অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের হতাশাকেই নির্বাচনের আগ মুহূর্তে তাদের ক্ষোভ প্রকাশের কারণ হিসেবে দেখছেন একজন বিশ্লেষক।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের সব প্রস্তুতি যখন শেষ পর্যায়ে, সেই সময়ে এসে নির্বাচন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হচ্ছে কিনা–সেই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের তরফে।
যে ব্যক্তিরা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন কমিশন ও কমিটিতে যুক্ত ছিলেন, সরকারের শেষ সময়ে তারাই যুক্ত হচ্ছেন সমালোচনায়।
আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হচ্ছে কি না–সেই প্রশ্ন যেমন তোলা হচ্ছে, তেমনি কোনো ‘দল-মতের রঙহীন সরকার’ কেন একটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ‘উপহার দিতে পারল না’, সে কথাও বলা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের হতাশাকেই নির্বাচনের আগ মুহূর্তে তাদের ক্ষোভ প্রকাশের কারণ হিসেবে দেখছেন রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদও মনে করছেন, সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে ‘নানা রকম ক্ষোভ’ জন্মেছে বিভিন্ন মহলে।
তবে শেষ সময়ে এসে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের এসব প্রশ্ন তোলার পেছনে ‘অন্যরকম উদ্দেশ্য’ আছে বলে মনে করন নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম। বলেন, সরকারের শেষ সময়ে এসে এসব নিয়ে ক্ষোভ না ঝেড়ে এগুলো নিয়ে আগে আলোচনা করা দরকার ছিল।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। দলটির নেতা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে ভারতে চলে যান।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই দলটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি ছিল অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের। ওই দাবিতে আন্দোলনের মধ্যে গতবছর ১২ মে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।
এরপর নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে দিলে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকা দলটির।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, এনসিপিসহ ৫১টি দল ভোটে রয়েছে। এই যুক্তিতে এবারের নির্বাচন ‘অংশগ্রহণমূলক’ হচ্ছে বলেই নির্বাচন কমিশনের দাবি।
৭ ফেব্রুয়ারি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জরিপ ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে সংস্থার গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
আলোচনার জন্ম যেভাবে
আওয়ামী লীগকে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা যৌক্তিক হবে, নাকি আদালতের রায়ের জন্য অপেক্ষা করা উচিত–সেই প্রশ্নে আলোচনা ছিল দলগুলোর মধ্যে; সরকার তাতে কোনো দিকে সায় না দিয়ে নীরব ভূমিকা পালন করতে থাকলে প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান নেয় অভ্যুত্থানের গর্ভে জন্ম নেওয়া এনসিপি, ছাত্রশিবিরসহ কয়েকটি ইসলামী দলের সদস্যরা। জামায়াতে ইসলামী, গণ অধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন ইসলামী দলের নেতারা তাতে সংহতিও জানান। পরে জরুরি ব্ঠৈকে বসে সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশের আওতায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নেয় উপদেষ্টা পরিষদ।
ওই সিদ্ধান্তের পর আন্তর্জাতিক মহল থেকেও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন তোলা হয়। রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা নিয়ে ডিসেম্বরেও প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দেন পাঁচ মার্কিন আইনপ্রণেতা।
আগামী নির্বাচন যাতে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ ও ‘অংশগ্রহণমূলক’ হয়, সেজন্য তাগাদা দিয়ে আসছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ ও ‘অংশগ্রহণমূলক’ বলতে তারা কী বোঝায়, সেই ব্যাখ্যায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইইয়াবস বাংলাদেশের সমাজের ‘সবগুলো পক্ষের ভোট দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি’কে বোঝানোর কথা বলেন।
দেশে নির্বাচন সামনে রেখে যতগুলো জরিপ চালানো হয়েছে, তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। শেষতক আওয়ামী লীগকে রেখে নির্বাচন হয় কিনা- সে সম্ভাবনা থেকেই প্রশ্ন রাখা হয়েছিল- কত শতাংশ ভোট দেবে তাদের? তারা নির্বাচনে আসতে না পারলে তখন ভোট কোথায় যাবে?
