অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা দেখছেন বিশ্লেষকরা।
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ‘তরুণদের দেখানো পথে’ বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ে শপথ নিয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকারের প্রায় দেড় বছরের শাসনামলে দেশ এগিয়ে গেল, না কি পথ হারাল তার হিসাব-নিকাশ চলছে জনপরিসরে।
অভ্যুত্থান দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে সংস্কার ও নির্বাচনের লক্ষ্য ধরে পথচলা শুরু করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। নির্বাচন হয়ে গেছে, এবার তাদের যাওয়ার পালা।
মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, গুম-নির্যাতন, অর্থ পাচার, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন মামলায় বিগত সরকারের মন্ত্রী-এমপি, আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচারের কাজ চলছে, সংস্কারের পক্ষে রায় এসেছে গণভোটে। সরকারের উপদেষ্টারা তাদের কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরে সাফল্যের ‘পাল্লা ভারী’ বলেই দাবি করেছেন।
কিন্তু বিশ্লেষকের চোখে ‘ভঙ্গুর অর্থনীতি’ নিয়ে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়া ইউনূস সরকারের সাফল্য বলতে কেবল এ খাতের ‘স্থিতিশীলতা’। এর বাইরে বহু বিতর্কের জন্ম দেওয়া ইউনূস সরকারের ব্যর্থতাই দেখছেন তারা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘মব সংস্কৃতির’ উত্থান, মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা, ‘জনরোষ’ ও ‘প্রেশার’ বলে ‘মব’ সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া, বিরোধী মতকে ‘দমন’, মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশের ‘ভাবমূর্তি’ নষ্ট করেছে।
অভ্যুত্থানের পর ছাত্রনেতাদের সঙ্গে মুহাম্মদ ইউনূস। এই নেতাদের কয়েকজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ফেইসবুকে থেকে
একই সঙ্গে ‘জনমত উপক্ষো’ করে আন্তর্জাতিক মহলে দেনদরবার ও সমঝোতার নামে বন্দর ও দেশের সম্পদ ‘ইজারা দেওয়ার’ দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন তারা।
কারো মতে, যেসব কারণে শেখ হাসিনা শাহীর পতন ঘটেছিল, সেই ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ জারি থাকার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ‘সরকারের কর্তৃত্ববাদী’ আচরণই দেখা গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করতে গিয়ে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “‘মব জাস্টিস’ বা এই ধরনের ঘটনাগুলো সরকারের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করেছে। সার্বিকভাবে বলতে গেলে, তাদের পারফরম্যান্স মিশ্র।”
সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরুতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সহিংসতার জেরে তা পরিণত হয়েছিল ছাত্র-জনতার গণভ্যুত্থানে।
অভ্যুত্থানে উৎখাত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশ ছাড়েন। তিনি এখন ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার বিচারে তাকে প্রাণদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। এছাড়া প্লট দুর্নীতির মামলায়ও বিভিন্ন মেয়াদে শেখ হাসিনার কারাদণ্ড হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চাপে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় নির্বাচন থেকেও ছিটকে যায় তারা।
আওয়ামী লীগবিহীন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে গণভোট হয়ে গেল বৃহস্পতিবার। শান্তিপূর্ণ ভোটের ফলাফল নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও তার মিত্রদের কিছু অভিযোগ ছাড়া বড় কোনো কারচুপির অভিযোগ ওঠেনি।
তবে ৫৯ দশমিক ৪৪ ভোটের এই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিচার ও নির্বাচনের বাইরে রয়েছে সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়টি, যার দায়িত্ব পড়েছে নতুন সংসদ ও সরকারের ওপর, যেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা বড় হয়ে উঠতে পারে।
এসব বাদ দিলে মানুষের জীবনযাত্রা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, পাচারের অর্থ ফেরত, মুক্তিযুদ্ধের ওপর আক্রমণ, ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলোর নামে চালানো মব সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া, মূল্যস্ফীতির মতো বিষয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন বিশ্লেষকরা, যেখানে সরকারের ব্যর্থতাই ঘুরে ফিরে এসেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘মব’ সহিংসতার বড় ক্ষত বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা।
উপদেষ্টারা কী বলছেন?
