জামায়াতের ৪১ দফা ইশতেহার: দুর্নীতিমুক্ত ইনসাফের রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার

February 5, 2026
1770215670-bbf81c439f467d782f2a1a7793a557f9আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৪১ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ঘোষিত ইশতেহারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সব ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিত, পার্বত্য এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা, নারীর কল্যাণ, দুর্নীতি দমন, কর্মসংস্থান, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরশীল দেশ গড়ার ব্যাপক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহারের মোড়ক উন্মোচন করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তাদের ইশতেহারের নাম দিয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’।

৪১ দফা নির্বাচনী ইশতেহারে ২৬টি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে:

১. ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন।২ বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন।

৩. যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় আদেরকে প্রাধান্য দেওয়া।

৪. নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন।

৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ।

৬. সব পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন।৭. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন।

৮. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ।

৯. ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ।

১০. সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা।১১. বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা।

১২. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাইযোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে।

১৩. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা।

১৪. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়া।১৫. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি।

১৬. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ; বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ, সৃষ্টি করা।

১৭. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সব অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

১৮. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়, বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবার নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা।

১৯. আধুনিক ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

২০. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা।

২১. দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা।

২২. যাতায়াতব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা।

২৩. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা।

২৪. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা।

২৫. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

২৬. সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা।

২৬. সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুধী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

মায়েদের জন্য ৫ ঘণ্টা কাজ, ৭ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান: জামায়াতের ইশতেহার

জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে বেকারত্ব দূর করতে কর্মসংস্থান নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছে। যেখানে বলা হয়—বেকারত্ব দূর করতে সাত কোটি কর্মক্ষম যুবকের জন্য দুই ভাগে কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে। সেটি দেশে ও দেশের বাইরে দুই জায়গাতেই করা হবে।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহারের মোড়ক উন্মোচন করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরির জন্য পলিসি প্রস্তুত করার কথাও বলেছে দলটি। এজন্য যথাযথ প্রশিক্ষণের কথাও ইশতেহারে তুলে ধরা হয়েছে।

বিদেশে যেতে আগ্রহী বেকার জনশক্তিদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, কম খরচে বিদেশে যাওয়ার জন্য আন্তঃসরকার চুক্তি, বিদেশ যাত্রায় ঋণ প্রদান ও ৫০ লাখ যুবকদের বিদেশে কর্মসংস্থানেরও পরিকল্পনা রয়েছে জামায়াতের।

জামায়াত তাদের ইশতেহারে বলেছে, দলটি ক্ষমতায় এলে নারীদের সম্মান রক্ষা করে নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।

সেই সাথে মাতৃত্বকালীন সময়ে মায়েদের সম্মতি সাপেক্ষে কর্মঘণ্টা পাঁচ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হবে।
এ সময়ে জামায়াতে আমির শফিকুর রহমান বলেন, “নারীদের যেন চাকরি না ছাড়তে হয় সেজন্য মায়েদের কর্মঘণ্টা কমানোর কথা বলেছি। অথচ এটা নিয়ে নানা কথা ছড়ানো হলো। আমরা নাকি নারীদের চাকরি করতে দিতে চাই না।

আমরা চাই—অনেক নারী মা হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দেন, তাদের যেন চাকরি না ছাড়তে হয়, সেজন্য কর্মঘণ্টা শিথিল করার কথা বলেছি।”
সরকারি চাকরির আবেদনের জন্য যে ফি নেওয়ার রীতি আছে, জামায়াত ক্ষমতায় এলে এই নিয়ম বাতিল করা হবে বলে ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এছাড়া ব্যবসায়ী সমাজের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের অঙ্গীকারও করেছে দলটি।


Powered By vQsolution