ক্রমশ জেন-জির নেতা হয়ে উঠছেন তারেক রহমান

julyfighter

দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতিতে স্বদেশে ‘রাজসিক’ প্রত্যাবর্তন করেন বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে তার এই ফিরে আসা দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে তৈরি করা একটি ‘নেতিবাচক বয়ান’ ভেঙে নতুন করে নিজেকে প্রমাণের এক অগ্নিপরীক্ষাও বটে।

গত কয়েক সপ্তাহে তারেক রহমানের প্রতিটি পদক্ষেপ, বক্তব্য এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, দেশের তরুণ প্রজন্ম, যারা বিগত ১৬-১৭ বছর তারেক রহমান সম্পর্কে কেবল একতরফা ‘নেতিবাচক’ প্রচারণাই শুনে এসেছে, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে এই নেতার প্রতি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সফলতার পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক নতুন ভোরের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। রাজপথে বুক পেতে দেওয়া লড়াকু ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং আসিফ মাহমুদদের ওপর এ দেশের মানুষ অগাধ আস্থা ও ভরসা স্থাপন করেছিল।

নানা কারণেই জুলাই বিপ্লবের সেই স্পিরিট বা চেতনা ধুলোয় মিশে গেছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এই তরুণ নেতারা তাদের ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া আবেগকে স্রেফ একটি রাজনৈতিক সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

ঠিক এই জায়গাতেই রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং মানুষের মোহভঙ্গ ঘটেছে। মানুষ যখন দেখেছে যে নতুন কোনো পথ নয়, বরং পুরনো রাজনৈতিক সমীকরণেই ফিরছে এই তরুণরা, তখনই তারা বিকল্প এবং অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করে।

ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই তারেক রহমানের সংযত ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক বক্তব্য ও আচরণ সাধারণ মানুষের সামনে এক শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে ধরা দিয়েছে। নাহিদ-সারজিসদের ওপর থেকে মানুষের ভরসা যত দ্রুত উঠে যাচ্ছে, তারেক রহমানের প্রতি তাদের প্রত্যাশার পারদ ঠিক ততটাই দ্রুত ওপরে উঠছে।

মানুষ এখন আর কেবল আবেগে ভেসে যাওয়া কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং রাষ্ট্রের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য একজন অভিজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতার দিকেই ঝুঁকছে।

নাহিদ-সারজিসদের হাত ধরেই একটি বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ এবং প্রচলিত কলুষিত রাজনীতির বাইরে ‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিল সাধারণ জনতা। মানুষ আশা করেছিল, এই তরুণরা প্রথাগত ক্ষমতার লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে থেকে রাষ্ট্রীয় সংস্কারে এক নির্মোহ ভূমিকা পালন করবেন। কিন্তু আন্দোলনের সেই রেশ কাটতে না কাটতেই ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ (এনসিপি) গঠন করে প্রত্যক্ষ রাজনীতির আঙিনায় পা রাখার পর থেকেই নানা কেলেঙ্কারি আর সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলায় এক গভীর ইমেজ সংকটে নিমজ্জিত হয়ে আছে দলটি।

দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও নারী ঘটিত কেলেঙ্কারির পাশাপাশি শীর্ষ নেতাদের ঔদ্ধত্য আচরণ দলটিকে জনবিচ্ছিন্ন করে তুলেছে।

