শরিয়াহ গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করতে বোর্ডকে আইনি সুরক্ষা দিতে হবে: গভর্নর

April 9, 2026

Untitled-10-69d684193baf6

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের শরিয়াহ বোর্ডের ক্ষমতায়নের ওপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।

তিনি বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকিং সঠিক পথে ফেরাতে হলে শরিয়াহ বোর্ডকে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে। তাদের সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। স্বাধীনভাবে কাজের আইনি নিশ্চয়তা দিতে হবে। শক্তিশালী শরিয়াহ গভর্ন্যান্স নিশ্চিত হলেই প্রকৃত তদারকি ফিরে আসবে। তখন আর ব্যাংকে অনিয়ম বন্ধ হবে। কেউ ব্যাংকের অর্থ পাচার করতে পারবে না। তখন ইসলামী ব্যাংকের ওপর আস্থা বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সম্প্রতি শীর্ষস্থানীয় শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ, আলেম-উলামা এবং ইসলামী ব্যাংকের শরীয়াহ বোর্ডের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ‘ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বর্তমান পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।

দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং শরিয়াহ মান্যতা শক্তিশালী করতে বড় ধরনের সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়ে গভর্নর জানান, শরিআহ বোর্ডের সদস্যরা স্বাধীনভাবে কাজ করবেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পূর্ণ সুরক্ষা প্রদান করবে।

তিনি বলেন, অতীতে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অর্থপাচারের ঘটনা ঘটেছে। এর অন্যতম কারণ ছিল যথাযথ তদারকির অভাব।

গভর্নর বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং মূলত সম্পদভিত্তিক কাঠামোর উপর পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই কাঠামো পুরোপুরি অনুসরণ না হওয়ায় ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে, যা উদ্বেগজনক। পরবর্তীতে এরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বদ্ধপরিকর।

সভায় আলেম-উলামাদের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সংকট উত্তরণে তুলা ধরা ২০ দফা সুপারিশের মধ্যে রয়েছে মৌলিক নীতির বাস্তবায়নের লক্ষ্যের সুদমুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, প্রতারণামুক্ত লেনদেন ও লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগি ভিত্তিক বিনিয়োগ। তদারকি ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি, সেক্রেটারিয়েট ও অডিট শক্তিশালী করা, বড় বিনিয়োগে অন্তত ৩ সদস্যের শরিয়াহ অনুমোদন বাধ্যতামূলক ও মুরাকিবদের (শরিয়াহ অডিটর) সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা পরিপালনের মাধ্যমে স্বতন্ত্র ‘ইসলামী ব্যাংকিং আইন’ প্রণয়ন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য আলাদা ডেপুটি গভর্নর ও পৃথক কমপ্লায়েন্স বিভাগ গঠন। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য বছরে অন্তত একবার বাহ্যিক শরিয়াহ অডিট, শরিয়াহ কমপ্লাইন্স রেটিং চালু ও আলাদা কোর ব্যাংকিং সিস্টেম প্রচলন করা।

একইভাবে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ব্যাংক পরিচালক ও এমডিদের শরিয়াহ জ্ঞান বাধ্যতামূলক, আলেমদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ব্যাংকে অন্তর্ভুক্তি ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী অর্থনীতি বিভাগ চালু। আর্থিক ও বাজার সংস্কারের লক্ষ্যে শরিয়াহসম্মত মুদ্রাবাজার উপকরণ চালু, তারল্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা ও খেলাপি বিনিয়োগ দ্রুত আদায়ে কার্যকর নীতিমালা প্রচলন। ইসলামী ব্যাংকিং যথাযথভবে পরিচালনা নিশ্চিক করার লক্ষ্যে ঠোর শাস্তির মাধ্যমে অর্থপাচার বন্ধ করা। বড় দুর্নীতিকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য করা, কঠোর ফৌজদারি শাস্তির দাবি ও ইসলামী ব্যাংকিং হাব গড়ার পরিকল্পনা।

আলোচনায় বাংলাদেশকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাবও উঠে আসে। গবেষণা কেন্দ্র ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি স্থাপন, আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন, বিশ্বখ্যাত শরিয়াহ স্কলারদের আমন্ত্রণ ও কনভেনশনাল ব্যাংকে ও ইসলামী সেবা সেবা বাড়াতে হবে।

সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের শরীয়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে অধ্যাপক ড. আবু বকর রফিক, মুফতি শাহেদ রহমানী, ড. মুফতি ইউসুফ সুলতানসহ শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকের শরীয়াহ বোর্ডের চেয়ারম্যান ও প্রতিনিধিরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইসলামিক স্কলার ও খ্যাতিমান আলেম-উলামারা সভায় অংশ নেন।

ডলারের দর বৃদ্ধির কোনো চাপ দেখছে না বাংলাদেশ ব্যাংক

বিদেশি মুদ্রা বাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বাজার বর্তমানে স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ রয়েছে। টাকার বিনিময় হারের ওপর অবমূল্যায়নের কোনো তাৎক্ষণিক চাপ নেই।

অর্থাৎ ডলারের দর বাড়ার মতো কিছু ঘটেনি বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

বুধবার (৮ এপ্রিল) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্রের দপ্তর থেকে এ সংক্রান্ত একটি লিখিত পর্যালোচনা সাংবাদিকদের সঙ্গে শেয়ার করেন সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিক।

পর্যালোচনায় পর্যাপ্ত তারল্য এবং ফরেন রিজার্ভ সন্তোষজনক পরিস্থিতিতে রয়েছে বলে জানানো হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার আন্তঃব্যাংক ডলারের দর ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা।

এতে বলা হয়, ব্যাংক খাতে ৬ এপ্রিল প্রায় ৩৯০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা তারল্য বিদ্যমান। ২৬ ফ্রেরুয়ারি যা ছিল ২৩০ কোটি ডলার।

অর্থ্যাৎ আলোচিত সময়ে বৈদেশিক মুদ্রায় তারল্য ১৬০ কোটি ডলার বেড়েছে। এরপরও ব্যাংকগুলোতে ২৬ ফেব্রুয়ারি নগদ বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি ছিল ৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলার, যা ৬ এপ্রিল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারে।ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব ক্যাশ হোল্ডিং এবং অন্যান্য উৎস মিলিয়ে এই তারল্য দৈনন্দিন আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক লেনদেন নির্বিঘ্নে সম্পাদনে সহায়ক ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যাংকগুলোর বিদেশি মুদ্রার ধারনের নেট ওপেন পজিশন (এনওপি) ৬০-৭০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত বাজার থেকে ডলার ক্রয় করে থাকে।

বর্তমানে ব্যাংকগুলোর এনওপি আনুমানিক ১০০ কোটি ডলার হওয়া সত্ত্বেও বাজার থেকে কোনো ডলার কেনা হয়নি কিংবা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত একমাসে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে কোনো ডলার কেনেনি বলেও উল্লেখ করা হয় ওই পর্যালোচনা প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বাজারে স্বাভাবিক তারল্য বজায় রেখে বাজার থেকে ডলার কিনলে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি দাঁড়াতো।

রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, প্রবাসী আয় প্রবাহ শক্তিশালী রয়েছে। মার্চ মাসে ৩৭৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। যা পূর্ববর্তী যে কোনো একক মাসের তুলনায় বেশি।

চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম ৬ দিনে (১-৬ এপ্রিল) ৬৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০.৫ শতাংশ বেশি।

এই প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়ে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আমদানি ও বৈদেশিক পরিশোধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক

আমদানি ব্যয় ও বিদেশি ঋণ পরিশোধ নিয়মিত ও পরিকল্পিত ধারায় চলছে। গত মাসে ১৩৭ কোটি ডলার আকু (এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন) বিল পরিশোধ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ১৮ কোটি ডলারের সমপরিমাণ সরকারি বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। এর পরও দেশে ৬ এপ্রিল বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৪.৩৫ বিলিয়ন ডলার হয়েছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এই রিজার্ভ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পাদনে একটি শক্তিশালী সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আরও বলছে, ডলার বাজারে মূল্যমানে কোন চাপ নেই এবং ডলারের মূল্যমান স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমেই রক্ষিত হচ্ছে। সার্বিকভাবে বিদেশি মুদ্রার সরবরাহ ও চাহিদা বর্তমানে ভারসাম্যপূর্ণ রয়েছে।


Powered By vQsolution