ফুসফুসের ক্যানসার বিশ্বজুড়ে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগটি দেরিতে শনাক্ত হওয়ায় চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। তবে নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণা আশা জাগিয়েছে যে, ভবিষ্যতে উপসর্গ দেখা দেওয়ার অনেক আগেই এ রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা রক্তে থাকা ১৪ ধরনের বিশেষ প্রোটিনের একটি স্বতন্ত্র ‘ব্লাড সিগনেচার’ শনাক্ত করেছেন, যা ফুসফুস ক্যানসার ধরা পড়ার পাঁচ বছরেরও বেশি সময় আগে একজন ব্যক্তির ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি বৈজ্ঞানিক সাময়িকী সেল-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, ক্যানসার ও প্রদাহের সঙ্গে সম্পর্কিত সূক্ষ্ম জৈবিক পরিবর্তন টিউমার দৃশ্যমান হওয়ার বা কোনো উপসর্গ দেখা দেওয়ার বহু আগেই রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ আগাম শনাক্তকরণ?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফুসফুস ক্যানসার বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যানসারগুলোর একটি এবং ক্যানসারজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ। রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসায় সফলতার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ের ফুসফুস ক্যানসারে পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার ৬০ শতাংশের বেশি হতে পারে। কিন্তু ক্যানসার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়লে এই হার নেমে আসতে পারে মাত্র ৬ শতাংশে।
কী পেয়েছেন গবেষকরা?
অস্ট্রেলিয়ার ওয়াল্টার অ্যান্ড এলাইজা হল ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল রিসার্চ-এর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় বিভিন্ন দেশের প্রায় ৪৮ হাজার রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৪টি নির্দিষ্ট প্রোটিনের একটি ধরণ দীর্ঘ সময় আগে থেকেই ফুসফুস ক্যানসারের বাড়তি ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রোটিনগুলো বিদ্যমান কোনো টিউমারের উপস্থিতি নয়, বরং ক্যানসার সৃষ্টির প্রাথমিক জৈবিক প্রক্রিয়ার প্রতিফলন বলে মনে করছেন গবেষকরা।
প্রদাহের সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক
দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ক্যানসার সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে। শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে প্রদাহ কাজ করলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হলে কোষের ক্ষতি, অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধি এবং ক্যানসারবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
গবেষণায় পাওয়া নতুন প্রোটিন সিগনেচারের সঙ্গে ইন্টারলিউকিন-১ বিটা নামের একটি প্রদাহ সম্পর্কিত অণুর যোগসূত্র পাওয়া গেছে, যা আগে থেকেই ক্যানসার বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানা ছিল।
বদলে যেতে পারে স্ক্রিনিং ব্যবস্থা
বর্তমানে ফুসফুস ক্যানসার শনাক্তে প্রধানত দীর্ঘদিন ধূমপান করেছেন এমন ব্যক্তিদের জন্য লো-ডোজ সিটি স্ক্যান ব্যবহার করা হয়। তবে অনেক রোগীই বর্তমান স্ক্রিনিংয়ের আওতার বাইরে থেকে যান।
গবেষকদের ধারণা, রক্তভিত্তিক ঝুঁকি নির্ধারণকারী পরীক্ষা চালু হলে কারা অতিরিক্ত স্ক্রিনিংয়ের প্রয়োজন তা আরও নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এতে ক্যানসার আরও আগে শনাক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখতে পারে
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্যানসার প্রতিরোধের সম্ভাবনা। গবেষকরা ‘কানাকিনুম্যাব’ নামের একটি ব্যাথানাশক ওষুধের আগের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, যাদের মধ্যে এই প্রোটিন সিগনেচার বেশি ছিল, তাদের ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি এখনই ক্যানসার প্রতিরোধের কার্যকর পদ্ধতি প্রমাণ করে না। এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
এখনই ব্যবহারযোগ্য নয়
গবেষকরা জানিয়েছেন, পরীক্ষাটি এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য বাণিজ্যিকভাবে উপলব্ধ নয়। পাশাপাশি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীতে এর কার্যকারিতা যাচাই, ভুল ফলাফলের হার নির্ধারণ এবং বিদ্যমান স্ক্রিনিং ব্যবস্থার সঙ্গে কীভাবে এটি যুক্ত করা হবে—এসব বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রক্ত পরীক্ষা ক্যানসার আছে কি না তা নিশ্চিত করবে না; বরং কারও ঝুঁকি বেশি কি না সে বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দিতে পারে।
নতুন সম্ভাবনার দ্বার
গবেষকদের ভাষ্য, রোগ নির্ণয়ের পাঁচ বছরেরও বেশি সময় আগে ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি শনাক্ত করতে সক্ষম ১৪ প্রোটিনের এই ‘ব্লাড সিগনেচার’ ক্যানসার গবেষণায় একটি বড় অগ্রগতি। প্রযুক্তিটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও ভবিষ্যতে এটি ফুসফুস ক্যানসার স্ক্রিনিং, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।