বিশেষ করে জুলাই ঘোষণাপত্রের সময় নেতাদের প্রমোদভ্রমণ এবং দলের ২৪ দফা ইশতেহার ঘোষণার দিন শহীদ মিনারে নেতাকর্মীদের আশানুরূপ উপস্থিতি না থাকা দলটির সাংগঠনিক দৈন্যদশাকেই ফুটিয়ে তুলেছে বলে মত রাজনীতি সংশ্লিষ্টদের।
তৃণমূল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সবখানেই এনসিপি এখন বির্তকিত নাম। এরই ধারাবাহিকতায় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠনের পর পরই এর প্রতিবাদে দলের কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতারা একে একে পদত্যাগ করেছেন, যা দলটিকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই তরুণ নেতাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশের ধরনটি ছিল অপরিপক্ক, যা সাধারণ মানুষের কাছে তাদের ‘আন্দোলনের চ্যাম্পিয়ন’ ইমেজকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সর্বশেষ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠনের ঘোষণা দেওয়া ছাত্র আন্দোলনের মূল শক্তি সর্বজনীনতা এবং অসাম্প্রদায়িক ঐক্য নষ্ট করেছে মনে করছে অনেকেই। আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের একটি নির্দিষ্ট ভাবাদর্শের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এই কৌশলগত আঁতাতকে সাধারণ মানুষ চরম ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ হিসেবে দেখছে।

জুলাই বিপ্লবে যারা দল-মত নির্বিশেষে রাজপথে নেমেছিল, তাদের একটি বিশাল অংশ বিশেষ করে উদারপন্থী ও সাধারণ তরুণরা এই জোটকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্রই এই আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে- যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়ে হাজারো প্রাণ ঝরল, সেই স্বপ্নের সমাপ্তি কি সেই পুরনো মেরুকরণের রাজনীতিতেই?

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, “বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্বের এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করছে। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তব রূপ না পাওয়ায় হতাশা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সংযত আচরণ, প্রতিহিংসামুক্ত বক্তব্য তরুণদের কাছে নতুন করে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে বলেই মনে হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “তরুণরা এখন আবেগী স্লোগানের চেয়ে অভিজ্ঞতা, পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে সতর্ক থাকতে হবে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর এই উপমহাদেশের সব ক্ষমতাসীনদেরই চেহারা পাল্টে যায়। তারেক রহমান যদি এরকম সংযমী এবং দেশের ও দেশের মানুষের কল্যাণ করার দৃঢ় প্রত্যয়ী হওয়ার মানসিকতা সবসময় বজায় রাখেন, নিঃসন্দেহে তিনি তরুণদের কাছে আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবেন।”

২০০৭ সালের এক-এগারোর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং পরবর্তী দেড় দশকের আওয়ামী লীগ শাসনের সময় তারেক রহমানকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতির নেতিবাচক প্রচারণার একটি বড় অংশ। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, হাওয়া ভবন কেন্দ্রিক সিন্ডিকেট এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে কুক্ষিগত করার নানা অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল। আইনি নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশের মূল ধারার সংবাদমাধ্যমে তার বক্তব্য প্রচার ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফলে দেশের একটি বিশাল তরুণ গোষ্ঠী, যারা ২০০৭ সালে ছিল শিশু কিংবা কিশোর, তারা তারেক রহমানকে চিনেছে কেবল অন্যের মুখে বা একতরফা ‘প্রোপাগান্ডা’র মাধ্যমে। কিন্তু ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যেতে শুরু করে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এ প্রসঙ্গে বলেন, “দেশের মানুষের জন্য আমাদের নেতা তারেক রহমানের যে টান, সেটা অভাবনীয়। ১৭ বছর তিনি দেশের বাইরে ছিলেন কারণ তাকে বাধ্য করা হয়েছিল। তার বক্তব্য নতুন প্রজন্মের কাছে যেন না পৌঁছায়, সেজন্য আদালতের মাধ্যমে তার বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত দিয়েছিল ফ্যাসিবাদী সরকার। তাতেও তাকে দমানো যায়নি। তরুণদের সকল আন্দোলনে তিনি লন্ডন থেকে বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দিয়ে গেছেন, আমাদেরকে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন সেসব আন্দোলনে পাশে থাকতে। ২০১৮ সালে লন্ডনে একটা সভাতে তিনি প্রথম কোটা বাতিলের কথা বলেছিলেন। স্বৈরাচারী হাসিনা পতনেও তিনি এক দফা এক দাবি এক হাসিনার পদত্যাগের দাবি তুলেছিলেন। উনি সবসময়ই বিশ্বাস করে, তরুণরাই এ দেশের ভবিষ্যৎ। এ দেশের উন্নতি সাধনে তরুণদের জন্য নানা পরিকল্পনার কথা উনি ভেবে রেখেছেন।”

তিনি আরও বলেন, “অনেকেই মনে করেন তারেক রহমান সাহেব এত বছর দেশের বাইরে ছিলেন, দেশের অনেককিছুই হয়তো তিনি জানেন না। এ ধারণা সঠিক না। আমরা যারা দেশে ছিলাম, তাদের চেয়েও তিনি বেশি জানেন। অনেক সবকিছুর খোঁজ-খবর রেখেছেন, যখন যেখানে মনে করেছেন ওই মানুষটার পাশে থাকা দরকার, আমাদেরকে বলেছেন পাশে গিয়ে দাঁড়াতে। দেশের মানুষের জন্য উনার মমত্ববোধ ভীষণ আন্তরিক।”

স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর রাজধানীর পূর্বাচল সংলগ্ন ‘জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে’ বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিটের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি ঘোষণা করেছিলেন- ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান, ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি’। মূলত দেশের প্রতিটি সেক্টরের সংস্কার এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তার পরিকল্পিত ‘৩১ দফা কর্মসূচি’ এবং বিশেষ করে শিক্ষিত ও বেকার যুব সমাজের কর্মসংস্থান নিয়ে তার সুনির্দিষ্ট ভাবনাগুলো তরুণ প্রজন্মকে ব্যাপকভাবে আশাবাদী করে তুলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমান তার এই বৃহৎ পরিকল্পনার সামান্য অংশও যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেন, তবে তিনি কেবল দলীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে এই ক্রান্তিকালে সমগ্র জাতির এক নির্ভরযোগ্য আশার আলো হয়ে উঠবেন।

ইতোমধ্যেই তরুণদের মধ্যে তারেক রহমানকে নিয়ে এক ধরনের কৌতূহল এবং আগ্রহ দেখা দিয়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে তার সাম্প্রতিক মার্জিত এবং সংযত আচরণ। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে তিনি যেভাবে নিজেকে রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ক করেছেন, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে তার প্রতিটি সভায়। তরুণ প্রজন্ম এখন দেখছে এমন একজন নেতাকে, যিনি প্রতিহিংসার রাজনীতির বদলে সংস্কার এবং পুনর্গঠনের কথা বলছেন। যে বয়সে একজন মানুষের মধ্যে ক্ষোভ এবং প্রতিশোধের স্পৃহা প্রবল হওয়ার কথা, ১৭ বছরের নির্যাতন ও নির্বাসন কাটিয়ে ফিরে আসা সেই তারেক রহমান এখন কথা বলছেন ধৈর্য ও সহনশীলতার ভাষায়। এই পরিবর্তনই মূলত তরুণদের তাকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

১৭ ও ১৮ জানুয়ারি পর পর দুটি মতবিনিময় সভায় তারেক রহমানের যে রূপ দেখা গেছে, তা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করেছে। প্রথম দিন তিনি অংশ নেন দীর্ঘ দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত ‘মায়ের ডাক’ এবং ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর এক মতবিনিময় সভায়। সেখানে উপস্থিত অনেক শিশু ও তরুণ তাদের হারিয়ে যাওয়া বাবার সন্ধান চেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লে তারেক রহমান অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, এক সময় তাকে মঞ্চে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেও দেখা যায়। ওইদিনের মতবিনিময় সভায় তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বক্তব্য দেননি, বরং একজন ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়কের মতোই তাদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

