বিএনপি সরকার ক্ষমতায় বসার তৃতীয় দিনের মাথায় বহুল আলোচিত আদানি চুক্তি পর্যালোচনা করতে চার মন্ত্রীকে নিয়ে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়েছে বৃহস্পতিবার। সেখানে চুক্তি বাতিল করার ব্যাপারে কয়েকজন মতামত দিলেও বিষয়টি নিয়ে আরও পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত হয়।
সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে তার দপ্তরে এই বৈঠক হয়। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম এবং বিদ্যুৎ খাত নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোস্তাক আহমেদ খান উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখনো আদানির চুক্তির ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী সপ্তাহে একটা কিছু হতে পারে। আইনমন্ত্রীও এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, আদানির চুক্তি নিয়ে প্রচুর অনিয়মের অভিযোগ আছে। তাই এই চুক্তি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এটি যেহেতু আন্তর্জাতিক চুক্তি, তাই হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। তিনি বলেন, আদানির চুক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের সার্বভৌম গ্যারান্টি দিয়ে গেছে আওয়ামী লীগ সরকার।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানান, এই সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। তাই দেশের স্বার্থ সংরক্ষণে আদানির চুক্তি খতিয়ে দেখবে সরকার।
তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার তৃতীয় দিনে কেন আদানি চুক্তি নিয়ে হঠাৎ করে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক হলো সে ব্যাপারে কেউ কিছু জানাতে রাজি হননি। জানা গেছে, আদানির চুক্তিতে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় কমিটি এর প্রতিবেদনে বলেছে, আদানি চুক্তিতে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এই চুক্তির পরমুহূর্তে তৎকালীন বিদ্যুৎ সচিব আহমেদ কায়কাউস বিদেশের অ্যাকাউন্টে কয়েক মিলিয়ন ডলার ঘুস নিয়েছেন। তার প্রমাণ জাতীয় কমিটির কাছে আছে।
কমিটির রিপোর্টে আরও বলা হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশে। কিন্তু কোনো ধরনের কথা ছাড়াই হুট করে এটি ভারতের ঝাড়খণ্ডে বসানোর অনুমোদন দেওয়া হয়। এ ছাড়া কয়লার দাম, ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়াও নানা বিষয় নিয়ে প্রচুর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে ভারতের আদানির বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, আদানির এক কর্মকর্তার বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তার সঙ্গে ঘুস লেনদেনের পরোক্ষ প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় কমিটি এবং আদানি কীভাবে পুরো চুক্তি নিজের মতো করে নিয়েছে তারও কিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।
জাতীয় কমিটির তথ্য অনুযায়ী, আদানির সঙ্গে চুক্তির সময়ে (২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৯) সাবেক বিদ্যুৎ সচিব এবং আদানি চুক্তির সমঝোতা কমিটির প্রধান আহমেদ কায়কাউসের সঙ্গে দেশে-বিদেশে আদানির কর্মকর্তারা একান্তে দেখা করেছেন। এমনকি আহমেদ কায়কাউসের (পরবর্তীতে সাবেক মুখ্য সচিব) বিদেশের অ্যাকাউন্টে মোটা অঙ্কের লেনদেন হয়েছে।
জাতীয় কমিটি বলছে, আদানির ব্যাপারে মূল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আহমেদ কায়কাউস এবং পিডিবির কয়েক কর্মকর্তা। ওই সময়ে আদানি চুক্তির সঙ্গে পিডিবির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ, পিজিসিবির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়া এবং পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানসহ কয়েকজন জড়িত ছিলেন। তারা বিভিন্নভাবে আর্থিক লেনদেন করেছেন কিনা তা খতিয়ে দেখছে দুদক।
