রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও ঐতিহাসিক জুলাই ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কারের বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা গঠন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদ নির্দিষ্টকরণ এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতাসহ ৩৫টি সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করা হয়েছে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বিগত ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এবং বিএনপির ৩১ দফার ভিত্তিতে এই সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এতে সংবিধানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপনের পাশাপাশি ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বাতিলকৃত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের ইশতেহার ঘোষণা করেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবনাসমূহ:
১. সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিগত ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
২. ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা হবে।
তবে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বাইরে রাখতে চায় বিএনপি। উল্লেখ্য, বিএনপি সরকারের সময়ই এদেশে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল যা ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে বাতিল করা হয়।
৫. একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে যত মেয়াদ বা যতবারই হোক, তিনি সর্বোচ্চ ১০ (দশ) বছর অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদেও অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন।
৭. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।
৮. সংবিধানের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুন্ন রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতার লক্ষ্যে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি ও অন্যান্য পেশাজীবীদের সমন্বয়ে সংসদে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রবর্তন করা হবে। রাজনৈতিক দলসমূহ নিম্নকক্ষের অর্জিত আসন সংখ্যার আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবে।
৯. আইনসভার উভয়কক্ষে দুইজন ডেপুটি স্পিকারের মধ্য থেকে একজন ডেপুটি স্পিকার সরকার দলীয় ব্যতীত অন্যান্য সদস্যদের মধ্য থেকে মনোনীত করা হবে।
১০. নিম্নকক্ষের সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের সময় উচ্চকক্ষের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের প্রয়োজন হবে না। উচ্চকক্ষে কমপক্ষে ১০% নারী সদস্য থাকবেন।
১১. আস্থাভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধনী বিল এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত (যেমন: যুদ্ধ পরিস্থিতি) এমন সব বিষয় ব্যতীত অন্যসব বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রদানের সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে।
১২. সংবিধান সংশোধনী, অর্থবিল, আস্থাভোট এবং জাতীয় নিরাপত্তা (যুদ্ধ পরিস্থিতি) ইত্যাদি ছাড়া অন্যসব বিল উচ্চকক্ষে প্রেরণ করা হবে। উচ্চকক্ষ কোনো বিল সর্বোচ্চ ১ (এক) মাসের বেশি আটকে রাখলে তা উচ্চকক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত বলে বিবেচিত হবে।
১৩. আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনকালে জাতীয় স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সম্পাদিত চুক্তি সম্পর্কে জাতীয় সংসদকে অবহিত রাখা হবে।
১৪. দক্ষ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও দৃঢ়চিত্ত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর নির্বাচন কমিশন গঠন করার লক্ষ্যে জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়ন করা হবে।
১৫. সরকারি কর্মকমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের জন্য এবং মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে। পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সাধারণ (অন্য সকল সেক্টরে) নিয়োগের জন্য যথোপযুক্ত শক্তিশালী কাঠামোতে রূপান্তর করা হবে।
১৬. বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ আইনানুসারে সরকার কর্তৃক নিয়োগ প্রাপ্ত হবেন।
১৭. সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম দুই জন বিচারপতির মধ্য থেকে একজনকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগ প্রদানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা হবে।
১৮. রাজধানীতে সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন থাকবে। তবে, প্রধান বিচারপতি প্রতিটি বিভাগে এক বা একাধিক স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।
১৯. সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে অধিকতর শক্তিশালী ও এর এখতিয়ার বৃদ্ধি করা হবে।
২০. অধঃস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের উপর ন্যস্ত করার জন্য সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে।
২১. আইনের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়ে স্থায়ী প্রসিকিউশন/অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করা হবে।
২২. জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এসব কমিটিসহ জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ সংসদে প্রাপ্ত আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধীদলের মধ্য থেকে নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
