জাতির উদ্দেশে ভাষণে যা বললেন জামায়াত আমির

1770651755-fcf79cb9da398301481f8fd2ef2f0b91রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে প্রথম দিন ফজর নামাজ পড়েই সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা সুযোগ পেলে, মহান আল্লাহর ইচ্ছায় ও জনগণের ভালোবাসায় সরকার গঠন করলে প্রথম দিন ফজর নামাজ পড়েই আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন শুরু করব ইনশাআল্লাহ।

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি তার দলের পরিকল্পনা ও ভিশন দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।

তার প্রদত্ত ভাষণ এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো—

প্রিয় দেশবাসী,আসসালামু আলাইকুম। সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা। আশা করি আল্লাহর মেহেরবানিতে আপনারা সবাই ভালো আছেন, সুস্থ আছেন।

আজ আমি আপনাদের সামনে এখানে এসেছি কোনো গতানুগতিক রাজনৈতিক ভাষণ দিতে নয়।

আজ আমি একেবারে মনের ভেতরের কিছু কথা বলতে চাই। যে কথাগুলো একজন জেন-জি, একজন যুবক আর আমাদের প্রজন্ম সবার সঙ্গে সম্পৃক্ত। একজন মুসলমানের জন্য যেমন, তেমনি আমাদের দেশের অন্য ধর্মের ভাই-বোনদের জন্যও।প্রিয় দেশবাসী,আজ আমি এখানে যাঁদের কারণে কথা বলছি, সেই জুলাইয়ের শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি।

একই সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদেরও গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে এখনও বহু মানুষ আহত আছেন—আমি তাঁদের দ্রুত আরোগ্য ও সুস্থতা কামনা করছি। জুলাই হয়েছিল কারণ আমাদের দেশ এক হয়েছিল। জুলাইতে রাস্তায় নেমেছিল আমার তরুণ বন্ধুরা। রাস্তায় নেমেছিল আমাদের প্রিয় মা-বোন-মেয়েরা।
রাস্তায় নেমেছিল শ্রমিক, রিকশাশ্রমিক ভাইয়েরা এবং সকল মেহনতি জনতা। ফ্যাসিবাদবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও তখন এক হয়েছিল। শিক্ষক, প্রকৌশলী, ডাক্তারসহ সব শ্রেণির পেশাজীবী মানুষও রাস্তায় নেমে এসেছিল। দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও সে সময়ে প্রশংসনীয় দায়িত্ব ও ভূমিকা পালন করে। আমরা জুলাই আর চাই না; আমরা চাই এমন বাংলাদেশ, যেখানে আর কোনো দিন জনগণকে রাস্তায় নামতে না হয়।আমাদের বুঝতে হবে, জুলাই কেন হয়েছিল। জুলাই হয়েছিল একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য। জুলাই হয়েছিল একটি কালো রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তনের জন্য। যুগের পর যুগ ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল পরিবারতন্ত্রের হাতে, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে। সেখান থেকে মুক্তির জন্য।বিশেষ করে ২০০৯ সাল থেকে জাতির ওপর এমন এক শাসকগোষ্ঠী চেপে বসে, যারা মানবাধিকার, ভোটাধিকারসহ সকল গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয় এবং সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ফেলে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আয়নাঘর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের ওপর নিপীড়ন চালায়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচন নামে তামাশার মাধ্যমে আমাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়। এই সব নিপীড়ন ও অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্যই এসেছিল রক্তাক্ত জুলাই। আমাদের তরুণরা এখন একটি নতুন দেশ দেখতে চায়। যে দেশকে তারা গর্ব করে বলতে পারবে—নতুন বাংলাদেশ, এটি আমার দেশ—বাংলাদেশ ২.০।

এক কথায় যদি বলি, দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। কিন্তু একটি মহল পরিবর্তনের বিরোধী। কারণ পরিবর্তন হলেই তাদের অপকর্মের পথ বন্ধ হবে, মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। এই সংস্কৃতি বদলানোর সাহস সবার থাকে না। ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর হিম্মত সবার হয় না। এই হিম্মত দেখিয়েছে আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওসমান হাদী ও তাঁদের সহযোদ্ধারা। তাঁদের রক্তের শপথ নিয়ে নতুন প্রজন্মের লক্ষ লক্ষ সাহসী সন্তান আজ এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। এই দেশ আমাদের সময়ের এই সাহসী সন্তানদের হাতেই তুলে দিতে হবে। কারণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এই তরুণরা রচনা করবে।

