‘গরিবের সব দিকে মরণ’

Untitled-55-samakal-5e88d7198a17e

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের বড় অংশই বৃদ্ধ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ সব বিশেষজ্ঞ বলছেন, বয়স্করা রয়েছেন সবচেয়ে ঝুঁকিতে। তাদের ঘরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। কিন্তু এসব পরামর্শ কানে তোলার উপায় নেই ৮৩ বছর বয়সী নুরু মিয়ার। তিন কুলে কেউ নেই এই বৃদ্ধের। থাকেন কারওয়ান বাজার রেলক্রসিংয়ের পাশে ঝুপড়িতে। করোনায় আক্রান্তের ভয় থাকলেও পেট চালাতে রোজ পথে নামতে হয় তাকে।

গত শুক্রবার বিকেলে নুরু মিয়ার সঙ্গে দেখা হয় রেলক্রসিং-সংলগ্ন সড়কে। জনশূন্য ফুটপাতে ভ্যানের ওপর খালি গায়ে বসেছিলেন। ‘চাচা থাকেন কোথায়?’ প্রশ্নে আঙুল তুলে তার ঝুপড়ি দেখালেন। ‘বাইরে বের হয়েছেন কেন?’ এ প্রশ্নে আঙুল ইশারা করলেন পেটের দিকে। বললেন, পেট বাঁচাতে পথের পাশে বসেছেন। কেউ যদি কিছু দেয় এ আশায়।

নুরু মিয়ার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে। ঢাকায় কত বছর ধরে থাকেন মনে নেই। বয়স কত? আঙুলের কড়ায় গুনে অনুমান করে বললেন, ৯০। ১৯৫০ সালের বন্যার সময় তার নামে ত্রাণের কার্ড হয়েছিল। স্বাধীনতার ৭ বছর আগে ২৭ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন। এ হিসাবে বের হলো তার বয়স ৮৩। উদাস মুখে বললেন, ‘অইতে পারে। গুইন্ন্যা রাখি নাই’। বছর ১৩ আগে স্ত্রীর মৃত্যুর পর কারওয়ান বাজারের এখানে-ওখানে ঝুপড়ি তুলে থাকেন নুরু মিয়া। মাছের আড়তের বেড়ার ঘর মেরামতের কাজ করেন। তাতে যা রোজগার হয় এক পেট চলে যায়। কিন্তু করোনা সংক্রমণ রোধে সব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কামাই বন্ধ। এখন লোকে যা দেয় তাই দিয়ে দু’মুঠো ভাতের সংস্থান করেন। ভাতের হোটেলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবসময় তাও জোটে না।

করোনায় বয়স্কদের আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা সবচেয়ে বেশি, নুরু মিয়া তা জানেন। করোনা থেকে বাঁচতে সবসময় যে ঘরে থাকা দরকার সে কথাও জানেন। কিন্তু ঘরে থাকলে অনাহারে মরতে হবে। তাই বাইরে বের না হয়ে উপায় নেই। নুরু মিয়া বললেন, গরিবের সবদিকে মরণ। রাস্তায় থাকলে করোনায় মারবে। ঘরে থাকলে ক্ষুধায় মারবে।

করোনায় কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমজীবী, প্রান্তিক ও ভাসমান মানুষের খাদ্য সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে সরকার। ত্রাণ দিচ্ছে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। খাবার দেওয়া হচ্ছে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও। কিন্তু সে সবের কিছুই চোখে দেখেননি নুরু মিয়া। তিনি বললেন, সরকার ত্রাণ দিচ্ছে এমন কিছু তার চোখে পড়েনি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেসব ত্রাণ দিচ্ছে সেগুলোর জন্য হুড়োহুড়ি, মারামারি হচ্ছে।

ভিড় ঠেলে তার দুর্বল শরীরের পক্ষে ওই ত্রাণ সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। কেউ দিলে খান, তা দিলে উপোস করেন।

সোনারগাঁও হোটেল-সংলগ্ন ফ্লাইওভারের নিচে থাকেন ৭০ বছর বয়সী শাহজাহান মিয়া। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে। তিন ছেলে আছে গ্রামে। তারা বাবার দেখাশোনা করেন না। তাই বিপত্নীক শাহজাহান মিয়া চলে এসেছেন ঢাকায়। ফুটপাতে থাকেন। কাগজ, প্লাস্টিক কুড়িয়ে পেট চালান। করোনার কারণে দোকানপাট বন্ধ হওয়ায় প্লাস্টিক বিক্রি বন্ধ। লোকজন ঘরে থাকায় পথেঘাটে প্লাস্টিকও নেই।

ফ্লাইওভারের বিপরীতে বিজিএমইএ ভবনের সামনে গাছতলায় বসে ছিলেন শাহজাহান মিয়া, কেউ যদি কিছু দিয়ে যায় এ আশায়। ছেলেরা না দেখলেও ফ্লাইওভারের নিচে ঝুপড়ি তুলে থাকা এক নারী তার দেখাশোনা করেন। কিন্তু তারও বড় দুর্দিন। নিজেই খাবার জোটাতে পারছেন না, বৃদ্ধ শাহজাহান মিয়াকে কী দেবেন!

‘দিনকাল কাটছে কেমন’- প্রশ্নে শাহজাহান মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, সারাজীবনই দুঃখকষ্টে কেটেছে তার। ভূমিহীন কৃষকের সন্তান তিনি। যৌবনে দিনমজুরি করে খেয়েছেন। এখন আর পারেন না। ভাতের অভাব তার জন্য নতুন নয়। কিন্তু এমন সংকটে পড়েননি কখনও। এবার যদি ‘রিলিফ’ না পান, তাহলে একেবারে ভাতে মারা পড়বেন।

এ সময় পাশে এসে থামলেন বৃদ্ধ রিকশাচালক আবদুল খালেক। থাকেন তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়িতে। সাদা ধব ধবে দীর্ঘ দাড়ি তার। জানালেন বয়স ৭২। স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে থাকেন। দুই ছেলের একজন কাগজকলে কাজ করে, আরেকজন সিএনজি অটোরিকশা চালায়। তাদের নিজেদের সংসারই চলে না, বাপ-মাকে কী দেখবেন।

বয়স ৭২ হলেও খেটে খান আবদুল খালেক। কিন্তু করোনার ‘লকডাউন’ তার রুটিরুজিতে হাত দিয়েছে। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জানালেন, জুমার পর বের হয়ে দুই ঘণ্টায় মোটে একটি ভাড়া পেয়েছেন। রাস্তায় লোকজন একেবারেই নেই গত বৃহস্পতিবার থেকে। চাল-ডালের টাকা জোগাড় হলেই চলে যাবেন।

আবদুল খালেক জানালেন, রিকশা চালালে রাস্তায় পুলিশ বারবার ধরে। সেনাবাহিনীর জেরার মুখে পড়তে হয়। তারপর অনুনয়-বিনয় করে চালাচ্ছেন। পুলিশও তাকে বলেছে, বয়স্কদের করোনা ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। আবদুল খালেক বললেন, এসব শুনলে, মানলে তো চলবে না। ঘরে বয়স্ক স্ত্রী রয়েছে। বুড়োবুড়ির খাবার তো জোগাড় করতে হবে।

Pin It