২৩. রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সংবিধানে এরূপ বিধান যুক্ত করা হবে যে, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করার এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত মানদণ্ড, নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণক্রমে তিনি ওই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।
২৪. নির্বাচন কমিশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে।
২৫. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যকর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এরূপ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও তহবিল ব্যবস্থাপনার জন্য যথাযথ আইন প্রণয়ন করা হবে।
২৬. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীদের সাথে এরূপ প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক যথাযথ আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে।
২৭. পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ এবং পুলিশি সেবাকে জনবান্ধব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে একটি পুলিশ কমিশন গঠন করা হবে। এতদসংক্রান্ত অধ্যাদেশটি প্রয়োজনীয় সংস্কার/পর্যালোচনার মাধ্যমে যথাযথ আইন প্রণয়ন করা হবে।
২৮. একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস গঠন করার বিষয়টি সংসদে পর্যালোচনা করে দেখা হবে।
২৯. জুলাই অভ্যুত্থানকালে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত এবং ভোট জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের চিহ্নিতকরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে।
৩০. ঐতিহাসিক জুলাই ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে গণঅভ্যুত্থানকারীদের আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
৩১. ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগ করা হবে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বিএনপি আমলে সৃষ্ট ‘কর ন্যায়পাল’ পদটি বেশ কার্যকর বলে বিবেচিত হয়েছিল।
৩২. বেসরকারি খাতের দুর্নীতির তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োেগ নিশ্চিত করা হবে।
৩৩. জাতীয় সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে বাংলাদেশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘ওপেন গভর্নমেন্ট পার্টনারশিপ’র পক্ষভুক্ত করা হবে।
৩৪. আয়কর রিটার্ন প্রাইভেট ডকুমেন্ট হলেও দুর্নীতি দমন কমিশন অথবা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ যেন আদালতের মাধ্যমে তা তলব করতে পারবে, তার নিশ্চয়তা বিধান করা হবে।
৩৫. রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিজ্ঞ আইনজীবীদের সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা তাদের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার – এ নীতিকে সমুন্নত রাখা হবে।
কৃষক কার্ড-ঋণ মওকুফ-নিরাপদ খাদ্যের প্রতিশ্রুতি দিলো বিএনপি
কৃষিখাতকে জাতীয় সমৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে রূপান্তর এবং কৃষকের জীবনমান উন্নয়নের জন্য একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
দলটির ইশতেহারে কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার কার্ড’ প্রবর্তন, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ এবং ক্ষুদ্র ঋণের এক বছরের কিস্তি সরকার কর্তৃক পরিশোধের ঘোষণা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ কন্ট্রোল অথরিটি’ গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি পুনঃ বাস্তবায়ন এবং মৎস্যখাতে ‘জাল যার জলা তার’ নীতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকারও রাখা হয়েছে।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ইশতেহার উপস্থাপন করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
ক. কৃষক ও কৃষি উন্নয়ন
কৃষি বাংলাদেশের জীবনরেখা। ফসল উৎপাদন, মৎস্য চাষ ও পশু পালনের মাধ্যমে জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কোটি মানুষের জীবিকা রক্ষা এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে কৃষির ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু স্বল্প দৃষ্টিসম্পন্ন নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারের কারণে কৃষিখাত দীর্ঘদিন ধরে তার সম্ভাবনা অনুযায়ী বিকশিত হতে পারেনি।
পাশাপাশি স্বল্প ব্যয়ে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ, কৃষি বিমা সুবিধা, ন্যায্য মূল্যে কৃষি পণ্য বিক্রয়ের সুবিধা ও কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ পাওয়া যাবে। তাছাড়া কৃষক কার্ড দিয়ে মোবাইলে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য, মোবাইলে ফসলের চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া যাবে। মৎস্যচাষি ও প্রাণিসম্পদ খামামিরাও কৃষক কার্ডের সুবিধা পাবেন। এর পাশাপাশি কৃষিখাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সহায়তা পাবেন। প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদে উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ডাটা বেইস গড়ে তুলে রাষ্ট্রীয় সমর্থন পাওয়ার যোগ্য প্রকৃত কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন করা হবে।
উল্লেখ্য যে, বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণের সুদ-আসল মওকুফ করা হয়েছিল, যা কৃষকদের কষ্ট লাঘব করে কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল।
৩. ক্ষুদ্র ঋণের এক বছরের কিস্তি সরকার কর্তৃক পরিশোধ: মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়ে এই কঠিন সময়ে বিভিন্ন ক্ষুদ্রঋণ এর কিস্তি শোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। বিএনপি সরকার গঠন করলে নিবন্ধিত এনজিওদের কাছে থেকে নেওয়া ক্ষুদ্রঋণের এক বছরের কিস্তি ক্ষুদ্র ঋণগ্রহণকারীদের পক্ষ থেকে সরকার এনজিওদের দেবে। এই সাশ্রয়ে জীবন সহনীয় হবে। এই সাশ্রয় দিয়ে চাহিদামতো পুষ্টিকর খাবারসহ অন্যান্য চাহিদা মেটানো যাবে।