বিদায় বেলায় নিজেদের কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরে কয়েকজন উপদেষ্টা যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানেও স্বীকার করা হয়েছে যে অন্তর্বর্তী সরকার বেশিরভাগ কাজ করে যেতে পারেনি।
যদিও নিজেদের সাফল্যের পাল্লা ভারী বলে দাবি করছেন তারা। বলেছেন, পরবর্তী সরকারের সময়ে এই সাফল্য দৃশ্যমান হবে।
যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা, সেখানেও অনেককিছু পরের সরকারের জন্য রেখে যাওয়ার কথা বলেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ।
অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে তিনি নিজের কাজের মূল্যায়নও করেছেন, সেখানে নিজেকে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৭০ নম্বর দিয়েছেন।
নির্বাচনের দুই দিন আগে মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি সরকারের মূল্যায়ন তুলে ধরেন।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় এক মাসের মাথায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম দস্তগীর গাজীর মালিকানাধীন গাজী টায়ারসের যন্ত্রাংশ লুটপাটের পর আবার আগুন দেওয়া হয়।
তার মতে, “অনেক উদ্যোগ শুরু করা গেলেও সবকিছু শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবুও জনগণের স্বার্থে কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা ছাড়াই কাজ শুরু করা হয়েছে, সেটিই বড় অর্জন।”
সালেহউদ্দিনের মতে, “অন্তর্বর্তী সময়ে অর্থনীতি পরিচালনা করা সহজ ছিল না। কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময় লেগেছে।”
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কর সংস্কারের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই দায়িত্ব ছাড়তে হচ্ছে তুলে ধরে অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, “এনবিআরকে কার্যকর করতে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হলেও নীতিগত সংস্কার পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। পলিসি ডিভিশনগুলো যদি আরও আগে থেকে পুরোপুরি কাজ শুরু করতে পারত, তাহলে ফলাফল আরও ভালো হত।”
তবে কর নীতিমালার একটি ‘গাইডলাইন রিপোর্ট’ রেখে যাচ্ছেন তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি পরবর্তী সরকারের জন্য ‘সহায়ক’ হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংক খাতে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে মন্তব্য করে সালেহউদ্দিন বলেন, “কেবল আইনে গভর্নরের মর্যাদা বাড়ালেই প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। অপারেশনাল সক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতা জরুরি।”
মূল্যস্ফীতি কমিয়ে জনগণের চাপ কমানো এ সরকারের ওপর দায়িত্ব থাকলেও সেখানে তেমন সাফল্য আসেনি। আগের তুলনায় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এ সরকারের শেষ তিন মাস ধরে এ সূচক বেড়েই চলেছে।
জানুয়ারি মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা গত বছরের জানুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। গেল ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আর নভেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল কর্মসংস্থান। ব্যবসা ও শিল্প সচল না হলে কর্মসংস্থান আসবে না। কর্মসংস্থান না হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে না।
“মূল্যস্ফীতি শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা, যার সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় জড়িত।”
আওয়ামী লীগের আমলে অর্থ পাচারের ফলে ব্যাংকের তারল্যে যে সংকট দেখা গিয়েছিল, তা কাটাতে সে অর্থ বিদেশ থেকে আনার কথা বলেছিল সরকার। সেখানেও কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি ইউনূস প্রশাসন।
অর্থ পাচার বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “কোন কোন দেশে, কারা অর্থ পাচার করেছে—সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট অঙ্ক বলা কঠিন। বিদেশ থেকে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্সের মতো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
“ভিত্তিটা তৈরি হয়েছে। পরবর্তী সরকার যদি সিরিয়াস হয়, তাহলে এই তথ্যগুলো কাজে লাগাতে পারবে।”
গণমাধ্যমের উদ্দেশে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “সমালোচনা করবেন, কিন্তু পুরো চিত্রটা দেখবেন। ১৭–১৮ মাসে কিছুই করা হয়নি—এমন বলা ঠিক নয়।
“অনেক কাজ শুরু হয়েছে, যেগুলোর ফল সামনে দেখা যাবে।”
জ্বালানি সংকটও দেশের পুরনো সমস্যা। সেখানেও সাফল্যের চিত্র দেখা যায়নি অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়ে।
শিল্পে জ্বালানি সরবরাহ সংকট তো ছিলই, এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ করতে না পারা। শেষদিকে এসে এলপিজি গ্যাসের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়ে ইউনূস সরকার।