এই তরুণরা পরিশ্রমী।
এই তরুণরা সাহসী।
এই তরুণরা মেধাবী।
এই তরুণরা পরিবর্তনকে ভালোবাসে।
এই তরুণরা নতুনকে আলিঙ্গন করে।
এই তরুণরা সত্য বলতে দ্বিধা করে না।
এই তরুণরা প্রযুক্তি বোঝে এবং সামনে এগিয়ে নিতে জানে।
তারাই পারবে নতুন বাংলাদেশ গড়তে।

আমরা তোমাদের হাত ধরতে চাই। জুলাইয়ের মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ার কাজে সঙ্গী হতে চাই। প্রচলিত ধারা বদলাতে চাই। দেশটাকে বিভেদ ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে মুক্ত করতে চাই, মানুষের জীবনে শান্তি ফিরুক—এটি আমাদের প্রয়াস। এই আমাদের চাওয়া। সবাইকে নিয়ে ঐক্যের বাংলাদেশ গড়তে চাই। এমন বাংলাদেশ, যেখানে কেবল পারিবারিক পরিচয়ে কেউ দেশের চালকের আসনে বসতে পারবে না। এমন বাংলাদেশ, যেখানে রাষ্ট্র হবে সবার, সরকার হবে জনগণের।

প্রিয় দেশবাসী,

জনগণ চায় একটু নিরাপত্তা, সুশাসন ও ইনসাফ। তাই আগামীর বাংলাদেশকে এসব অঙ্গীকার ও মূল্যবোধের আলোকে সাজাতে চাই। রাষ্ট্রের মৌলিক কিছু সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার পদক্ষেপ গ্রহণ করে; কিন্তু এসব পরিকল্পনার সবগুলো যেমন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, তেমনি অনেকগুলো একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এই বাস্তবায়ন সম্ভব হবে আগামীতে যে গণভোট—সেই গণভোটে আমরা যদি আমাদের মূল্যবান ভোট দিয়ে হ্যাঁ বলি, তাহলে সংস্কার প্রক্রিয়া তার পূর্ণতা পাবে ইনশাআল্লাহ। আমরা জনগণকে এজন্য বলব—গণভোটে হ্যাঁ বলুন এবং সংস্কারকে আলিঙ্গন করুন। আমাদের সন্তানদের স্বপ্ন পূরণে আপনিও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হোন।

নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার আলোকে আমাদের পরিকল্পনা, কর্মসূচি ও অঙ্গীকার আপনাদের নিকট স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশে আমরাই প্রথম পলিসি সামিটের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি-কৌশল জনগণের সামনে তুলে ধরেছি। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এর প্রতিফলন রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশের ও প্রবাসী বিশেষজ্ঞরা অবদান রেখেছেন। এছাড়াও আমরা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে বসেছি এবং তাঁদের মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ নিয়েছি। আমরা সুযোগ পেলে, মহান আল্লাহর ইচ্ছায় জনগণের ভালোবাসায় সরকার গঠন করলে প্রথম দিন ফজর নামাজ পড়েই আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন শুরু করব ইনশাআল্লাহ।

প্রিয় দেশবাসী,

আমাদের শাসক শ্রেণি সরকারি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর নিজেদেরকে দেশের মালিক গণ্য করেছে। ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, পদ-পদবি-নীতি-প্রতিষ্ঠান—সবকিছু ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ হাসিলের উপায় হিসেবে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেছে। এর ফলে চুরি, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে প্রতারণা করে জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করেছে। উন্নয়ন প্রকল্প ব্যক্তিগত ও দলীয় লুণ্ঠনের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ব্যবস্থার অবসান ঘটানোই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

আলহামদুলিল্লাহ, অতীতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে যারা জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংসদ, সরকার ও স্থানীয় সরকারে দায়িত্ব পালন করেছে, তারা কেউই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়নি। তারা দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনারা দেশের মানুষ—আপনারাই তার সাক্ষী।