৪. বরেন্দ্র প্রকল্প পুনঃচালুকরণ ও আম সংরক্ষণে বিশেষ হিমাগার স্থাপন: বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির সার্বিক উন্নয়নে বরেন্দ্র প্রকল্প পুনরায় চালু করা হবে। বরেন্দ্র অঞ্চলের খালগুলো খনন করা হবে। যথাযথভাবে আম সংরক্ষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘বিশেষ হিমাগার’ স্থাপন করা হবে।
৫. ফসলের ন্যায্যমূল্য ও কৃষিজমি সুরক্ষা এবং ক্রয় কেন্দ্র নির্মাণ: কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হবে। কৃষকদের হাতকে শক্তিশালী ও টেকসই করার জন্য সঠিক বাজারজাতকরণ নীতি প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি উচ্চমূল্য ও উচ্চফলনশীল ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করা হবে এবং তথ্যভিত্তিক টার্গেটেড পলিসি সাপোর্ট দেওয়া হবে। কৃষি জমির অকৃষি ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ন্যায্যমূল্যে পণ্য ক্রয়ের জন্য সরকারি ক্রয় কেন্দ্র স্থাপন এবং দেশব্যাপী কোল্ড স্টোরেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে।
৬. কৃষি বিমা ব্যবস্থা: প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকের ঝুঁকি হ্রাস এবং কৃষি উৎপাদনে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও শস্য বিমা, পশু বিমা, মৎস্য বিমা এবং পোল্ট্রি বিমা চালু ও সম্প্রসারণ করা হবে।
৭. খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন: শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’ পুনঃবাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প নেওয়া হবে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে হারিয়া যাওয়া ৫২০ টি নদী, হাজার হাজার খাল এবং তাদের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার ও সেচ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো হবে।
৮. উত্তরাঞ্চলে কৃষি পণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠা: উত্তরাঞ্চলের কৃষি-নিবিড় জেলাগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষায়িত কৃষি পণ্য রপ্তানি অঞ্চল গড়ে তুলে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের ব্যাপক কর্মসংস্থান ও সে অঞ্চলের সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।
৯.তরুণদের আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধিকল্পে স্টার্ট-আপ প্রকল্প গ্রহণ এবং ‘কৃষি উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম’ গঠন করা হবে।
১০. অঞ্চলভিত্তিক কৃষি পণ্য উৎপাদন ও গবেষণায় গুরুত্ব প্রদান: যে অঞ্চলে যে ফসল ভালো হয়, সে অঞ্চলে সেই ফসল চাষের টার্গেটেড পলিসি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। লবণাক্ততা সহিষ্ণু, কম পানির ফসল, দ্রুত পাকার জাতসহ আধুনিক কৃষি গবেষণা জোরদার করা, কৃষি গবেষণা কেন্দ্রগুলোকে আরো উন্নত ও শক্তিশালী করা এবং কৃষি গবেষণায় বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে।
১১. প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার: আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্যনির্ভর ‘প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার’ চালু করে উৎপাদন খরচ কমানো ও কৃষকের আয় বাড়ানো হবে। সুষম, নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথোপযুক্ত প্রণোদনার মাধ্যমে গোটা কৃষি খাতকে পুনর্বিন্যাস ও বিকশিত করা হবে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বীজ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার হ্রাস করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
১২. চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও কৃষি: চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃষিকে আধুনিক, দক্ষ ও টেকসই খাতে রূপান্তরের লক্ষ্যে রিমোট সেন্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন ও ন্যানো প্রযুক্তি কৃষিতে প্রয়োগ করা হবে। বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে জৈব সার ও বায়োচার উৎপাদন ও ব্যবহার সম্প্রসারণ করে মাটির গুণাগুণ উন্নয়ন ও রাসায়নিক স্যারের ওপর নির্ভরতা কমানো হবে। কৃষির যান্ত্রিকীকরণে সরকারি প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা জোরদার করা হবে, যাতে সময়, শ্রম ও ব্যয় সাশ্রয় হয়।
১৩. জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা: জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষিকে টেকসই, আধুনিক ও জলবায়ু-সহিষ্ণু ভিত্তিতে পুনর্গঠনের জন্য সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নেওযা হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
১৪. সমবায় পুনরুজ্জীবন: সমবায় খাতকে পুনরুজ্জীবিত করে এলাকাভিত্তিক উৎপাদন ও বিপণনের ওপর বিশেষায়িত কৃষি সমবায় সমিতি গঠন করা হবে। কৃষিখাতে উৎপাদন ও লাভ বৃদ্ধিকল্পে আধুনিক সমবায় কৃষি ব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
১৫. প্রাণিসম্পদ খাত উন্নয়ন: হাঁস-মুরগি ও মৎস্য খামারের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত ‘ফিড’ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। প্রতি উপজেলায় পর্যাপ্ত পশু-রোগ প্রতিষেধক ঔষধের জোগান নিশ্চিত করা এবং পশু-রোগ চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে।