এক্ষেত্রেও পরবর্তী সরকারের জন্য ‘অনিষ্পন্ন’ কাজ নথিভুক্ত করে যাওয়ার কথা বলেছেন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আস্থার ঘাটতি ছিল ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা’।
“আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের কাছে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে পড়েছিল, যার ফলে জ্বালানি আমদানিতে ঝুঁকি তৈরি হয়।”
মঙ্গলবার রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, কোন খাতে কী কাজ করা হয়েছে, কোন সিদ্ধান্তগুলো প্রস্তুত আছে এবং কোন জায়গায় সময় ও পূর্ণমেয়াদি সরকারের প্রয়োজন-এসব বিষয় লিখিতভাবে রেখে যাচ্ছেন তারা, যাতে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ এগিয়ে নিতে পারে।
জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের প্রথম কাজ ছিল ‘কন্টেইন’ করা—যাতে অর্থনীতি ধসে না পড়ে, বড় সামাজিক অস্থিরতা তৈরি না হয়।”
সরকারের মেয়াদ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বড় বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে গেল ১৫ সেপ্টেম্বর তার কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি (এইউএসটিআর) ব্রেন্ডান লিঞ্চের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল। নির্বাচনের তিন দিন আগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করেছে ঢাকা। ছবি: পিআইডি।
আর গেল দেড় বছরে ছোট খামারি ও বড় উদ্যোক্তা—উভয় পক্ষকেই অন্তর্ভুক্ত রেখে ইউনূস সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক নীতির পথে এগিয়েছে বলে দাবি করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।
নির্বাচনের দুই দিন আগে সচিবালয়ে তিনি বলেন, “এই নীতির মূল লক্ষ্য ছিল কাউকে বাদ না দিয়ে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোনো।”
ভবিষ্যতেও তার উত্তরসূরিরা একই ধারাবাহিকতায় কাজ করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
‘ব্যর্থতাই বেশি’
বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, গুম ও নির্যাতনের বিচারের কথা সরকার বারবার বললেও সাবেক শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অল্পকিছু নেতারই বিচার শেষ করতে পেরেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু অনেকেই বহুদিন ধরে বিনাবিচারে কারাগারে আটক হয়ে আছেন।
এছাড়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ও প্রশাসনিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনে সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশ এবং সেগুলো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা পেরিয়ে এসে যে গণভোট হল, তা নিয়েও নানা সমালোচনা ও ধোঁয়াশা রয়েছে।
তারা বলছেন, সংস্কারের প্রায় সবই রয়ে গেল জনগণের রায়ের ওপর ও পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সদিচ্ছার ওপর। আর এতে করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন না করার দায় রয়ে গেল অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। নারী বিষয়ক সংস্কার প্রতিবেদন যে চাপা পড়ে গেল সে বিষয়টিও নজরে আনলেন তারা।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকার জনগণের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে বলে সাফল্য দেখাতে পারছে না। অথচ জনগণের ‘মতামত উপেক্ষা’ করে বন্দর পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে দেখা গেছে।
তারা বলছেন, ক্ষমতার শেষ সময়ে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও এমন চুক্তির দেখা মিলেছে, যেখানে বাংলাদেশ কম কিছু পাওয়ার বিপরীতে বড় ছাড় দিয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ধর্মঘট ডাকতে বাধ্য হন শ্রমিক-কর্মচারীরা। সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেও চুক্তি করা থেকে সরে আসে।
যদিও তার আগে গেল ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রামের লালদিয়ার চরে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে ডেনিশ কোম্পানি এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। একই দিন পানগাঁওয়ের নৌ টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়ে চুক্তি হয় সুইজারল্যান্ডের কোম্পানি মেডলগের সঙ্গে।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি করেছে। নতুন চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে এখন পারস্পরিক শুল্ক দিতে হবে ১৯ শতাংশ। এতে করে মোট শুল্কহার আগের ৩৫ শতাংশ থেকে কমে হবে ৩৪ শতাংশ।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রায় ২৫০০টি পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক ও কাঠজাত পণ্য।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের ৭ হাজার ১৩২ পণ্যে শুল্ক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
