সাম্প্রতিক সময়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মন্দা থেকে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম কিছুটা গতি হারিয়েছে বা শ্লথ হয়ে পড়েছে। যেখানে প্রতিবেশী দেশগুলোর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম স্থিতিশীল রয়েছে। এ কারণে চলতি অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কমানো হয়েছে। আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতা নিয়ে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখলে বিদ্যমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা হ্রাস পাবে। পাশাপাশি দেশের শিল্প খাত চাঙা হবে। এসব কারণে আগের পূর্বাভাসের চেয়ে দ্রুততর গতিতে সরকারি ব্যয় এবং বিনিয়োগ বাড়বে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস, জানুয়ারি ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এসব আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। এতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের তথ্য স্থান পেয়েছে। প্রতি তিন মাস পরপর বিশ্বব্যাংক এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে আগামী বছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়বে। শিল্প খাত চাঙা হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও শক্তিশালী হবে। মূল্যস্ফীতির হার কমে আসবে। ফলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারও বাড়বে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা সংক্রমণ ও বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিও মন্দায় আক্রান্ত হয়েছে। সেই মন্দা থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ শক্তিশালী গতিতেই এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আগে চলমান মন্দা থেকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে কিছুটা গতি হারিয়েছে। অথচ পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম স্থিতিশীল থাকায় চলতি অর্থবছরের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হারের পূর্বাভাস আগের চেয়ে কিছুটা কমানো হয়েছে। জুনে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছিল চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
দেশে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জানুয়ারিতে এসে আগের পূর্বাভাস থেকে দশমিক ৩ শতাংশ কমিয়ে চলতি অর্থবছরের জিডিপির নতুন পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে ৪ দশমকি ৬ শতাংশ। তবে আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ওই বছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে ৬ দশমিক ১ শতাংশ। এর আগে দেওয়া হয়েছিল ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ফলে আগামী অর্থবছরেই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের ঘরে প্রবেশ করতে পারবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হওয়ার কারণে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হারও কমে আসবে বলে বিশ্বব্যাংক আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
প্রতিবেদনে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলা হয়েছে, আগামী সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে বর্তমান সরকারের নেওয়া কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রমগুলো অব্যাহত রাখলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা হ্রাস পাবে। ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের ব্যয় বাড়বে, বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাবে। যা দেশের শিল্প খাতকে চাঙা করে তুলবে। এতে ভোগ বাড়বে। মূল্যস্ফীতির হার কমে আসবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মে মাস থেকে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার ফলে ডলারের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। কখনো কখনো টাকার মান শক্তিশালীও হচ্ছে। ভারতের মুদ্রা ডলারের বিপরীতে বেশ চাপে পড়েছে। ডলারের বিপরীতে রুপির মান কমে যাচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশের মুদ্রার মান স্থিতিশীল রয়েছে। বাংলাদেশের মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখতে আরও নমনীয় নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তারা বলেছে, ডলারের বিপরীতে মুদ্রার মানকে আরও অবমূল্যায়ন করতে হবে।
জানুয়ারির তুলনায় জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও নভেম্বরে এসে তা আবার সামান্য বেড়েছে।
রাজস্ব খাত নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে রাজস্ব আহরণ একেবারেই কম। তার মধ্যেই রাজস্ব খাত সংস্কারের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। যা আগামীতে রাজস্ব আহরণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্ক বৃদ্ধি বা অন্যান্য বাণিজ্য বিধিনিষেধের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা এই রপ্তানি চাহিদা এবং অর্থনৈতিক কার্যকলাপকে কমিয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশ ও শ্রীলংকাসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর বৈদেশিক বাণিজ্য রয়েছে এমন দেশগুলোর জন্য বিদ্যমান পরিস্থিতি বাড়তি ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।
চলতি অর্থবছরের ভুটানের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ভারতের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, নেপালের ২ দশমিক ১ শতাংশ, শ্রীলংকার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মালদ্বীপের ৩ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে।





