গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দুই ফাইনালিস্টের লড়াইয়ে পাত্তাই পেল না শিরোপাধারী ভারত।
পাঁচ ওভার শেষে দক্ষিণ আফ্রিকার রান ৩ উইকেটে ৩১। পাঁচ ওভারে ভারতের রান ৩ উইকেটে ২৯। শুরুর বিপর্যয় সামলে দক্ষিণ আফ্রিকা দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ালেও, ভারত সেটা পারল না। মিডল অর্ডারে তিনটি ঝড়ো ইনিংসে প্রোটিয়ারা যত রান তুলল পরের ১৫ ওভারে, গোটা ইনিংসেও তা স্পর্শ করতে পারল না ভারতীয়রা।
গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দুই ফাইনালিস্টের লড়াইয়ে পাত্তাই পেল না শিরোপাধারীরা। ৭৬ রানের বড় জয়ে সুপার এইটে যাত্রা শুরু করল গতবারের রানার্স আপ দক্ষিণ আফ্রিকা।
আহমেদাবাদের নরেন্দ মোদী স্টেডিয়ামে রোববার আনুষ্ঠানিক হিসাবে দর্শক উপস্থিতি ছিল ৯০ হাজার ৯৫৪ জন। ২০ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকা করে ৭ উইকেটে ১৮৭ রান। জবাবে ৮৮ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে একশর আগে গুটিয়ে যাওয়ার চোখরাঙানি এড়িয়ে ১১১ পর্যন্ত যেতে পারে ভারত।
বিশ্বকাপে এর চেয়ে কম রানে ভারত অলআউট হয়েছে কেবল একবারই, ২০১৬ আসরে নাগপুরে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ৭৯।
রানের হিসাবে বিশ্বকাপে তাদের সবচেয়ে বড় হার অবশ্য এটিই। আগের বড় হার ছিল ২০১০ আসরে ব্রিজটাউনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪৯ রানে।
বিশ্বকাপে রেকর্ড টানা ১২ জয়ের পর পরাজয়ের তেতো স্বাদ পেল ভারত।
দক্ষিণ আফ্রিকার জয়ের নায়ক ডেভিড মিলার। চাপের মুখে পাঁচ নম্বরে ব্যাটিংয়ে নেমে পাল্টা আক্রমণে সাত চার ও তিন ছক্কায় ৩৫ বলে ৬৩ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচ-সেরার স্বীকৃতি পান তিনিই।
চার নম্বরে তিনটি করে চার ও ছক্কায় ২৯ বলে ৪৫ রান করেন ডেওয়াল্ড ব্রেভিস। ছয় নম্বরে তিন ছক্কা ও এক চারে ২৪ বলে অপরাজিত ৪৪ রানের ইনিংস খেলেন ট্রিস্টান স্টাবস।
ভারতের হয়ে শিভাম দুবের ৪২ ছাড়া আর কেউ ১৮ রান পার হতে পারেননি। টানা তিন শূন্যের পর অবশেষে বিশ্বকাপে রানের দেখা পেয়েছেন আভিশেক শার্মা।
চতুর্থ উইকেটে ৫১ বলে ৯৭ রানের জুটি গড়েন ডেভিড মিলার (বাঁয়ে) ও ডেওয়াল্ড ব্রেভিস। ছবি: রয়টার্স
২২ রানে ৪ উইকেট নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার সফলতম বোলার পেস বোলিং অলরাউন্ডার মার্কো ইয়ানসেন। আরেক অলরাউন্ডার কর্বিন বশ ১২ রানে ২টি ও বাঁহাতি স্পিনার কেশাভ মহারাজ ২৪ রানে নেন ৩টি উইকেট।
বোলিংয়ে প্রথম ওভারেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে সাফল্যে এনে দেন অধিনায়ক এইডেন মার্করাম। অফ স্পিনারকে উড়িয়ে মারার চেষ্টায় টাইমিং করতে না পেরে ক্যাচ দেন ইশান কিষান।
ওই ওভারেই মুখোমুখি প্রথম বলে চার মেরে রানের দেখা পান আভিশেক। পরের ওভারে প্রথম বলে তিলাক ভার্মাকে কট বিহাইন্ড করে ফেরান ইয়ানসেন।
কাগিসো রাবাদাকে একটি করে ছক্কা ও চার মেরে ভালো কিছুর ইঙ্গিত দেন আভিশেক। কিন্তু পঞ্চম ওভারে ইয়ানসেনকে তুলে মেরে বশের চমৎকার ক্যাচে বিদায় নেন বাঁহাতি ওপেনার (১২ বলে ১৫)।
প্রমোশন দিয়ে পাঁচ নম্বরে পাঠানো হয় ওয়াশিংটন সুন্দারকে। তিনি বিদায় নেন একটি ছক্কা মেরেই। সহজ ক্যাচ দিয়ে ফেরেন অধিনায়ক সুরিয়াকুমার ইয়াদাভ (২২ বলে ১৮)।
