ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে। সময় যত ঘনিয়ে আসছে রাজনীতির মাঠে প্রার্থী ও ভোটারদের আগ্রহের সঙ্গে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও বাড়ছে। শেষ মুহূর্তে কোন দল বেশি আসন পাবে কিংবা সরকার গঠন করবে-এ নিয়েও চলছে নানা অঙ্ক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে তরুণ ও নারী ভোটাররা বড় ভূমিকা রাখবেন। তাদের ভোটেই পালটে যেতে পারে নির্বাচনি হিসাব-নিকাশ। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে এবার তরুণ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি। অন্যদিকে নারী ভোটার ৬ কোটিরও বেশি। যা পুরুষ ভোটারের কাছাকাছি। ফলে এই বিশাল ভোটারের রায় পালটে দিতে পারে ভোটের ফল। এ কারণেই তরুণ ও নারী ভোটারদের প্রতি বিশেষ নজর রাজনৈতিক দলগুলোর।
এই ভোটারদের ‘কিংমেকার’ হিসাবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, তরুণদের আকৃষ্ট করতে আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি এবার তরুণ ও নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে বেশ কয়েকটি দল। অতীতের নির্বাচনগুলোতে ভোটকেন্দ্রে পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক বেশি। পাশাপাশি গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের ভোটদানে আগ্রহও বেড়েছে। শেখ হাসিনার আমলে ভোট দিতে না পারার যে দুঃখ তা এবার কমবে বলেও তারা মনে করেন।
এদিকে শুধু তরুণ ভোটারই নন, সব ভোটারকেই সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
তিনি বলেন, সব ভোটাররাই নির্বাচনে কিংমেকার। সব ভোটই গুরুত্বপূর্ণ। আগে আমাদের দেশে নারী ভোটাররা লাইন ধরে ভোট দিতেন। এখনো সেই ঐতিহ্য রয়েছে। নারীদের ভোটে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। এবারের নির্বাচনেও নারী ও তরুণ ভোটারদের বড় প্রভাব পড়বে। মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশের বেশি তরুণ এবং প্রায় অর্ধেক নারী। ফলে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন এটা স্বাভাবিক।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, আসন্ন নির্বাচনে নারী ও তরুণ ভোটারদের প্রভাব ব্যাপকভাবে পড়বে। এখন কোন দল বা প্রার্থী তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন, তরুণ ও নারীদের ভাষা কতটা বুঝতে পারছেন; তার ওপরই তাদের ভোট নির্ভর করবে।
তিনি আরও বলেন, আসন্ন নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে এই তরুণ প্রজন্ম ও নারী ভোটাররা। তরুণরা যে দলের কাছে দেশকে বেশি নিরাপদ মনে করবে এবং যাদের কাছ থেকে তারা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাবে সেদিকেই ঝুঁকবেন। একই ভাবে নারীরাও যাদের কাছে নিজেদের নিরাপদ মনে করবেন, তারা তাদেরই ভোট দেবেন।
জাতীয় যুব নীতি-২০১৭ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সিদের ‘যুব’ বা তরুণ হিসাবে গণ্য করা হয়। তবে নির্বাচন কমিশনের বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে ৩৩ বছর পর্যন্ত ভোটারদের তরুণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। ইসির তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে মোট ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। এর মধ্যে নতুন ভোটার রয়েছেন প্রায় ১ কোটি। এই ১ কোটি ভোটার এবারই প্রথম ভোট দেবেন। এছাড়া ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা ৪ কোটি ৩৩ লাখ। দেশে মোট নারী ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটির বেশি। ১৮-৩৭ বছর বয়সি নারী ভোটার ২ কোটি ৬৭ লাখ।
তরুণ ও নারী ভোটারদের মতে, যারা তাদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারবে এবং তাদের ভাষায় কথা বলতে পারবে, তারাই আগামী দিনের ক্ষমতাবান হবেন। পুরোনো ধাঁচের রাজনীতি দিয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। তাই প্রতিটি দলের ইশতেহারে প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, জলবায়ু পরিবর্তন ও শিক্ষা সংস্কারের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তাদের মতে, অতীতে জনগণের ভাষা, দুঃখ-দুর্দশা বুঝতে না পারার কারণেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে যে দল ও তাদের নেতারা জনগণের আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন তারাই এ নির্বাচনে ভালো ফল বয়ে আনবেন। এবার নতুন ভোটার হয়েছেন ঢাকার নাশিতা।