সবশেষ গত শনিবার এক জরিপের ফলাফল তুলে ধরতে এসে বক্তব্যের শুরুতেই সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “এ কথাটি না বললেই নয়, জাতীয় নির্বাচনটিকে আমরা যে অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা দরকার, সে অর্থে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক আসলে বলতে পারছি না।
“আবার একই সাথে গণভোটের যে কাঠামো দুর্বলতা, সে কারণে ফলাফল নিয়েও একধরনের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন থাকতে পারে। সে কারণে আমাদের কাছে মনে হয়ে যে, এবারের নির্বাচনটিতে মূলত জাতীয় নির্বাচনে আমাদের দৃষ্টিবদ্ধ থাকা দরকার।”
২৯ জানুয়ারি ‘ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের’ এক সম্মেলনে অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান।
এসব বিবেচনায় রেখে কোন দল কত ভোট পাচ্ছে–সেদিকে না গিয়ে বরং সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে প্রার্থীরা যেসব ইশতেহার দিচ্ছেন, তার ওপরই দৃষ্টি ‘নিবদ্ধ’ রাখার কথা বলেন তিনি।
কেন নির্বাচন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হচ্ছে না–তা তখন স্পষ্ট না করায় স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সাংবাদিকরা।
জবাবে আওয়ামী লীগের না থাকাকে ইঙ্গিত করে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়–এটি আগেও বলেছিলাম। দেখুন, সাম্প্রতিককালে অনেকগুলো জরিপ হয়েছে এবং সেই জরিপগুলোর দিকে যদি তাকান, তাহলে দেখবেন যে প্রায় প্রত্যেকটি জরিপে বলা হচ্ছে, যে পতিত দলটি, সেই পতিত দলের ভোটটিই এবার ডিসাইসিভ ফ্যাক্টর হবে।
“এটা দিয়ে যেটা বোঝা যায় যে, একটা বৃহদাংশের ভোটারকে তার চাহিদামতে ভোট করতে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। সুতরাং আমাদের কাছে মনে হয়, একটা বড় অংশের ভোটার এবার আসলে তাদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের যে প্রার্থী চয়েজ করার সুযোগ–সেটা কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ন হবে।”
তার ভাষ্য, “ইনক্লুসিভ ভোটিংয়ের যে জায়গা বলে থাকি, ভোটারদের জায়গা থেকে সেটি কিছুটা হলেও পূর্ণ হচ্ছে না। এটা আমাদের কাছে মনে হয়।”
এরপর রোববার এক অনুষ্ঠানে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারকে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বোঝাতে বক্তব্য দিতে দেখা যায়।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে দায়িত্ব পালন করা বদিউল বলেন, “একটা ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটানো দরকার…সরকারের একটা অগ্রাধিকার এবং জনগণের দাবির মুখে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সহায়তা করার চেষ্টা করেছি। সরকারের অংশ হিসেবে কাজ করিনি।”
দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ও টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন।
২০২৫ সালের ৯ মে, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে যমুনার সামনে বিক্ষোভ।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের পতনের পরে রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা, সংস্কার ও নির্বাচনের ‘ভিত্তি স্থাপনের’ যে প্রত্যাশা ও দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল, দেড় বছরেও সেসব ‘নাজুক’ অবস্থায় রয়েছে।
তার ভাষ্য, এ সরকারের ইতিবাচক যে অর্জন হয়েছে, তার তুলনায় ‘ঘাটতি বা পথভ্রষ্ট হওয়ার’ উপাদানের ‘পাল্লাটা তুলনামূলক ভারী’।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক বলেন, “রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে যতটুকু মজবুত বা শক্তিশালী হতে পারত, ততটুকু হয়নি। এ কারণে ভবিষ্যতেও এই ভিত্তিটা আরো দুর্বল এবং আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে।”
তার কথায়, ‘রাষ্ট্র সংস্কারের ম্যান্ডেট’ নিয়ে দায়িত্ব শুরু করা এ সরকার শুরু থেকে সংস্কারকে ‘শুধু সংস্কার’ হিসেবে দেখেছে, বাস্তবায়নের পথে ঝুঁকিগুলো বিশ্লেষণ করে নিরসনের উপায় অনুসন্ধান করার ‘প্রয়াস দেখা যায়নি’।
দুদক সংস্কার নিয়ে যেসব সুপারিশ তুলে ধরেছিল কমিশন, তার বাস্তবায়ন নিয়েও সংশয়ের কথা বারবার তুলে ধরেছেন ইফতেখারুজ্জামান।
অন্যদিকে সিপিডি চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান ২৯ জানুয়ারি এক অনুষ্ঠানে সরকারের গণভোটের উদ্যোগ ও প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, “যেখানে আপনি (সরকার) ৩৮টি জটিল সংস্কার প্রস্তাবের ওপর একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ প্রশ্ন রাখছেন, অথচ সাধারণ নাগরিকরা জানেনই না, সেই সংস্কার প্রস্তাবের ভেতরে কী আছে। এটা আসলে একটি ‘গুরুত্বহীন প্রস্তাব’।”
সরকার কেন ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারে নেমেছে, সে বিষয়ে নিজের পর্যবেক্ষণও তুলে ধরে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, “কেন এটি করা হচ্ছে, তা আমরা বুঝতে পারি। আমার সন্দেহ হল, অধ্যাপক ইউনূস মাহফুজকে (ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে উপদেষ্টা পরিষদে জায়গা পাওয়া মাহফুজ আলম) খুশি করতে চান। কারণ মাহফুজ ও তার সহকর্মীরা সবাই উদ্বিগ্ন, যেন পরিস্থিতি আগের মত অবস্থায় ফিরে না যায়।
“তাই এখন আপনারা (সরকার) একটি ‘কসমেটিক অ্যারেঞ্জমেন্ট’ (লোক দেখানে) করেছেন, যেখানে সম্ভবত আশা করা হচ্ছে যে, আপনারা (জনগণ) বিশ্বাস করবেন যে তারা (সরকার) কিছু একটা করেছে।”
শেষ সময়ে ক্ষোভ কেন?
