২০২৪ সালের আগস্টে পরিবেশ বিপর্যয়ের উদ্বেগজনক প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকারের পরিবেশ সম্পর্কিত উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পান ঢাকার পরিচিত পরিবেশ আন্দোলনের মুখ রিজওয়ানা হাসান। দেড় বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর তিনি এখন আবার নাগরিক পরিসরে সক্রিয়। তবে তার সময়কার সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট।
সরকারে থাকা অবস্থায় তার দাবি করা প্রধান কাজ
প্রথমত, সুপারশপগুলোতে একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন ব্যাগ নিয়ন্ত্রণে নজরদারি জোরদার করা হয়। তার দাবি, বড় সুপারশপগুলোতে পলিথিন ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে।
তৃতীয়ত, নগর পার্ক রক্ষায় প্রশাসনিক অবস্থান স্পষ্ট করা হয়। কিছু স্থানে অবকাঠামোগত বাণিজ্যিক হস্তক্ষেপ স্থগিত বা পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
চতুর্থত, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে মোবাইল কোর্ট ও সচেতনতামূলক অভিযান পরিচালিত হয়। হর্ণ বাজানো নিয়ন্ত্রণকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে “চ্যালেঞ্জিং কিন্তু প্রয়োজনীয়” উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তার সময়কার অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল সেন্টমার্টিন দ্বীপ। প্রবালসমৃদ্ধ এই দ্বীপে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট এবং হোটেল নির্মাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ ছিল।
রিজওয়ানা হাসান দায়িত্বে থাকাকালে সেন্টমার্টিনে পর্যটক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণ এবং হোটেল নির্মাণে কঠোরতার প্রশ্নে প্রশাসনিক অবস্থান স্পষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। কিছু সময়ের জন্য পর্যটকসংখ্যা সীমিত করার সিদ্ধান্তও আলোচনায় আসে।
তবে পর্যটন ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের একটি অংশ দাবি করেন, হঠাৎ বিধিনিষেধ আরোপে জীবিকায় প্রভাব পড়েছে, কিন্তু টেকসই বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা স্পষ্ট ছিল না। পরিবেশবাদীদের একাংশের মতে, সেন্টমার্টিন রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ইকো-ম্যানেজমেন্ট পরিকল্পনা এবং কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন ছিল, যা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
পরিবেশ সূচকে অবনতি ও সমালোচনা
দেড় বছরের এই সময়ে দেশের সামগ্রিক পরিবেশ সূচকে উন্নতির চিত্র স্পষ্ট নয়। বায়ুদূষণ, পানিদূষণ ও মাটিদূষণের মতো মৌলিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি—এমন অভিযোগ পরিবেশকর্মীদের।
পরিবেশবিদ ডা. কামরুজ্জামান বলেন, “তার সময় মিডিয়া কাভারেজ বেশি ছিল, কিন্তু কাঠামোগত বাস্তবিক কোনো সংস্কার হয়নি। একজন পরিবেশবিদ হিসেবে তার কাছ থেকে যে গভীর নীতিগত পরিবর্তন আশা করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি।”
তার মতে, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ, কঠোর শিল্প মনিটরিং এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান—এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
সাদাপাথর: প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় প্রশ্ন
সাদাপাথর এলাকায় পাথর উত্তোলন ও চুরির বিষয়টিও তার সময় ব্যাপক আলোচিত হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনিক নজরদারি দুর্বল থাকায় নদী ও ঝিরি থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন অব্যাহত ছিল।
পরিবেশবাদীদের দাবি, সাদাপাথর কেবল পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি একটি সংবেদনশীল নদী-ইকোসিস্টেম। নির্বিচারে পাথর সরিয়ে নেওয়ায় পানিপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য ও নদীতীর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রিজওয়ানা হাসান প্রকাশ্যে অবৈধ উত্তোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও সমালোচকদের প্রশ্ন—কেন স্থায়ী নজরদারি ব্যবস্থা ও কঠোর শাস্তিমূলক দৃষ্টান্ত গড়ে তোলা গেল না? মাঠপর্যায়ে অভিযান হলেও তা ধারাবাহিক হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
আনোয়ারা উদ্যান বিতর্ক
আনোয়ারা উদ্যান দখলমুক্ত রাখার কৃতিত্ব নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা দাবি করেছেন, সরকারিভাবে পদক্ষেপ নিয়ে উদ্যানটি রক্ষা করা হয়েছে। তবে ড. কামরুজ্জামানের বক্তব্য, দীর্ঘদিন মাঠে থেকে নাগরিক আন্দোলন ও গণমাধ্যমের চাপই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি।
বিশেষ করে Tree Protection Movement–এর মতো সংগঠন ধারাবাহিক অবস্থান কর্মসূচি, মানববন্ধন ও আইনি উদ্যোগের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে এনেছে। তার মতে, “চাপ সৃষ্টি করেছে মূলত আন্দোলনকারীরাই।”
পান্থকুঞ্জ ও নীতিগত অবস্থান
পান্থকুঞ্জ পার্ক–এ এক্সপ্রেসওয়ে র্যাম্প স্থাপন নিয়ে আন্দোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, নীতিগতভাবে দাবির সঙ্গে একমত থাকলেও উপদেষ্টা হিসেবে সরাসরি আন্দোলনে যুক্ত হওয়া তার দায়িত্ব ছিল না।
সমালোচকদের মতে, এখানেই তার ভূমিকার দ্বৈততা স্পষ্ট—আন্দোলনকর্মী থেকে নীতিনির্ধারক হয়ে ওঠার রূপান্তর সবক্ষেত্রে সমন্বিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।
বর্তমান অবস্থান: আবারও নাগরিক পরিসরে
সরকারি দায়িত্ব শেষে রিজওয়ানা হাসান অবসরে যাননি। তিনি আবারও পরিবেশবাদী প্ল্যাটফর্ম, আইনি লড়াই ও নাগরিক সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছেন। মাঠপর্যায়ের আন্দোলন ও নীতিনির্ধারণে কৌশলগত সমন্বয়ের দিকে জোর দিচ্ছেন।
তার মতে, সরকারে থাকার অভিজ্ঞতা তাকে প্রশাসনিক জটিলতা বুঝতে সহায়তা করেছে। এখন আন্দোলনে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আরও বাস্তবভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
রিজওয়ানা হাসানের দেড় বছরের সরকারি অধ্যায় এক দ্বৈত বাস্তবতা তুলে ধরে। একদিকে পলিথিন নিয়ন্ত্রণ, খাল পুনরুদ্ধার, সেন্টমার্টিনে নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগ ও পার্ক রক্ষার মতো দৃশ্যমান পদক্ষেপের দাবি; অন্যদিকে মৌলিক পরিবেশ সূচকে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়া, সাদাপাথরে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে স্থায়ী কাঠামো গড়ে না ওঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কারের অভাবের সমালোচনা।
সব মিলিয়ে, অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ অধ্যায় এখন মূল্যায়নের পর্যায়ে—সীমিত অর্জন, অসমাপ্ত কাজ এবং প্রত্যাশা–বাস্তবতার ফারাকের এক জটিল পর্যালোচনা।