তিনি বলেন, এতদিন শুধু নির্বাচনের নামে প্রহসনের কথা শুনে আসছি। আমরা যারা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম তাদের চাওয়া নতুন কিছু। বাংলাদেশের মানুষের এতদিনের প্রত্যাশিত নির্বাচনটা সুষ্ঠু হোক। আমরা কেন্দ্রে গিয়ে নিরাপদে ভোট দিয়ে যেন বাড়ি ফিরতে পারি এই নিশ্চয়তা চাই। তিনি বলেন, আমাদের যতই স্বপ্ন দেখানো হোক, নির্বাচনের দিন দেখব কারা আমাদের সম্মান করে। আশা করি নির্বাচনের পরও তাদের কাছে সম্মান ও নিরাপত্তা পাব।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের ভোট টানতে তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছে। নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, স্নাতকোত্তর পর্যন্ত ফ্রি পড়াশোনা, নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিকাশ, নারী সাপোর্ট সেল, উদ্যোক্তা সহায়তা, ডে-কেয়ার, ভেন্ডিং মেশিন ও ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি।
অন্যদিকে জামায়াতের ইশতেহারে জাতীয় নারী সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠনের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি নারীদের ঘরে-বাইরে নিরাপত্তা ও সম্মানজনক জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া এনসিপি বলেছে, নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।
তরুণ ভোটারদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে ১৮-২১ বছর বয়সি ভোটার ৮৫ লাখ ৩১ হাজার ৫৩৮, ২২-২৫ বছর বয়সি ১ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার ১০৬, ২৬-২৯ বছর বয়সি ১ কোটি ২১ লাখ ৬৬ হাজার ১৬২ এবং ৩০-৩৩ বছর বয়সি ১ কোটি ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৬১৫ জন ভোটার রয়েছেন।
তরুণদের পাশাপাশি মধ্য বয়সি ও সিনিয়র ভোটারের সংখ্যাও অনেক। ৩৪-৩৭ বছর বয়সি ভোটার রয়েছেন ১ কোটি ২৩ লাখ ৬ হাজার ৭৫৫, ৩৮-৪১ বছর বয়সি ভোটার ১ কোটি ৩০ লাখ ২৬ হাজার ৪৫০, ৪২-৪৫ বছর বয়সি ভোটার ১ কোটি ২৩ লাখ ২৩ হাজার ৪২, ৪৬-৪৯ বছর বয়সি ভোটার ৯২ লাখ ৩৯ হাজার ৭২৩, ৫০-৫৩ বছরের ভোটার ৮০ লাখ ৫৪ হাজার ৫৬০, ৫৪-৫৭ বছর বয়সি ভোটার ৬৩ লাখ ৪২ হাজার ২৮, ৫৮-৬০ বছরের ভোটার রয়েছেন ৫১ লাখ ৮১ হাজার ১০৩ এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সের ভোটার রয়েছেন ১ কোটি ৯৩ লাখ ৫১ হাজার ৯৯৪ জন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন তরুণরা। সংস্কার ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের দাবিতেও তারাই সামনে ছিলেন। সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হার-জিত নির্ধারণে তরুণ ও নতুন ভোটাররা বড় ভূমিকা রাখবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ভোটকেন্দ্রে নারী ভোটারদের উপস্থিতির বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নারীরা সাধারণত সকালেই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে এবারও তাদের ভোট রাজনীতি ও ক্ষমতার পালাবদলে প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের (বিওয়াইএলসি) ‘ইয়ুথ ম্যাটারস সার্ভে ২০২৫’ অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সি ২ হাজার ৫৪৫ জন উত্তরদাতার ৯৭ শতাংশই ভোট দিতে আগ্রহী। আগামী ৫ বছরের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত-এমন প্রশ্নে ৬৭ শতাংশ দুর্নীতি নির্মূল, ৫৬ শতাংশ বেকারত্ব দূরীকরণ, ২৪ শতাংশ নিরাপত্তা এবং ১৪ শতাংশ গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার কথা বলেছেন।
জানা যায়, দেশে সর্বশেষ তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হয়েছিল ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। তখন মোট ভোটার ছিলেন ৮ কোটি ১১ লাখ। গত ১৭ বছরে নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন ৪ কোটি ৬৬ লাখ, যা মোট ভোটারের প্রায় ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ভোটার হওয়ার পর তারা কোনো প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন দেখেননি। ফলে তরুণরা এবারের নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্রদের ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ বিরোধী দল ‘কলঙ্কিত’ ওই নির্বাচন বর্জন করে। ২০১৮ সালে সব দল নির্বাচনে অংশ নিলেও ভোটের আগের রাতেই বাক্স ভরে রাখার অভিযোগ ওঠে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে।
যা ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত। ২০২৪ সালের নির্বাচনও হয় সব বিরোধী দলের বর্জনের মধ্য দিয়ে। যা ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন হিসাবে পরিচিতি পায়। এমন বাস্তবতায় ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে নতুন ভোটাররা ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন।