গণআন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্বে রয়েছে প্রায় দেড়বছর; এর মধ্যে অনেকগুলো কমিশন করে সংস্কারের ডামাডোল চলেছে প্রায় এক বছর ধরে।
এছাড়া অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্র কমিটি, টাস্কফোর্স এমন নানামুখি কমিটিও দেখা গেছে এ সময়ে। সেসব কমিশন ও কমিটির দায়িত্বে সুশীল সমাজের নেতৃত্ব ও প্রতিনিধিত্ব ছিল চোখে পড়ার মত।
তবে শেষ পর্যন্ত এসব কমিশনের অনেক সুপারিশই যে রাখা হয়নি, তা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে বিভিন্ন কমিশনের সদস্যদের।
বিশেষ করে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন, স্বাস্থ্য ও শ্রম সংস্কার কমিশনের আলাপগুলো ধর্তব্যে রাখা হয়নি ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায়।
সরকারের একদম শেষ মুহূর্তে এসে সুশীল সমাজের তরফে নারাজি কেন–সে প্রশ্নে লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের পরপর ‘পাবলিক মুড’ একরকম ছিল। এবং অনেক প্রতিষ্ঠান সংস্থা সেই মুডের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কথা বলছিল। এখন সেই মুডটা আস্তে আস্তে বদলে গেছে। বদলে যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে।
“ফলে অনেকের মনেই নানারকমের ক্ষোভ আছে এবং সেই ক্ষোভ থেকেই অনেকে অনেক কথা বলছেন। আর ভোটারদের অনেকের মধ্যেও তো এই প্রবণতাটা দেখা যাচ্ছে। অনেকেই বলছেন যে ‘আগেই ভালো ছিল’। তো সেটা হচ্ছে যে মানুষ তো তুলনা করে দেখে আগে কীরকম ছিল, এখন কীরকম আছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন এক্ষেত্রে দুটো বিষয় সামনে আনছেন।
“একটি হল যে তারা হয়ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে অনেক কিছু আশা করেছিলেন এবং কালক্রমে সে আশাগুলো ফিকে হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত হল, আওয়ামী লীগ তাদের পতনের পরে যে লুজিং অবস্থায় ছিল, গত দেড় বছরে এই সরকার যা যা করেছে, তাতে কিন্তু তাদের (আওয়ামী লীগের) জনপ্রিয়তা বেড়ে গেছে।
“আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেককে চিনি, জুলাই আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু এখন এই সরকারের নানামুখী কর্মকাণ্ডে তারা ‘বিরক্ত’, তারা ‘ব্যথিত’। তারা যা চেয়েছিলেন, সেটা হয়নি। তো যারা এই সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারাও হয়ত সেই বিষয়টি অনুভব করছেন।”
নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ‘খারিজ হতে পারত’
এ নির্বাচনের মাধ্যমেই ভোটারদের রায়ে আওয়ামী লীগ ‘খারিজ’ হতে পারত বলে মনে করেন জোবাইদা নাসরীন।
তার ভাষ্য, “নির্বাহী আদেশে কোনো দল বন্ধ করলেই সেটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে—এই জায়গাটা চিন্তা করাও এই সময়ে এসে খুব কঠিন। কারণ জনসমর্থনটাই একটা রাজনৈতিক দলের টিকে থাকার বড় জায়গা।
“এবার যদি জনগণ আওয়ামী লীগকে বাতিল করত, খারিজ করত, তাহলে আওয়ামী লীগ এমনিতেই রাজনৈতিকভাবে ‘নাই’ হয়ে যেত। কিন্তু সেটি না দিয়ে বরং আমি মনে করি যে এই নির্বাচন একটা বড় ধরনের আপনার অপশক্তির নির্বাচন হয়ে গেছে।”
জোবাইদা নাসরীন বলেন, অনেকে এখন মনে করছেন, এই নির্বাচন আর ‘গ্রহণযোগ্য হবে না’। কেন হবে না, তার ব্যাখ্যায় এ অধ্যাপক বলেন, “আওয়ামী লীগের একটা সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক ভিত্তি আছে। তো রুট লেভেলের সেই ভোটারদেরকে একভাবে বাইরে রেখে আপনি নির্বাচন করছেন। তাতে নিশ্চিতভাবেই একটা বড় অংশ ভোটে আসবে না। যারা আসবে তারাও কিন্তু চাপের মধ্যে পড়ে ভোট দিতে বাধ্য হবে।
“তাহলে ভোটের যে মূল লক্ষ্য—যে আমি পছন্দমত প্রার্থী বেছে নেব, নির্ভয়ে এবং সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশের মধ্য দিয়ে—সেটা তো হচ্ছে না।”