প্রিয় দেশবাসী,

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতিকে একটি নতুন স্বপ্নের দিকে নিয়ে যাওয়ার এক মহাসুযোগ হিসেবে এসেছে। যেসব সমস্যা আমরা বিগত দিনে সমাধান করতে পারিনি, যে লুটেরা গোষ্ঠীকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি—সেসব সমস্যার সমাধান এবং লুটেরা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হচ্ছে আগামী নির্বাচন। তাই জনগণকে ঠিক করতে হবে—আমরা আমাদের নিজেদের জন্য, আমাদের তরুণদের জন্য, আমাদের নারীদের জন্য, বয়স্ক মানুষের জন্য, প্রান্তিক জনপদের জন্য, শ্রমিকের জন্য, উদ্যোক্তাদের জন্য—কোন বাংলাদেশ চাই।

আমাদেরকে প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে চাই, আমরা কি নিয়ম-নীতি-শান্তির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, আমরা কি উন্নত দেশ হতে চাই, আমরা কি শোষণ-জুলুম-দুর্নীতি-চাঁদাবাজিমুক্ত রাষ্ট্র চাই। আমাদেরকে ভাবতে হবে—আমরা কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে চাই, যোগ্যতা ও সততাকে সরকারি পদের জন্য মৌলিক শর্ত করতে চাই; আমরা কি আমাদের জাতীয় সক্ষমতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করতে চাই। এসব বিষয়ে যদি আমরা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চাই, তাহলে আমাদেরকে আগামী নির্বাচন নিয়ে নৈতিকভাবে ভাবতে হবে। রাজনৈতিক কথার ফুলঝুরির বাইরে এসে বাস্তবতার আলোকে সৎ, দক্ষ, নিষ্ঠাবান নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছি—আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ তৈরির জন্য ৫টি বিষয়ে হ্যাঁ এবং ৫টি বিষয়ে না বলতে হবে। সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে আমরা হ্যাঁ বলতে বলেছি। কারণ এসব মৌলিক শর্ত ছাড়া বৈষম্যহীন, উন্নত, নৈতিক মানসম্পন্ন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। পাশাপাশি দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব, চাঁদাবাজিকে স্পষ্ট করে না বলতে হবে।

প্রিয় দেশবাসী,

বাংলাদেশ আয়তনে ছোট কিন্তু জনসংখ্যায় বড় একটি দেশ। এ জনসংখ্যাকে অনেকে সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করলেও আমরা মনে করি এটি আল্লাহর নিয়ামত এবং এক বড় সম্পদ। তাই আমাদের জনসংখ্যাকে জনশক্তি হিসেবে রূপান্তর করতে হলে নীতি ও নৈতিকতাভিত্তিক রাজনীতির বিকল্প নেই। সমাজে নীতি-নৈতিকতা-শৃঙ্খলা-জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া কোনো জাতি এগোতে পারেনি। আমাদের পক্ষেও সম্ভব নয়।

নারী

যে সমাজ নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সেই সমাজ কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না। আমরা ক্ষমতায় এলে নারীরা কেবল ঘরের ভেতরে নয়, সমাজের মূলধারার নেতৃত্বে থাকবেন সগৌরবে। করপোরেট জগত থেকে রাজনীতি—সবখানেই তাঁদের মেধার মূল্যায়ন হবে কোনো বৈষম্য ছাড়াই। আমরা এমন এক দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যেখানে কোনো মা বা বোনকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না। আপনাদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গী হোন। একটি উন্নত ও আধুনিক দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে আমাদের নির্বাচিত করুন।

প্রিয় দেশবাসী,

আমরা মনে করি সমাজে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সকলকে মর্যাদা দিতে হবে এবং সকলের মানবাধিকার সুরক্ষা দিতে হবে। সকল পরিচয় নির্বিশেষে আমরা এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি—একটি মানবিক ও উন্নত দেশ গড়ার জন্য দল-মত-নির্বিশেষে সকলের মান-ইজ্জত-অধিকারের সুরক্ষা দেব। এই বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সবার। কেউ ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বাস করবে না। যদি কেউ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আঘাত করার চেষ্টা করে, আমরা অতীতের মতো ভবিষ্যতেও তা প্রতিরোধ করব।