দশম ওভারে ৫১ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে অনেকটাই ছিটকে পড়ে ভারত।
প্রয়োজনীয় রানরেটের দাবি মেটাতে পারেননি হার্দিক পান্ডিয়া, দুবেরা। এই দুজন ষষ্ঠ উইকেটে ৩৫ রানের জুটিতে বল খেলেন ৩০টি। ইনিংসের সর্বোচ্চ জুটি এটিই।
মহারাজ একই ওভারে ফেরান পান্ডিয়া (১৭ বলে ১৮), রিঙ্কু সিং ও আর্শদিপ সিংকে। দুবের তিন ছক্কা ও এক চারে গড়া ৩৭ বলে ৪২ রানের ইনিংসে পরাজয়ের ব্যবধানই শুধু কমাতে পারে ভারত। পরপর দুই বলে দুবে ও জাসপ্রিত বুমরাহকে ফিরিয়ে ম্যাচের ইতি টেনে দেন ইয়ানসেন।
শেষের মতো ভারতের জন্য ম্যাচের শুরুটাও হয় হার দিয়ে। টসে হারেন সুরিয়াকুমার। ভারত অধিনায়ক জানান, জিতলে তিনিও ব্যাটিং নিতেন। তার সেই চাওয়া পূরণ না হলেও, বোলিংয়ে শুরুটা স্বপ্নের মতো হয় ভারতের।
দ্বিতীয় ওভারে কুইন্টন ডি কককে বোল্ড করে দেন বুমরাহ। পরের ওভারে আর্শদিপ ফেরান মার্করামকে। একটি ছক্কা মেরে রায়ান রিলেকটন বিদায় নেন বুমরাহর পরের ওভারে।
চার ওভারে ২০ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে তখন ধুঁকছিল দক্ষিণ আফ্রিকা।
সেখান থেকেই পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন মিলার। রহস্য স্পিনার ভারুন চক্রবর্তিকে পরপর দুটি চারে ডানা মেলেন তিনি।
ভারুনের দ্বিতীয় ও ইনিংসের নবম ওভারে ঝড় বয়ে যায়। ৯৫ মিটারের বিশাল একটি ছক্কা মারেন মিলার। একটি চার ও একটি ছক্কা মারেন ব্রেভিস। নিজের প্রথম দুই ওভারে ভারুন দেন ২৮ রান।
দুই ব্যাটসম্যানই আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে এগিয়ে নেন দলকে। ত্রয়োদশ ওভারে দুবেকে ছক্কা মেরে পঞ্চাশের দুয়ারে গিয়ে পরের বলে বিদায় নেন ব্রেভিস। থামে ৫১ বলে ৯৭ রানের জুটি।
ওই ওভারেই ছক্কা মেরে মিলার চলতি আসরে প্রথম ফিফটি পূর্ণ করেন ২৬ বলে। ষোড়শ ওভারে তাকে থামান ভারুন।
ইয়ানসেন ও বশ শেষের দাবি মেটাতে না পারলেও, কাজটা ভালোমতোই করেন স্টাবস। ইনিংসের শেষ দুই বলে পান্ডিয়াকে ছক্কায় উড়িয়ে দলকে ১৮৭ রানের পুঁজি এনে দেন তিনি।
একটি উইকেট পেলেও চার ওভারে ভারুন দেন ৪৭ রান। বুমরাহ অবশ্য দারুণ বোলিংয়ে ১৫ রানে নেন ৩ উইকেট। তবে সেটি কাজে এলো না।
২০২৪ আসরের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে জয়ের দুয়ারে থেকে নাটকীয়ভাবে হেরে শিরোপার স্বপ্ন ভেঙেছিল দক্ষিণ আফ্রিকার। এবারের লড়াইটি যদিও নকআউটে নয়। তারপরও এই জয়ে হয়তো দেড় বছর আগের ক্ষতে একটু প্রলেপ দিতে পারল প্রোটিয়ারা।
গ্রুপ পর্বে চার ম্যাচের সবকটি জয়ের পর সুপার এইটে পথচলার শুরুটাও দারুণ হলো মার্করামদের।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
দক্ষিণ আফ্রিকা: ২০ ওভারে ১৮৭/৭ (মার্করাম ৪, ডি কক ৬, রিকেলটন ৭, ব্রেভিস ৪৫, মিলার ৬৩, স্টাবস ৪৪*, ইয়ানসেন ২, বশ ৫, রাবাদা ০*; আর্শদিপ ৪-০-২৮-২, বুমরাহ ৪-০-১৫-৩, ভারুন ৪-০-৪৭-১, ওয়াশিংটন ২-০-১৭-০, পান্ডিয়া ৪-০-৪৫-০, দুবে ২-০-৩২-১)
ভারত: ১৮.৫ ওভারে ১১১ (কিষান ০, আভিশেক ১৫, তিলাক ১, সুরিয়াকুমার ১৮, ওয়াশিংটন ১১, দুবে ৪২, পান্ডিয়া ১৮, রিঙ্কু ০, আর্শদিপ ১, ভারুন ০*, বুমরাহ ০; মার্করাম ১-০-৫-১, ইয়ানসেন ৩.৫-০-২২-৪, রাবাদা ৪-০-৩২-০, এনগিডি ৪-০-১৫-০, মহারাজ ৩-০-২৪-৩, বশ ৩-০-১২-২)
ফল: দক্ষিণ আফ্রিকা ৭৬ রানে জয়ী
ম্যান অব দা ম্যাচ: ডেভিড মিলার