লেখক মহিউদ্দিন একই সুরে বলেন, “এটা তো একটা প্রশ্ন থেকেই গেল যে ভোটাররা ভোট দিয়ে এই দলটিকে বর্জন করেননি। এই দলটিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে রাষ্ট্রীয় নির্বাহী আদেশে। আওয়ামী লীগের মত একটা বড় দলকে বাইরে রেখে নির্বাচন যে গ্রহণযোগ্য হবে না, এই পটভূমিতেই কিন্তু এক-এগারো হয়েছে। এটা আমাদের স্মরণে রাখতে হবে।”
এ গবেষক মনে করেন, আওয়ামী লীগের ‘ফিরে আসার’ বিষয়টি নির্ভর করছে অন্তর্বর্তী সরকারের নানামুখি সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী সরকার কেমন করবে তার ওপর।
অন্যরকম উদ্দেশ্য?
আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে নির্বাচন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হচ্ছে কিনা, সেই প্রশ্ন যারা তুলছেন, তাদের উদ্দেশ্য নিয়েই সন্দিহান নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
তিনি বলেন, “কোন দল বাদ আছে? শুধু একটা দলই, যারা ব্যানড আছে। আর প্রত্যেক দলই তো আসছে।“
‘সব দল, মতের মানুষ’ ভোটে আসায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে বলেই দাবি করেন এ নির্বাচন কমিশনার।
আরেক নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, “আমাদের নজরে আসছে, বিভিন্নজন বলছে, সোশ্যাল মিডিয়া, বিভিন্ন গণমাধ্যমে আমরা দেখতেছি। কিন্তু এই পর্যন্ত অনেক কিছু নিয়েই তো আলোচনা সমালোচনা হছে।
“আবার দেখা যায় যে প্রত্যেকটা কাজেই চ্যালেঞ্জ ছিল। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি, নির্বাচন কমিশন প্রত্যেকটা চ্যালেঞ্জকে ওভারকাম করছে।”
তবে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ভোটার উপস্থিতি কম হলে যে প্রশ্নেউঠবে, সে কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন তিন দশকের বেশি সময় নির্বাচন কমিশনে দায়িত্ব পালন করে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসরে যাওয়া জেসমিন টুলী।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের এই সদস্য বলেন, “একটা দল নেই, এটা একদম বাস্তব কথা। দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার কারণে দলটি এবার ভোটে নেই এটাই বাস্তব। কিন্তু নির্বাচনটা যদি প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয় এবং ভোট কাস্টিং যদি ভালো হয়, তাহলে এ কথা বলা যাবে যে একটা দল অপরাধ করেছে; তারা বাইরে থাকার পরও ভালো কাস্টিং হয়েছে।
“কিন্তু কাস্টিং কম হলে এবং যদি দেখা যায় যে এককভাবে কোনো দল অনেক বেশি আসন পেয়েছে; বিরোধী দল একেবারে শক্ত হতে পারেনি, তাহলে ইলেকশনটা নিয়ে প্রশ্ন থাকবে, তখন কার্যকর সংসদ হবে বলে মনে হয় না।”
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনি অনিয়ম তদন্তে গঠিত কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, “এ বিষয়গুলো আগে আলোচনা করা দরকার ছিল, আগে হওয়া দরকার ছিল। এটি তো এখনকার বিষয় না। এ মুহূর্তে যদি কেউ (প্রশ্ন) করে, বুঝতে হবে তাদের অবজেকটিভটা অন্যরকম।
“যে দলগুলো থাকেনি বা থাকছে না, বা তাদের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে, তারা তো আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারত; তাওতো করেনি।”
তবে আওয়ামী লীগ ভোটে না থাকায় ভোটার উপস্থিতি যে তুলনামূলক কম হতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথা আব্দুল আলীমও মানছেন।
তিনি বলেন, “যেহেতু আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নেই, তাদের তো ভোট ব্যাংক সারাদেশে রয়েছে স্বাভাবিকভাবেই; কম বা বেশি যা থাক, তাদের তো একটা আছেই। তাদের একটা অংশ ভোট দিতে যাবে না, কেন্দ্রে যাবে না।”