প্রিয় দেশবাসী,

আমাদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়তে হলে তিনটি জায়গায় আমাদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
একটি হচ্ছে—শিক্ষায় সংস্কার।

শিক্ষা হতে হবে নৈতিকতাভিত্তিক এবং তা হতে হবে টেক-বেইজড। এখনকার সারা দুনিয়া প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল, আমরা সেই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। আমাদের সন্তানদের হাতকে আমরা দক্ষ কারিগরের হাত হিসেবে গড়ে তুলতে চাই এবং তাঁদের হাতে হাতে আমরা কাজ দিতে চাই। কোনো বেকার ভাতা তাঁদের তুলে দিতে চাই না।

দ্বিতীয় জায়গাটি হচ্ছে—বিচারাঙ্গন। ন্যায়বিচার সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলেই কেবল আমরা আমাদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়তে পারব। অন্যথায় দুঃশাসন এবং দুর্নীতির কণ্ঠরোধ মোটেই সম্ভব হবে না। অতএব বিচার বিভাগকে আমূল ঢেলে সাজাতে হবে। সেখানে অবশ্যই সৎ, দক্ষ ও কমিটেড যে সমস্ত লোক আছেন, তাঁদের বিচারের আসনে বসাতে হবে।

তৃতীয় জায়গাটি হচ্ছে—আমাদের অর্থনীতি। এই ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংকিং সেক্টরে এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক যে সমস্ত খাত রয়েছে, সে জায়গাগুলোতে আমাদের হাত দিতে হবে। আমাদের ব্যবসাকে করতে হবে বিনিয়োগবান্ধব। বিনিয়োগবান্ধব হলেই দেশে কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং আমাদের বেকারত্ব দূর হবে। এই তিনটি জায়গায় গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। আমরা আশা করব দেশবাসী আমাদেরকে তাঁদের মূল্যবান ভোটের আমানত অর্পণ করে আমাদের দেশকে প্রত্যাশার আলোকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবেন।

সম্মানিত ওলামায়ে কেরাম,

একাধিক ধর্মের এ দেশে মুসলমানগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই মুসলমান হিসেবে এটি আমাদের দায়িত্ব—সমাজে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। এগুলো ইসলামের শাশ্বত আদর্শ। সকল মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব; এটি আল্লাহ আমাদেরকে স্পষ্টভাবে বলেছেন। এ দায়িত্ব আমরা সকলে মিলেই পালন করব। প্রিয় তাবলিগ জামাতের ভাইয়েরা, আপনারা দ্বীনের জন্য যে মেহনত করছেন, দেশ গড়ার কাজেও আপনারা আমাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন—এ বিশ্বাস আমরা করি।

আমরা অঙ্গীকার করছি—ভবিষ্যতে কেউ আপনাদেরকে অন্যায়ভাবে বিভিন্ন বিশেষণে ট্যাগ দিয়ে নির্যাতন করতে পারবে না। বিচারবহির্ভূতভাবে আপনাদেরকে হত্যা করতে পারবে না। আমরা জানি, অতীতে আপনাদের কোনো মানবাধিকার ছিল না। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো হবে নতুন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। জাতীয় নীতি-পদ্ধতিতে আপনাদের আনুষ্ঠানিক অবদান ও ভূমিকাকে জোরদার করা হবে।

আন্তর্জাতিক ও জলবায়ু

আমরা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সম-মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক তৈরি করব। আমরা অন্যের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করব, তেমনি সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দেব। তবে আমাদের জাতীয় স্বার্থ, মর্যাদা ও জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্মাণে প্রধান ভূমিকা রাখবে। বৈশ্বিক উন্নয়ন চ্যালেঞ্জসমূহ, বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তন নিরসনে আমরা সাধ্যমতো ব্যবস্থা গ্রহণ করব এবং তা হবে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরিচালিত। নিপীড়নের শিকার হয়ে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাঁদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য সব ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হবে।

প্রিয় প্রবাসী ভাই ও বোনেরা,

জন্মভূমি থেকে হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে আপনারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। ইতোমধ্যে আপনারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নতুন বাংলাদেশে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে ইতিহাস রচনা করেছেন—আমি এতে আনন্দিত। আগামী দিনে দেশ গড়ার এই অভিযাত্রায় আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া আমাদের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে। আমরা চাই প্রবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে। সে লক্ষ্যেই প্রবাসীদের জন্য ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি নির্বাচন করা হবে—যাঁরা প্রবাসীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, সেবা ও সমস্যার বিষয়ে দূতাবাস বা হাইকমিশনের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করে উপদেষ্টা ও প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবেন।

