজধানী তেহরানসহ বড় ও ছোট শহরে শত শত হাজার মানুষ সরকারপন্থী মিছিলে অংশ নেয়।

তেহরান থেকে সাংবাদিক তোহিদ আসাদি জানান, অনেকে সংহতি ও ঐক্যের ডাকের জবাবে রাস্তায় নেমেছেন। তিনি বলেন, এই উপস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও একটি বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির প্রেক্ষাপটে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

আসাদি বলেন, ‘আজ মানুষের উপস্থিতি দেশের ভেতরে ও বাইরে রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।’ তিনি আরও বলেন, এতে করে নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে সরকার আরও কঠোর হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে যেসব বিক্ষোভ পরে সহিংস হয়ে ওঠে, সেগুলোর ক্ষেত্রে।

Pin It