সরকার বলছে, এর মধ্যে ৪ হাজার ৯২২টি পণ্যে চুক্তি কার্যকরের দিন থেকেই শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হবে। ১ হাজার ৫৩৮টি পণ্যে পাঁচ বছরের মধ্যে এবং ৬৭২টি পণ্যে ১০ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক শূন্যে নামানো হবে। ৩২৬টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়নি।
জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারাকেও সরকারের বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “তারা (অন্তর্বর্তী সরকার) যখন এসেছিল, মানুষের একটা আকাশচুম্বী প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু গত দেড় বছরে তারা সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পেরেছে, সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে একটা জায়গায় তারা সফল, সেটা হল অর্থনীতিটাকে একটা লাইনে নিয়ে আসা।
“যে ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে তারা দায়িত্ব নিয়েছিল, সেখান থেকে দেশ একটা স্থিতিশীল অবস্থায় এসেছে। কিন্তু প্রশাসনিক সংস্কার বা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা খুব একটা ভালো করতে পারেনি। ‘মব জাস্টিস’ বা এই ধরনের ঘটনাগুলো সরকারের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করেছে। সার্বিকভাবে বলতে গেলে, তাদের পারফরম্যান্স মিশ্র।”
প্রায় একইরকম পর্যবেক্ষণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহানের।
তিনি বলেন, “দেখুন, এই সরকার যখন দায়িত্ব নিয়েছিল তখন প্রত্যাশা অনেক বেশি ছিল। তাদের বড় সাফল্য যদি বলতে হয়, তবে সেটা হচ্ছে অর্থনীতির মোটামুটি স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। একটা বড় সংকটের মুখে দেশ ছিল, কিন্তু তারা অন্তত দুর্ভিক্ষ বা একদম বড় কোনো অর্থনৈতিক ধস হতে দেয়নি।”
এই বিশ্লেষক বলেন, “কিন্তু এর বাইরে যদি আমি প্রশাসনিক সংস্কার বা রাজনৈতিক সংলাপে তাদের ভূমিকার কথা বলি, সেখানে তারা খুব একটা এগোতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা সফল হয়নি, বিশেষ করে আমরা যে ‘মব জাস্টিস’ বা আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখেছি, সেটা খুবই উদ্বেগজনক ছিল।
“সার্বিকভাবে, মানুষের মনে নিরাপত্তার যে বোধ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেটা তারা দিতে পারেনি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলছেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আসল বাস্তবতা হচ্ছে যে, নানা চাপ—ভেতরের চাপ, বাইরের চাপের মধ্যে এই সরকারকে কাজ করতে হয়েছে। তবে আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে মোটামুটি এই জায়গাতেই ‘ক্রেডিট’ দিব যে, তারা অর্থনীতিটাকে ভালোভাবে ‘হ্যান্ডল’ করেছে।
“অর্থনৈতিক সংকটটা এমন তীব্রতর জায়গায় যায়নি যে, মানুষের জীবন একদম দুর্ভিক্ষের জায়গায় চলে গেছে। এখানে তারা মোটামুটি একটা স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পেরেছে। ন্যূনতম স্থিতিশীলতা যেটা থাকা দরকার ছিল, তারা ধরে রাখতে পেরেছে। আর উল্লেখ করার মতো আমি তেমন কোনো অর্জন দেখি না।”
‘মব’ তৈরি করে বিভিন্ন নামে মাজার, মেয়েদের খেলার মাঠ, বাউলদের সমাবেশে হামলার ঘটনায় ছিল প্রায় নিয়মিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, “মোটা দাগে যদি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে আশা আকাঙ্ক্ষা সাথে নিয়ে এসেছে এবং যেটা একটা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হওয়া সরকার, সেই দিক থেকে চিন্তা করলে এই সরকারের সবচেয়ে বড় ভয়ঙ্কর দুর্বলতার জায়গা ছিল ‘মবক্রেসি নির্ভরতা’।
“দ্বিতীয়ত. এই সরকারের দ্বারা হয়েছে এবং সেটা আসলে হয়ত জনমনে এক ধরনের কষ্টের জায়গা তৈরি করছে, সেটা হল মুক্তিযুদ্ধের ওপর আক্রমণ। এবং শেষ দিকে এসে এই সরকার একটি বিশেষ ইসলামপন্থি গোষ্ঠীর এবং দল, তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের বিভিন্ন ‘মব’কে এক ধরনের লিগ্যালাইজ করার মধ্য দিয়ে ‘জনরোষ’, ‘প্রেশার’ এগুলো বলে তাদের একটা অনুমোদন দিয়েছে।”
তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি যে, আমি বিদেশে আছি এবং বিদেশের বিভিন্ন দেশে কিন্তু বাংলাদেশি পাসপোর্টের মান কমে গেছে, ভিসা জটিলতার মধ্যে পড়ে গেছে সবাই। সুতরাং, বাইরে আসলে একটা নেগেটিভ ইমেজ তৈরি হয়েছে এই সরকারের সময়ে।
“পাশাপাশি যদি বলেন যে বিদেশিদের আমাদের বন্দর, আমাদের বিভিন্ন সম্পদের জায়গাগুলো লিজ দেওয়া এবং সেটা জনমতকে উপেক্ষা করে। পাশাপাশি বিরোধী দলকে দমন এবং কারাগারে বেশ কিছু বন্দির মৃত্যু, পাইকারি হারে মামলা দেওয়া, সবকিছু মিলে একটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণ সরকারের কর্তৃত্ববাদী আচরণই আসলে শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল।”