তাছাড়াও বাংলাদেশের বাইরে যেখানে যেখানে সমস্যা রয়েছে—যেমন ইংল্যান্ডে ম্যানচেস্টার ফ্লাইট বন্ধ করে রাখা হয়েছে—আমরা কথা দিচ্ছি, আর কোনো ফ্লাইট বন্ধ হবে না। বরং পূর্বের চালু ফ্লাইটগুলো আমরা আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসব। নিউইয়র্কে নতুন করে বাংলাদেশের ফ্লাইট চালু হবে ইনশাআল্লাহ। এরকম দুনিয়ার যে যে জায়গায় ফ্লাইট চালু হওয়া দরকার, তা আমরা নিশ্চিত করার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। দেশ আর পেছনের দিকে যাবে না—সামনের দিকে এগিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

প্রবাসী ভাইয়েরা যখন বিদেশে মৃত্যুবরণ করেন, তখন অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় তাঁদের লাশ উপেক্ষিত হয়। আমরা কথা দিচ্ছি—যাঁরা আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা, তাঁরা আমাদের গর্বের ধন। কেউ যদি আল্লাহর ইচ্ছায় বিদেশে ইন্তেকাল করেন, আমরা অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে তাঁদের লাশ দেশে নিয়ে আসব ইনশাআল্লাহ। প্রবাসীরা যেন দেশে কোনোভাবে নিপীড়নের শিকার না হন—তা আমরা নিশ্চিত করব ইনশাআল্লাহ। প্রবাসীরাও যেন সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন—সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী করতে আনুপাতিক হারে সংসদে প্রবাসী প্রতিনিধি নির্বাচন বা মনোনয়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

প্রিয় দেশবাসী,

নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আমরা গিয়েছি। আপনারা আমাদের সভা-সমাবেশে যোগ দিয়েছেন; আমাদের কথা শুনেছেন। আপনাদের ভালোবাসা, অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় আমরা অভিভূত। আমরা আপনাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। আমাদের নির্বাচনী প্রচারণা বা অন্যান্য কার্যক্রমে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।

আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা সকল রাজনৈতিক দলের জন্য একটি বিরাট নৈতিক দায়িত্ব। তাই আমাদের আহ্বান হবে—নির্বাচনী আচরণবিধিকে সম্মান জানানো এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের বৈধ অধিকারকে সম্মান করা। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হবে—এটাই আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। আমাদের সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা অনেক কষ্ট করে আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান কভার করেছেন—আপনাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা। আপনাদের ঋণ শোধ করতে পারব না। আপনারা ভালো থাকবেন।

আমাদের দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং নির্বাচনী জোটের নেতৃবৃন্দ ও কর্মীগণ নিরলস পরিশ্রম করেছেন, আর্থিক ত্যাগ করেছেন। শেরপুরে আমার ভাই রেজাউল করিম প্রতিপক্ষের নির্মম আঘাতে শাহাদাত বরণ করেছেন। আল্লাহ সকলের ত্যাগ ও কুরবানি কবুল করুন। আমাদের ভাই জনাব মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বাদল, যিনি শেরপুর-৩ আসনের প্রার্থী ছিলেন, ইন্তেকাল করেছেন—আল্লাহ তাঁকে উত্তম পুরস্কার দিন ও জান্নাত নসিব করুন।

প্রিয় দেশবাসী,

আমরা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি—রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হচ্ছে আমানত। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কোনো উপভোগের বিষয় নয়। সর্বাবস্থায় আমরা স্মরণে রাখব—‘আমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং আমাদের দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ আমরা হযরত ওমরের সেই বিখ্যাত উক্তি ও দায়িত্বশীলতা মনে রাখব—“ফোরাতের তীরে একটি কুকুর না খেয়ে মরলেও আমি ওমর দায়ী থাকব।” আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকব, ইনশাআল্লাহ।

আশা করি আপনারা আমাদের অঙ্গীকার ও স্বপ্নকে বিশ্বাস করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাদের প্রতি সমর্থন দেবেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের দাঁড়ি-পাল্লা মার্কায় এবং যেসব অঞ্চলে ১১ দলীয় প্রার্থী আছে, সেসব এলাকায় ১১ দলীয় প্রতীকে ভোট দেওয়ার আকুল আবেদন আপনাদের প্রতি রাখলাম। আল্লাহ পরিবর্তনের এক মহাসুযোগ আমাদেরকে দিয়েছেন—আসুন, সেটা কাজে লাগাই। বিগত দিনের রাজনীতি পরিহার করি। একটি নতুন বাংলাদেশ তৈরি করি, যেখানে সবাই মান-ইজ্জত-মর্যাদা নিয়ে বাস করবে।
আল্লাহ আমাদের প্রতি সহায় হোন।

আমরা আমাদের তরুণ সমাজকে সমাজের ককপিটে বসিয়ে দিতে চাই। বাংলাদেশ নামক উড়োজাহাজটি তারাই চালাবে। তারাই হবে ক্যাপ্টেন, তারাই হবে পাইলট। আমরা বসব প্যাসেঞ্জার সিটে। হে তরুণরা, তোমরা তৈরি হয়ে যাও—এ দেশ তোমাদের জন্য, তোমাদের হাতেই তুলে দিতে চাই এবং এ দেশ তোমাদের হাতেই মানাবে। এ দেশ তোমাদের হাতেই গড়ে উঠবে। এটি আমাদের একান্ত প্রত্যাশা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নিরলসভাবে এ দেশকে গড়ে তোলার জন্য এবং দেশে বিদ্যমান সংকট নিরসনের জন্য সবসময় কাজ করে এসেছে—তা আপনারা সকলেই সাক্ষী। এমনকি আমাদের কষ্টের দিনগুলোতেও আমরা থেমে থাকিনি। আমরা জনগণের সুখ, দুঃখ, ব্যথা-বেদনার সমান অংশীদার ছিলাম। যেখানেই জনগণ কোনো কষ্টে পড়েছে, সেখানেই আমরা হাজির হওয়ার চেষ্টা করেছি। আপনারা তখন আমাদের বলতেন—এত কষ্ট বুকে চেপে আমাদের কাছে এসেছেন, এটি আশ্চর্য জিনিস। আমরা বলেছি—এটি আপনাদের কাছে আশ্চর্য হলেও আমাদের কাছে এটি ছিল পবিত্র কর্তব্য ও দায়িত্ব। কোনো বাধাই আমাদের সেদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। ইনশাআল্লাহ আগামীতেও আমাদের কোনো বাধা ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। আমরা আমাদের প্রিয় জনগণের। আমরা বিশ্বাস করি জনগণ আমাদের ভালোবাসেন। জনগণের এই ভালোবাসায় আমরা অভিভূত এবং আমরা পূর্ণ আস্থা রাখি আমাদের জনগণের রায়ের প্রতি।

আজকের এই পর্যায়ে এসে আপনাদের আরেকবার আহ্বান জানাই—আসুন, একটি নতুন বাংলাদেশ, তরুণদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ, জেন-জির জন্য আগামীর বাংলাদেশ, আমাদের নারীদের জন্য একটি নিরাপদ ও সম্মানের বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য আমরা সবাই আগামী ১২ তারিখ দাঁড়ি-পাল্লা এবং জোটের অপরাপর মার্কা যেখানে যেটি আছে, তাতে ভোট দিয়ে ১১ দলীয় প্রার্থীদের নির্বাচন করি। তাহলে ইনশাআল্লাহ প্রত্যাশার একটি দেশ আমরা খুঁজে পাব—একটি নতুন বাংলাদেশ পাব। আমরা বিশ্বাস করি জনগণ পরিবর্তন চায়; সেই পরিবর্তনের জন্যই আমাদের এই আহ্বান। এই পরিবর্তন আমাদের হাতেই ইনশাআল্লাহ মানাবে—অন্য কারো হাতে নয়। দৃশ্যত আপনারা বুঝতেই পারছেন।

আল্লাহ আমাদের অঙ্গীকার পালনে সহায়তা দিন।

বাংলাদেশ জিন্দাবাদ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জিন্দাবাদ
১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জিন্দাবাদ

Pin It