পরের দিন ১৮ জানুয়ারি, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আহত এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। হাত বা পা হারানো জুলাই যোদ্ধারা যখন তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলতে উন্মুখ হয়ে ছিলেন, তখন তিনি সব ধরনের প্রটোকল এবং নিরাপত্তার ঘেরাটোপ ভেঙে মঞ্চের কর্নারে চলে আসেন। একেক করে তিনি ডেকে নেনে আহতদের, তাদের সঙ্গে হাত মেলান, শোনেন তাদের নানা অসুবিধার কথা। এই যে ‘পিপলস লিডার’ বা জনগণের নেতা হওয়ার প্রবণতা, তা তরুণ প্রজন্মকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছে। জুলাই বিপ্লবের তরুণরা যেখানে বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বীতশ্রদ্ধ, সেখানে তারেক রহমানের এই সহজলভ্যতা ও আন্তরিকতা তাদের মধ্যে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

অন্যদিকে, সরেজমিনে তারেক রহমানের গুলশান কার্যালয়ের সামনে প্রতিদিনের ভিড় পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সেখানে কেবল রাজনৈতিক কর্মীরাই নন, বরং সাধারণ শিক্ষার্থী, শিল্পী এবং কার্টুনিস্টদের আনাগোনা বেড়েছে। অনেক তরুণ তাদের আঁকা চিত্রকর্ম বা কার্টুন তাকে উপহার দিতে আসছেন। তারেক রহমানও তাদের হতাশ করছেন না; কাউকে নিজের কাছে ডেকে নিচ্ছেন, আবার কারো উপহার পরম শ্রদ্ধায় গ্রহণ করাচ্ছেন তার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিয়োজিত সিএসএফের সদস্যদের দিয়ে।

রাজনীতির এই নতুন শৈলী কেবল শিক্ষিত বা উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অতি সম্প্রতি তিনি রিকশা ও ভ্যানচালকদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একজন শীর্ষ নেতার রিকশা চালকদের সঙ্গে বসে তাদের প্রাত্যহিক জীবনের সংকট শোনা এবং রাষ্ট্র কাঠামোতে তাদের জীবনমান উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করার ঘটনা বিরল। এই ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি তরুণদের কাছে তাকে একজন আধুনিক ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। তারা দেখতে পাচ্ছে, তারেক রহমান কেবল গদি দখলের রাজনীতি করছেন না, বরং সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের দুঃখ-দুর্দশাকে নিজের পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখছেন।

মায়ের মৃত্যু পরবর্তী তারেক রহমানের আচরণও দেশের মানুষকে মুগ্ধ করেছে। ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিন পর ৩০ ডিসেম্বর তিনি তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে হারান। আওয়ামী লীগ আমলে তাকে সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু ৩১ ডিসেম্বর মায়ের জানাজায় তারেক রহমান যে বক্তব্য দেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সৌজন্য ও সততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

মায়ের জানাজায় বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে তিনি কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কথা বলেননি। তিনি একবারের জন্যও কাউকে দায়ী করে বা প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে বক্তব্য দেননি। বরং তিনি অত্যন্ত বিনীতভাবে বলেছিলেন, “আমি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান। দয়া করে আমার মায়ের কাছে যদি কারো কোনো ঋণ থাকে, জানাবেন, আমি তা শোধ করার ব্যবস্থা করবো।”

তার এই এক মিনিটের সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় এবং তরুণদের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মায়ের মৃত্যুশোকে মুহ্যমান একজন নেতার এই সংযম প্রমাণ করে যে তিনি দীর্ঘ নির্বাসনে থেকে নিজেকে একজন সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এমনকি সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত নাগরিক শোকসভাতেও তিনি বসে ছিলেন দর্শক সারিতে। বেগম জিয়ার পরিবারের সদস্য হিসেবে তাকে মঞ্চে কিছু বলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেন।

গত ১০ জানুয়ারি দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক এবং সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে তারেক রহমানের মতবিনিময় সভাটিও ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের অনেকের প্রতিষ্ঠানই বিগত সময়ে তার বিরুদ্ধে এক এগারোর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছিল। কিন্তু তারেক রহমান তাদের সবাইকে সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়ে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন। যদিও সেখানে অনেক সাংবাদিকই তাকে সতর্ক করে বলেছেন, অতীতে যেভাবে চাটুকারিতার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিবাদের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, তিনি যেন সেই পথে পা না বাড়ান। তারেক রহমান সেই সমালোচনাগুলোকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন।

দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমেই এখন তারেক রহমানকে ঘিরে এক ধরনের ইতিবাচক মনোযোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি কোথায় যাচ্ছেন, কখন বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন, কার্যালয়ে কখন প্রবেশ করছেন, কারা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন, তিনি কী বলছেন কিংবা সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা তার সম্পর্কে কী মন্তব্য করছেন, প্রায় প্রতিটি মুহূর্তই সংবাদ শিরোনাম ও ক্যামেরার ফোকাসে উঠে আসছে। এই অতিরিক্ত দৃশ্যমানতা ও নিবিড় প্রচারণা তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ইমেজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

তাদের মতে, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠা কোনো একদিনের ঘটনা ছিল না, বরং দীর্ঘ সময় ধরে তোষামোদে ঘেরা একটি পরিবেশই তাকে সেই পথে ঠেলে দিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তারা সতর্ক করছেন, তারেক রহমান যেন একই ধরনের রাজনৈতিক ফাঁদে পা না দেন। তবে আরেকদল বিশ্লেষক বলছেন, এই দুই নেতার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। শেখ হাসিনা যেখানে তোষামোদ উপভোগ করতেন, সেখানে তারেক রহমানের আচরণে এখনো সেই প্রবণতার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়নি।

বরং সাম্প্রতিক সময়ে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে এমন দৃশ্যও দেখা গেছে, যেখানে নেতা-কর্মীরা পা ছুঁয়ে সালাম করতে এলে তিনি নিজ হাতে তাদের সরিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রতি তার সম্মান ও সৌজন্যপূর্ণ আচরণও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, তোষামোদ একসময় মানুষকে আকৃষ্ট করে এবং ধীরে ধীরে তা উপভোগ্য হয়ে ওঠে। তারেক রহমান যদি সচেতনভাবে এই প্রবণতা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারেন, তাহলে তিনি কেবল জনপ্রিয় নেতা নন, বরং একজন সত্যিকারের গণতান্ত্রিক নেতৃত্বে রূপ নিতে পারবেন—এমনটাই তাদের বিশ্বাস।

একইসঙ্গে তারেক রহমানের এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় শঙ্কাও প্রকাশ করছেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা। সতর্ক করে বলছেন, ১৭ বছর আগের ‘হাওয়া ভবন’ বা নির্দিষ্ট কোনো সিন্ডিকেটের কালিমা যেন পুনরায় তাকে স্পর্শ করতে না পারে। বর্তমানে তাকে ঘিরে একদল মেধাবী তরুণ কাজ করলেও, চারপাশ থেকে চাটুকার সাংবাদিক ও সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীর ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ৩১ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়া স্মরণে নাগরিক শোকসভায় একজন সাংবাদিক দ্বারা আরেকজন সাংবাদিকের লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা তারই ইঙ্গিত দেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমান যদি এই ধরনের চাটুকার বেষ্টনী ভাঙতে না পারেন, তবে এই জনজোয়ার অচিরেই ভাটা পড়তে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমান এখন আর কেবল একজন প্রধানমন্ত্রীর পুত্র বা একটি বৃহৎ দলের উত্তরাধিকারী নন। তিনি এখন দেশের কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি এখন ‘চেঞ্জমেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে চাইছেন। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যদি বিচক্ষণতা এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত হয়, তবে আগামী নির্বাচনে জনগণের রায় তার পক্ষেই যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তরুণ সমাজ এখন এমন একজন নেতা খুঁজছে যিনি প্রতিহিংসা নয়, বরং সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হবেন- তারেক রহমান কি সে পথেই এগোচ্ছেন কি না, তা বলে দেবে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনের ফলাফল!

Pin It