জানা গেছে, দুদক বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে এবং আহমেদ কায়কাউস ছাড়া আদানি কেলেঙ্কারিতে জড়িত ১১ জন সরকারি কর্মকর্তাকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে আদানির চুক্তি বাতিল করা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ হয়। সেখানে আইনমন্ত্রী চুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করেন। উল্লেখ্য, অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালীন পিডিবি আদানির ব্যাপারে বেশ কিছু আইনগত মতামত নিয়েছে বর্তমান আইনমন্ত্রীর কাছ থেকে। তাই তার কাছে বিষয়টি অনেকটা জানা আছে বলে বৈঠকে জানান আইনমন্ত্রী।
সেখানে পিডিবি চেয়ারম্যান জানান, আদানি এখন ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে বাংলাদেশে। এ ছাড়া ভারত থেকে আরও ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। এখন আদানির চুক্তি বাতিল করলে বাকি বিদ্যুৎ ভারত থেকে আসা বন্ধ হলে দেশ সমস্যার মধ্যে পড়তে পারে। তাই সব কিছু পর্যালোচনা করে আদানির চুক্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
ভারতের ঝাড়খণ্ডে কয়লাভিত্তিক ১৬০০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ এনে পিডিবিতে বিক্রি করে আদানি গ্রুপ। ভারতের কয়লাভিত্তিক অন্যান্য কেন্দ্র থেকে পিডিবি বিদ্যুৎ আমদানি করে প্রতি ইউনিট গড়ে ৮ দশমিক ৫০ টাকায়। সেখানে আদানি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে বিক্রি করছে ১৪ দশমিক ৮৭ টাকায়।
জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে আদানির মতো ধ্বংসাত্মক এবং দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি আর হয়নি। ওই চুক্তি (পিপিআর) অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিক্রির সব কিছুর নিষ্পত্তি হবে আন্তর্জাতিক আদালতে। সে অনুযায়ী ঝাড়খণ্ড বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লার দাম নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে গত অক্টোবরে সিআইএসিতে সালিশি মামলা করে আদানি গ্রুপ। আদানির অভিযোগ, চুক্তি অনুযায়ী কয়লার দাম দিচ্ছে না পিডিবি। বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি-পিপিআর অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কয়লা বিক্রির ইনডেক্স অনুযায়ী বাংলাদেশ ঝাড়খণ্ডে ব্যবহার হওয়া কয়লার দাম পরিশোধ করবে।
পিডিবির অভিযোগ, এখানে আদানি কারসাজি করছে। তাই আদানির কয়লার বিলের পুরোটা পরিশোধ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এভাবে মাত্র তিন বছরে কয়লার দাম নিয়ে ৫০ কোটি ডলার বা ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বিরোধ দেখা দিয়েছে আদানি ও পিডিবির মধ্যে। আদানি এই বিরোধ নিষ্পত্তি করতে সিঙ্গাপুরের আদালতের মাধ্যমে জন বিশপ নামে একজন বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ দিয়েছে। কয়লার দাম নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক আদালত সিআইএসিতে আদানির বিরুদ্ধে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ও বিশেষজ্ঞ হিসাবে ইউনাটেড ইউনিভার্সিটির ইইই বিভাগের প্রফেসর ইমেরিটাস ড. এম রেজওয়ান খানকে ওই নালিশি মামলার জন্য নির্বাচিত করে একটি প্যানেল করে দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ওই মামলায় একই সঙ্গে বাংলাদেশের ব্রিটিশ ল’ ফার্ম থ্রি ভিপি চেম্বারকে নিয়োগ দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি। এই চেম্বারের অন্যতম কর্ণধার কিংস কাউন্সিল ফারহাজ খান বাংলাদেশের হয়ে আদানির বিরুদ্ধে লড়বেন। এ বিষয়টিও বৃহস্পতিবার চার মন্ত্রীকে জানানো হয়। এতে আরও বলা হয়, এ ব্যাপারে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে পিডিবিকে একটি অনুমতিপত্র পাঠানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিল হিসাবে প্রতি মাসে ১০ কোটি ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হয় সরকারকে। ২০১৭ সালে আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করা হয়েছে। যার আওতায় আদানি ঝাড়খণ্ডের কেন্দ্র থেকে ২০২৩ সাল হতে বিদ্যুৎ বিক্রি শুরু করে পিডিবিকে।





