গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বহুল কাঙ্ক্ষিত জাতীয় নির্বাচনের পর ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামী বৃহস্পতিবার বসতে যাচ্ছে। বেলা ১১টায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অধিবেশন বসার কথা রয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকারের পদত্যাগ এবং ওই সংসদের ডেপুটি স্পিকার কারাগারে আটক থাকায় জ্যেষ্ঠ সংসদ-সদস্য হিসাবে তিনি এই গুরু দায়িত্ব পালন করবেন। তার সভাপতিত্বে প্রথম দিনই নতুন সংসদের স্পিকার নির্বাচন করা হবে।
এছাড়াও সংসদের প্রথম অধিবেশন হওয়ায় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে এদিন উদ্বোধনী ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এই অধিবেশনে সংসদ উপনেতা এবং ডেপুটি স্পিকার কে হবেন, তাও জানা যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্যও এই অধিবেশনে নির্ধারিত হবে। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তা না হলে এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
এদিকে অধিবেশন শুরুর আগের দিন বুধবার বেলা ১১টায় সংসদীয় দলের সভা আহ্বান করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। সংসদ ভবনে সরকারি দলের সভাকক্ষে বিএনপির চেয়ারম্যান ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এই সভা অনুষ্ঠিত হবে। এই সভায় অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন তা যেমন ঠিক করা হবে; তেমনি স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার পদেও দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করবে বিএনপি। এ প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি সোমবার বলেন, সংসদীয় দলের সভায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হবে। বিশেষ করে অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে দল কাকে মনোনয়ন দেবে-এসব বিষয়ে এই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে। এছাড়াও সভায় সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি, শৃঙ্খলা এবং দলীয় অবস্থান নিয়ে আলোচনা হবে।
এদিকে অধিবেশনকে সামনে রেখে যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ করে এনেছে সংসদ সচিবালয়। নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা অধিবেশন কক্ষে কে কোথায় বসবেন, তাও ইতোমধ্যে ঠিক করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীসহ সংসদ-সদস্যদের প্রশ্নোত্তর পর্ব তৈরি, জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একাধিক নোটিশ জমা পড়েছে। এই অধিবেশনে গঠন করা হবে সংসদীয় কমিটিগুলোও। মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি, এমন অনেক সিনিয়র নেতাকে দেখা যেতে পারে সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদে। বিরোধী দল থেকেও সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের সংসদ আগের গতানুগতিক কোনো সংসদের মতো হবে না। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর সংস্কারের যে জন-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পড়েছে এই সংসদের ওপর। বিশেষ করে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়নসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিষ্পত্তি হবে এখানে। রাজনৈতিক দলগুলো বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। এই সনদ সংসদে পাস করানোর দায় রয়েছে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর। বিশেষ করে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ইস্যুতে প্রথম অধিবেশনেই উত্তপ্ত হতে পারে জাতীয় সংসদ। তবে এই উত্তাপ সংকটে রূপ নেয় কিনা, তা দেখার জন্য সবার দৃষ্টি এখন সংসদ অধিবেশনের দিকে। নির্বাচনের পর সরকারি দলের নির্বাচিতরা শুধু সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ নিয়েছেন। আর বিরোধী দলের সদস্যরা নিয়েছেন দুটি শপথ। একটি সংসদ-সদস্য হিসাবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বলছেন, একই দেশে দুই নিয়ম চলতে পারে না। তাই সবার অপেক্ষা অধিবেশন শুরুর মাহেন্দ্রক্ষণের দিকে; যার মধ্য দিয়ে মাঠের রাজনীতি গড়াবে জাতীয় সংসদে। একই সঙ্গে প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে সংসদ।
ইতোমধ্যে প্রধানন্ত্রী হিসাবে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি তাদের মিত্রদের নিয়ে সরকার গঠন করেছে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। চিফ হুইপ, হুইপ, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ পদও এরই মধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া চিফ হুইপ হলেন নুরুল ইসলাম মনি। হুইপরা হলেন জি কে গউছ, রকিবুল ইসলাম বকুল, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, আখতারুজ্জামান মিয়া এবং এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান। এবারের সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের দায়িত্ব পালন করবেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এরই মধ্যে বিএনপি ও জামায়াত- দুপক্ষই সংসদকে কার্যকর করতে দলীয় সংসদ-সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, আশা করি আমাদের ভবিষ্যৎ সংসদ অধিবেশন দেখে জাতি অনেকটা আশ্বস্ত হবে। অতীতে সংসদে যেসব নেতিবাচকতা সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলো মানুষের মন থেকে আমরা মুছে দেব। তিনি আরও বলেন, এই অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন করা হবে। শোক প্রস্তাব উত্থাপন শেষে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশের মানুষ একটি কার্যকর ও প্রাণবন্ত সংসদ দেখার অপেক্ষায় রয়েছে। রাজনীতিতে নানা মত ও পথ থাকবে। তবে আমরা আশা করব সংসদই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হোক। তিনি আরও বলেন, গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হওয়ায় জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দায়িত্বও এই সংসদের ওপর পড়েছে। এখন দেখার বিষয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো কী করে।
গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর দেড় বছর পর ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। সংবিধান অনুযায়ী, কোনো সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠানের জন্য সংসদের প্রথম অধিবেশন ডাকতে হবে। ১৩ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনে জয়ী সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। সাধারণত গেজেট প্রকাশের পর বিদায়ি সংসদের স্পিকার নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথ পড়ান। তবে এবার এর ব্যতিক্রম হচ্ছে।
সংবিধান অনুযায়ী, তিন দিনের মধ্যে স্পিকার বা তার মনোনীত ব্যক্তি শপথ না পড়ানোর কারণে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দীন নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথ পড়ান। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ছিলেন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্পিকার পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। এরপর থেকে আত্মগোপনে আছেন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। বিদায়ি ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক (টুকু) হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে এখন কারাগারে।
প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম





