‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছাড়া আ.লীগ কার্যালয় খোলার সাহস পেত না: নাহিদ

1771502149-b5380aa0067d80e071c0589e69c9aa7d

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নওগাঁ, গোপালগঞ্জ, খুলনা ও ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্নস্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা ও পতাকা উত্তোলন করা হয়।

কার্যালয় খোলার পেছনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ‘গ্রিন সিগন্যাল’ (সবুজ সংকেত) রয়েছে বলে মনে করছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বিএনপির কাছ থেকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছাড়া আওয়ামী লীগ এটা করার সুযোগ বা সাহস পেত না।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন নাহিদ। সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা নিয়ে দলীয় পর্যালোচনা জানাতে ই সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিল এনসিপি।

তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে ভারত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একধরনের যোগসাজশ হয়েছে।

আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ।

বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জবাবদিহি দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, অবিলম্বে প্রশাসনিকভাবে সেই কার্যালয় বন্ধ করায় যদি তারা ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধের ডাক দেব। সেটার জন্য এ সরকারকেও আমরা কাঠগড়ায় দাঁড় করাব ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসনের দায়ে।

আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার বিষয়টিকে ব্যাপকভাবে প্রচার করায় কিছু গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম।

মন্ত্রিসভা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি, স্থান পেয়েছে দুর্নীতিগ্রস্তরা: নাহিদ

নবগঠিত সরকারের মন্ত্রিসভা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি বলে দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেছেন, মন্ত্রিসভায় ব্যাপক ধরনের আর্থিকভাবে অস্বচ্ছ, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ঋণখেলাপির অভিযোগে অভিযুক্ত, হত্যা মামলার আসামি—এই ধরনের লোককে স্থান দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সমসাময়িক রাজনৈতিক ইস্যু এবং সদ্যগঠিত মন্ত্রিসভা নিয়ে এনসিপির আলোচনা-পর্যালোচনা তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, নির্বাচনের সাথে গণভোট একটি অঙ্গাঅঙ্গী বিষয় ছিল এবং গণভোট হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে।

যেই আদেশে খুবই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে একই দিনে শপথ অনুষ্ঠিত হবে এবং একই ব্যক্তি শপথ পড়াবেন। যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হবেন, তাদের সমন্বয়েই সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে একটি পরিষদ গঠিত হবে, যারা মূলত এই জুলাই সনদ এবং গণভোটে যেই সংস্কার প্রস্তাবনাগুলো ছিল সেগুলো বাস্তবায়ন করবেন এবং সেগুলো সংবিধানের সমন্বয় করবেন।

সংবিধান সংস্কার পরিষদকে কার্যকর করতে আমরা শপথ গ্রহণ করেছি। কিন্তু শপথ গ্রহণের দিন বাংলাদেশের সংস্কার প্রত্যাশী জনগণ, যারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে গণরায় দিয়েছে, তাদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা করা হয়েছে; সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে সরকারি দল শপথ গ্রহণ না করে।

এনসিপির আহ্বায়ক আরও বলেন, একটি ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এবং সংবিধানের দোহাই দেওয়ার মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া থেকে তারা বিরত থেকেছেন। এটি সংস্কারের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। নতুন বাংলাদেশের যে আকাঙ্ক্ষা, সেই আকাঙ্ক্ষার সাথে প্রতারণা করা হয়েছে এবং গণভোটে যে গণরায় এসেছে, সেই গণরায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে। সরকারি দল অতিদ্রুত শপথ নেবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়া এই জাতীয় সংসদের কোনো মূল্য নেই। গণঅভ্যুত্থানের পরে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে, নির্বাচনের মাধ্যমে, গণভোটের মাধ্যমে এই জাতীয় সংসদে যাচ্ছি। এটি কেবল জাতীয় সংসদ না, এই সংসদ একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে এবং সংবিধান পরিবর্তন করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কার, প্রতিষ্ঠানগুলোর যেই সংস্কার, সেই সংস্কারগুলো নিশ্চিত করবে। এটি না হলে বাংলাদেশ সেই আওয়ামী শেখ হাসিনার বাংলাদেশই থাকবে। ফলে দ্রুত জাতীয় সংসদ অধিবেশন ও সংস্কার পরিষদ অধিবেশন ডাকার আহ্বান জানান তিনি।