দেশের পোলট্রি, মাংস ও ডেইরি শিল্পের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নীতি সহায়তা ও সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হবে। এই খাতে নারী উদ্যোক্তা, তরুণ উদ্যোক্তা, প্রবাসী উদ্যোক্তাসহ সকল ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের ঋণ সহায়তা প্রদান ও সরকারিভাবে পশু চিকিৎসা সহায়তা জোরদার করা হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেলের মাধ্যমে ফিড উৎপাদন ও ‘ভ্যাকসিন প্ল্যান্ট’ স্থাপনের প্রয়াস নেওয়া হবে।
১৬. মৎস্যখাত উন্নয়ন: জলমহাল, উপকূলীয় খাল ও হাওরের ইজারা প্রথা বিলুপ্ত করে এগুলো ‘জাল যার জলা তার’ এই নীতির ভিত্তিতে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
জেলেদের মৎস্য আহরণের নিষিদ্ধ মৌসুমে বিকল্প কর্মসংস্থান ও খাদ্য সহায়তা জোরদার করা হবে। উন্নত মাছের প্রজাতি উদ্ভাবন, মানসম্মত ফিড উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হবে। রোগমুক্ত পোনা ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান, হ্যাচারিগুলোতে পিসিআর ল্যাব সুবিধা বৃদ্ধি করা, মৎস্যচাষিদের বিজ্ঞানসম্মত অ্যাকুয়াকালচার গ্রহণে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।
চিংড়ির একটি বৈশ্বিক ব্রান্ড তৈরি এবং বিদেশে সুপারশপগুলোতে মানসম্মত সরবরাহ, ব্যবস্থাপনা সুগম করে এই খাতের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি নিশ্চিতকল্পে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
খ. নিরাপদ খাদ্য
বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন হবে জাতীয় অগ্রাধিকার খাত।
১. ভেজাল প্রতিরোধ: ভেজাল প্রতিরোধ, বিশেষ করে খাদ্যে ও ঔষধে ভেজাল রোধে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার ও আইনি ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
২. প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও মনিটরিং বৃদ্ধি: দেশব্যাপী নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, নকল ও ভেজাল খাদ্য ভোগ্যপণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপণণরোধে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই নিরাপদ খাদ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সক্ষম করতে পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ, মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক তদারকি বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তাসংক্রান্ত আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
৩. নিরাপদ ফসল উৎপাদনের গুরুত্বারোপ : নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে কৃষক পর্যায় থেকে গুরুত্বারোপ করা হবে। এক্ষেত্রে জৈব কৃষি, নিরাপদ সার এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতির উপর ব্যাপকভাবে গুরুত্বারোপ করা হবে। পাশাপাশি, ভোক্তা পর্যায়েও সচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
৪. প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং হিমাগার স্থাপন: দেশজুড়ে ফল ও সবজির পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং হিমাগার স্থাপন করা হবে, যাতে পচন ও অপচয় কমে, কৃষক লাভবান হয়, এবং ভোক্তারা পায় নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর খাদ্য। কৃষক ও বাজারের সরাসরি সংযোগ গড়ে তোলা হবে।
৫. ‘খাদ্য ও ঔষধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ গঠন: একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ‘খাদ্য ও ঔষধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ গঠন করা হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে।
৬. খাদ্য আমদানিতে স্বচ্ছতা আনয়ন ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন: খাদ্য আমদানি প্রক্রিয়াকে দুর্নীতিমুক্ত করা হবে এবং ক্রমান্বয়ে খাদ্য আমদানি কমিয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হবে।
বিদেশে এক কোটি জনশক্তি পাঠানো ও ঝুঁকিমুক্ত অভিবাসন লক্ষ্য বিএনপির
ইশতেহারে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানকে বিএনপি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি জনশক্তিকে বিদেশে পাঠানো ও ঝুঁকিমুক্ত অভিবাসন নিশ্চিত করাই দলের লক্ষ্য।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশের প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, জীবন ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর ও দূতাবাস সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে।
বিদেশে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে পাঁচ বছরের মধ্যে এক কোটি জনশক্তি পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে।
প্রবাসী কার্ড: দক্ষতা, চাকরি ও রেমিট্যান্স সুবিধাসহ তথ্য সংরক্ষণ।
প্রবাসী কল্যাণ ফাউন্ডেশন: মৃত্যু, দুর্ঘটনা বা চাকরি হারলে সহায়তা, এসএমই ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সুবিধা।
ওভারসিজ স্কিলস ইনভেস্টমেন্ট পার্ক: দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন।
ডিজিটাল স্কিল ব্যাংক ও সার্টিফিকেশন: দক্ষ কর্মীদের যাচাই ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সার্টিফিকেট দেওয়া।
ওয়ান-স্টপ প্রবাসী সাপোর্ট সেন্টার: আইনি, প্রশাসনিক ও পুনর্বাসনসহ সেবা নিশ্চিত করা হবে।
ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, প্রবাসীরা যেন নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন, দেশে ফেরার পর পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পান এবং ‘প্রবাসী সিটি’তে আধুনিক সুবিধা সমৃদ্ধ আবাসন পেতে পারেন।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি প্রবাসী নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও মানবপাচার রোধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ ছাড়া দূতাবাসগুলোকে গতিশীল ও সেবামুখী করে বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করা হবে।




