
নির্বাচনের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন ছাড়াও পটুয়াখালীর দশমিনা, বরগুনার বেতাগী, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ, শরীয়তপুর, বগুড়া, পঞ্চগড়, হবিগঞ্জ, খুলনা, রাজবাড়ী, চট্টগ্রাম, কুড়িগ্রাম, পাবনা, চাপাইনবাবগঞ্জ ও নোয়াখালীসহ সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের উপস্থিত হতে দেখা গেছে। কোথাও তালা ভেঙে প্রবেশ, কোথাও জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আবার কোথাও ব্যানার টাঙিয়ে দ্রুত সরে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব কর্মসূচি ছিল স্বল্পসময়ের এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আবার প্রকাশ্যে আসতে শুরু করায় স্থানীয় রাজনীতিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কোথাও তারা সংক্ষিপ্ত কর্মসূচি পালন করে দ্রুত সরে যাচ্ছেন, কোথাও প্রশাসন ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকে না পেয়ে ফিরে আসছে। বেশ কয়েকটি ঘটনায় পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্টদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ এখন সরাসরি বড় কর্মসূচির বদলে ‘উপস্থিতি জানানোর’ কৌশল নিয়েছে। ছোট ছোট প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সংগঠনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইছে। একই সঙ্গে তারা দেখছে, বিএনপির প্রতিক্রিয়া কতটা কঠোর বা সহনশীল হয়। এই প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের কৌশল।
অন্যদিকে বিএনপির ভেতরেও এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। একটি অংশ মনে করছে, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক পরিসরে ফিরতে দিলে ভবিষ্যতে তা বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। আবার আরেকটি অংশের যুক্তি, বহুদলীয় গণতন্ত্রে একটি বড় দলকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রাখা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে এবং এতে তৃতীয় শক্তি লাভবান হতে পারে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনের আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘জনগণ চাইলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্তানরাও রাজনীতিতে ফিরতে পারেন।’
এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক মহল কেবল ব্যক্তিগত মন্তব্য হিসেবে দেখছে না; বরং এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরুঙ্কুশ বিজয়ের পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেন গণঅভ্যুত্থানে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভি–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছিলেন, ‘আমি সবসময়ই উন্মুক্ত। আমি এমন একজন মানুষ, যে সবসময় আলোচনায় বিশ্বাস করে; তা যত কঠিনই হোক বা যার সঙ্গেই হোক। এটাই আমার কৌশল; জীবনে সবসময়ই এভাবেই চলেছি।’
বিএনপির বিপুল বিজয়ের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘আইনের শাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমাধান হবে।’
সবশেষ বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) নতুন সরকারের মন্ত্রী হিসেবে প্রথম কর্মদিবসে আওয়ামী লীগের বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এটা আমরা রাজনৈতিকভাবে পরে জানাব। এ নিয়ে আমাদের সরকারে আলোচনার পরে আপনাদের জানাব।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পালাবদলের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন এবং সজীব ওয়াজেদ জয় যুক্তরাষ্ট্রে থাকায় কার্যকর নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও রাজনীতিতে ফেরার প্রশ্নটি অনেকাংশে বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ এবং বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর নির্ভর করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্য সমঝোতা না থাকলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একটি নীরব সমীকরণের আভাস মিলছে। তবে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে সাংগঠনিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ও জাতীয় রাজনীতির পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, কলামিস্ট এবং শিক্ষাবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারি বলেন, আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে দেশকে স্থিতিশীল করা কঠিন। আবার তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দিলে জামায়াত-এনসিপি মেনে নেবে না। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী ভোটাররাও এটা মেনে নেবে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে।
তাহলে বিএনপি কী করতে পারে, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিচার করতে হবে। তাহলে হয়তো ধীরে ধীরে তারা আসতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করে যদি তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।