মন্ত্রিসভা নিয়ে কিছু পর্যালোচনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এই মন্ত্রিসভা দেখে আমাদের কাছে মনে হয়নি এটি পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বরং এটি পুরনো বন্দোবস্তের ধারাবাহিকতা হিসেবে আমরা দেখতে পাচ্ছি। প্রথমত এই মন্ত্রিসভায় আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করা হয়নি। এখানে একটা স্পষ্ট আঞ্চলিক বৈষম্য রয়েছে। এই মন্ত্রিসভা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি এবং প্রতিনিধিত্বশীল হয়নি। নারীর অংশগ্রহণ বলেন, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বলেন, সেটা যথেষ্ট পরিমাণ হয়নি। এই মন্ত্রিসভার গড় বয়স প্রায় ৬০। অর্থাৎ আমরা যে তারুণ্য নির্ভর বাংলাদেশের কথা ভেবেছি, জুলাইয়ে যেই তারুণ্য শক্তি বাংলাদেশকে পথ দেখিয়েছে, আমরা তার প্রতিফলন এই মন্ত্রিসভায় দেখতে পাইনি।

তিনি বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, এই মন্ত্রিসভায় ৬২ শতাংশ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীরা ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী হওয়া অপরাধ নয়, কিন্তু রাজনীতিবিদ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ থাকা উচিত। কিন্তু যখন আপনি অর্ধেকেরও বেশি ব্যবসায়ীদের মন্ত্রিত্ব দেবেন, তারা ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করবে, জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে না। এই ব্যবসায়ীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যকের বিরুদ্ধে  ঋণখেলাপির অভিযোগ রয়েছে। যেটি আমরা মনোনয়ন দেওয়ার সময় অভিযোগ করেছিলাম।

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, এই মন্ত্রিসভায় ব্যাপক ধরনের আর্থিক অস্বচ্ছ, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ঋণখেলাপির অভিযোগে অভিযুক্ত, হত্যা মামলার আসামি—এই ধরনের লোককে স্থান দেওয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই কিছু ভালো অভিজ্ঞ লোকদেরও এই মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়েছে, আমরা সেটাকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু আমরা আশা করেছিলাম যে, এই মন্ত্রিসভাটা জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রথম নির্বাচনে বিজয়ী সরকার, বিজয়ী দলের যে মন্ত্রিসভা হয়েছে, সেটা সম্পূর্ণরূপে ফ্রেশ থাকবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদ্বেষ্টা খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নাহিদ। তিনি বলেন, এই নিয়োগের কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা, নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের খোলার সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, গত দুই-একদিন ধরেই বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের একটা প্রচেষ্টা চলমান আছে। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলে দেওয়া হচ্ছে। কিছু কিছু গণমাধ্যমেও সেটাকে ব্যাপকভাবে প্রচার করছে; যেন উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগ কিন্তু কার্যত এবং আইনত নিষিদ্ধ একটি সংগঠন এবং তার বিচার প্রক্রিয়া চলমান আছে। ফলে এই বিচার প্রক্রিয়া চলমান অবস্থায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। মিডিয়া সেটা প্রচার করতে পারে না, প্রশাসন কোনোভাবেই সেটাকে প্রশ্রয় দিতে পারে না।

তিনি বলেন, আমরা আশঙ্কা করছি, এই নির্বাচনে এরকম একটা যোগসাজশ হয়েছে—ভারত, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে। আওয়ামী লীগের পুরা ভোট ব্যাংকটাকে বিএনপি নিজের দিকে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। বিএনপির বিভিন্ন বক্তব্যে, তার মঞ্চে জয় বাংলা স্লোগান দেওয়া, আওয়ামী লীগের লোকদের পুনর্বাসন করা, হত্যা মামলার আসামিদের নিজের দলে ভেড়ানো—এই চেষ্টা কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে হয়েছে।

আওয়মী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন নাহিদ ইসলাম। যেসব এলাকায় আওয়ামীলীগের কার্যালয় খুলেছে, সেগুলোর বিষয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

এছাড়াও সম্প্রতি গণমাধ্যমে হস্তপক্ষেপের অভিযোগ এনে স্বাধীনভাবে সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক।

Pin It