অভিযানে উদ্ধার হলেও ফের দখল হচ্ছে পূর্ব রেলের জমি

chattogram-railways-occupy-space-crb-030422-09

বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের দখল হওয়া সম্পত্তি উদ্ধার করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার সমস্যায় আবারও তা বেহাত হয়ে যাচ্ছে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, ঢাকা, সিলেট ও ময়মনসিংহ এলাকা নিয়ে গঠিত পূর্ব রেলের ৪৮২ দশমিক ৫ একর জমি অবৈধ দখলে রয়েছে, যা মোট জমির ২ দশমিক ২৯ শতাংশ।

পূর্ব রেলের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা সুজন চৌধুরী বলেন, “বিভিন্ন সময়ে আমরা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে থাকি অবৈধ দখল সরাতে।

“অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযানও চলমান রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের তুলাতলী এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ দখলে থাকা জমি অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয়েছে।”

রেলওয়ে কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় রেলের অনেক জমি প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে। এছাড়া লিজ দেওয়া জমি নির্ধারিত সময় পার হবার পরও তাদের সেখান থেকে তোলা যায় না।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কথিত কার্যালয়, ক্লাব, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় স্থাপনা, দোকানপাট ও বসতঘরের মাধ্যমে এসব জমি দখল হয়ে আছে। স্থানীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় সরকারি জায়গা দীর্ঘদিন ধরে বেহাত হয়ে আছে।
এছাড়া আইনগত জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হয় না। তারা জানান, জমির মালিকানা নিয়ে মামলা চলছে এমন জমির পরিমাণ ২৫২ দশমিক ৬১একর।

পূর্ব রেলের এক কর্মকর্তা বলেন, “প্রভাবশালী অনেক দখলদার ভুয়া নথিপত্র দিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হলে উচ্ছেদের ওপর স্থগিতাদেশ আসে। সেসব ভূমিতে আমরা অভিযান পরিচালনা করতে পারি না।

“এছাড়া অনেক ভূমি ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের খতিয়ানে রেলের নামে নথিভুক্ত হয়নি। সেসব নিয়েও আইনগত জটিলতা চলছে। এসব কারণে রেলের অনেক জমি অবৈধ দখলে রয়েছে বলে মনে হয়।”

তিনি বলেন, “এছাড়া বিভিন্ন এলাকার রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের চাপেও অনেক সময় রেলের জমি থেকে দখলদারদের উচ্ছেদ করা হলেও পরে আবার পুনর্দখল হয়ে যায়।”

চট্টগ্রাম বিভাগে পূর্ব রেলের মোট জমির পরিমাণ ৭ হাজার ৭০১ একর। দখল হয়ে আছে ২১৫ দশমিক ১৮ একর। এছাড়া চট্টগ্রাম জেলায় মোট জমি ৪ হাজার ৬৫৪ দশমিক ৪৩ একর। বেহাত রয়েছে ১৮৩ দশমিক ২৩ একর জমি।

চট্টগ্রামের টাইগারপাস আমবাগান, মাদারবাড়ি, সিআরবি এলাকাসহ নগরী ও জেলার রেলস্টেশন এবং রেললাইন ঘেঁষে থাকা বিপুল পরিমাণ জায়গা অবৈধ দখলদারদের কব্জায় রয়েছে।
এছাড়া রেলওয়ের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অবৈধ বস্তিও। নিম্ন আয়ের মানুষ এসব বস্তিতে বাস করলেও এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের মদদ।

ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা সুজন চৌধুরী বলেন, “এজন্য রেলওয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা সহজ করার প্রক্রিয়া চলছে। একইসাথে দখলমুক্ত করার অভিযানও চলছে।”

গত দুই অর্থবছরে পূর্ব রেলের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ ৯১টি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে মোট ৭০ দশমিক ৯৩ একর জমি দখলমুক্ত করেছে বলে জানান তিনি।

চলতি অর্থবছরের (জুলাই ২০২১ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২২) শেষ আট মাসে উদ্ধার হয়েছে ১৯ দশমিক ৫৯ একর রেলভূমি। এর আগের বছরে ৪২ দশমিক ৯৭ একর জমি থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়েছে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব রেলের মোট জমির পরিমাণ ২১ হাজার ৫০ দশমিক ৫৬ একর। এর মধ্যে রেল চলাচলসহ সংশ্লিষ্ট অপারেশনাল কাজে ব্যবহৃত ভূমি ১৩ হাজার ৭৪৯ দশমিক ০৭ একর।

এর বাইরে বাণিজ্যিক ভূমি অর্থাৎ দোকান ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত জমির পরিমাণ ৬৮ দশমিক ৭৭৯ একর। কৃষি কাজের জন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে লিজ দেওয়া হয়েছে চার হাজার ৮৭৭ দশমিক ১৭ একর।

২৮৫ দশমিক ৪৪৭ একর রেলের জমি (পুকুর ও জলাশয়) মৎস্য চাষের জন্য বেসরকারি পর্যায়ে লিজ দেওয়া হয়েছে। নার্সারি ব্যবসায় লিজ দেওয়া হয়েছে ৪৪ দশমিক ৯৩ একর এবং অন্যান্য কাজে ৮৬৫ দশমিক ৪৩২৯ একর রেলভূমি।
পূর্ব রেলের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা সুজন চৌধুরী বলেন, “পূর্ব রেলের যে পরিমাণ ভূমি রয়েছে তার যথাযথ ব্যবহার করা গেলে রাজস্ব আয়ও বাড়ত। বাংলাদেশ জনবহুল দেশ।

“নিম্ন আয়ের মানুষ যারা বস্তিতে থাকত তারা নানা কারণে উচ্ছেদ হয়ে সরকারি জমিতে উঠে আসছে। আমরা উচ্ছেদ চালাচ্ছি, ভূমি দখলমুক্ত করছি। কিন্তু উচ্ছেদ পরবর্তী সময়ে সেসব ভূমি ধরে রাখাই মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

রেলে জমির মধ্যে পাহাড়-জলাশয় রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পরিবেশগত কারণেও এসব ভূমি সংরক্ষণ জরুরি। এসব জায়গা প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে। রেলওয়ের নিকট আছে বলে ভারসাম্য টিকে রয়েছে।”

জমি সংরক্ষণের জন্য ভূমির যথাযথ ব্যবস্থাপনা জরুরি বলেও জানান পূর্ব রেলের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা।

Pin It