নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা থেকে মুক্ত হলো বাংলাদেশ

Untitled-4 copy

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় ক্ষমতার পালাবদলের সমীকরণ প্রায় সবসময়ই রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে গেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে নির্বাচনের পর বিজয়ী পক্ষের উল্লাস এবং পরাজিত পক্ষের ওপর প্রতিহিংসার আঘাত একটি দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এই ক্ষত আরও গভীর।

১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনের পরই কমবেশি সহিংসতার চিত্র দেখা গেছে।

তবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভূমিধস বিজয়ের পর এক ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক আচরণের সাক্ষী হচ্ছে দেশ। ২১ বছর পর নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় ফিরেও বিএনপি যে সংযম প্রদর্শন করছে, তাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘নতুন রাজনীতির সূচনা’ হিসেবে অভিহিত করছেন। যদিও তৃণমূলের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা এখনো দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সহিংসতা কোনো নতুন বিষয় নয়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী সংঘর্ষ কিংবা পাকিস্তানে নির্বাচনী ফলাফলকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে চলা অস্থিরতা এর বড় প্রমাণ। তবে বাংলাদেশের ইতিহাস এক্ষেত্রে কিছুটা বেশি কণ্টকাকীর্ণ। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর জয়ী দল হিসেবে বিএনপির সমর্থকদের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ দমনের অভিযোগ ওঠে। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে পৌঁছায়।

ওই বছরের ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রূপ আরও প্রকট হয়। তবে সহিংসতার সব সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর।

২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হওয়ার পর দেশজুড়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুদের ওপর ব্যাপক হামলার অভিযোগ ওঠে। সে সময়ের সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় স্কুলছাত্রী পূর্ণিমা রানী শীলকে গণধর্ষণের ঘটনাটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায়। ২০০৯ সালে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর অসংখ্য সহিংস ঘটনা ঘটেছিল, যার মধ্যে হত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাটের মতো গুরুতর অপরাধ ছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন, সেই সময়ের নিয়ন্ত্রণহীন ক্যাডার রাজনীতি দলটির পরবর্তী বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পরও মাঠপর্যায়ে একই ধরনের প্রতিহিংসা ব্যাপকভাবে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপট যেন এক ভিন্ন গল্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সম্প্রতি ‘সকল প্রাণের নিরাপত্তা (সপ্রান)’ নামে একটি সংস্থার ‘ম্যাপিং ইলেক্টোরাল ভায়োলেন্স ইন বাংলাদেশ: এভিডেন্স ফ্রম পোলিং ডে অ্যান্ড ইটস আফটারম্যাথ, ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ১৩ থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশব্যাপী সহিংসতায় ৫ জন নিহত এবং ২২৬ জন আহত হয়েছেন। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ইত্তেফাক এবং ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্সের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফেরার উত্তেজনায় যেখানে ব্যাপক জানমালের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করেছিলেন বিশ্লেষকরা, সেখানে ৫ জনের মৃত্যু অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও ২০০১ বা ২০১৪–২০১৮ পরবর্তী সময়ের তুলনায় একে ‘নজিরবিহীন সংযম’ বলে মনে করছেন অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।

তারা মনে করছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দল যখন বিপুল ব্যবধানে ফিরে আসে, তখন মাঠপর্যায়ে যে মাত্রার বিস্ফোরণ ঘটার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু তা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দৃঢ়তায় অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে। ২০০১ সালে নির্বাচনের পর যেখানে মাসব্যাপী তাণ্ডব চলেছিল, সেখানে ২০২৬ সালে সহিংসতার ঘটনা কমে আসা রাজনৈতিক পরিপক্বতারই লক্ষণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিএনপির এই পরিবর্তনের মূলে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময় এবং নির্বাচনের আগে থেকেই তিনি বারবার হুশিয়ারি দিয়েছিলেন যে ক্ষমতায় আসার পর কোনো ধরনের প্রতিহিংসার রাজনীতি বরদাশত করা হবে না। তার এই ‘আর প্রতিহিংসা নয়’ বার্তা তৃণমূলে বড় প্রভাব ফেলেছে। সরকার গঠনের প্রথম দিন থেকেই তার নির্দেশনা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থা তৈরি করেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল সরকার গঠনের দিনই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ঘোষণা; তারা কোনো শুল্কমুক্ত গাড়ি বা প্লট সুবিধা নেবেন না। গত কয়েক দশকের সংসদীয় সংস্কৃতিতে এটি একটি বিরল উদাহরণ।

তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রটোকলের জৌলুস কমিয়ে সাধারণ মানুষের কাতারে নামার যে চেষ্টা করছেন, তা দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের নজর কেড়েছে। তিনি রাস্তায় চলাচলের সময় সাধারণ মানুষের যানবাহনের সঙ্গেই চলছেন, ফলে সাধারণ মানুষের যানজটে পড়ার ভোগান্তি কমেছে। এছাড়া তার কর্মস্পৃহা ও সময়ানুবর্তিতা প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও বিস্মিত করেছে। প্রতিদিন সকাল নয়টার মধ্যে সচিবালয়ে উপস্থিত হওয়া এবং শনিবারের মতো ছুটির দিনেও দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করা একজন জনমুখী নেতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দল থেকে সরকার; সর্বত্র তিনি একটি ‘কর্পোরেট ডিসিপ্লিন’ ও ‘সিভিল কালচার’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। দলকে সংগঠিত রাখতে তিনি শুক্রবার ও শনিবার গুলশানের কার্যালয়েও সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা কর্মীদের ওপর তার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আরও মজবুত করবে।

তারেক রহমানের এই স্বচ্ছ রাজনীতির দর্শন বাস্তবে রূপ দিতে তার মন্ত্রিসভার সদস্যরাও কাজ করছেন। বিশেষ করে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের ভূমিকা রাজনৈতিক মহলে প্রশংসিত হচ্ছে। তিনি তার নির্বাচনী এলাকা পল্লবী ও রূপনগরে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে তিনি সরাসরি অভিযোগ গ্রহণের জন্য একটি বিশেষ ‘হটলাইন’ নম্বর চালু করেছেন। এটি তৃণমূল রাজনীতিতে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, কোনো কর্মী যখন জানেন যে তার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বা নেতার কাছে সরাসরি অভিযোগ করা সম্ভব, তখন তিনি অপরাধ করার আগে অন্তত দুবার ভাববেন।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমাদের নেতা তারেক রহমান স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বিএনপির নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি চাঁদাবাজি, দখলবাজি বা সহিংসতায় লিপ্ত হয়, তবে তার পরিচয় শুধুই একজন ‘অপরাধী’। গত ১৬–১৭ বছর আমরা যে নিপীড়ন সহ্য করেছি, সেই একই সংস্কৃতি আমরা ফিরিয়ে আনতে চাই না। আমরা একটি জবাবদিহিমূলক সরকার ও দল গড়তে চাই। যারা বিশৃঙ্খলা করছে, তাদের বিরুদ্ধে শুধু দলীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নয়, আইনি ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের কড়া নির্দেশ রয়েছে; কোনো অপরাধীকে যেন ছাড় দেওয়া না হয়, সে আমাদের নিজ দলের কর্মী হলেও। আমাদের এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে, যা তারেক রহমানের এই সুন্দর সূচনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা রংপুরের একটি সাম্প্রতিক ঘটনার উদাহরণ দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যেখানে ‘ডিশ ও ইন্টারনেট’ ব্যবসা দখলকে কেন্দ্র করে যুবদল ও তাঁতীদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে এক ব্যবসায়ীর শয়নকক্ষে ঢুকে তার স্ত্রী-সন্তানসহ গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যদিও দ্রুত পদক্ষেপ হিসেবে তাদের দল থেকে বহিষ্কার ও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, কিন্তু মাত্র ১৬ ঘণ্টার মধ্যে জামিন পাওয়ার বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়া ও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের অপরাধীরা যদি জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও দাপট দেখায়, তবে ‘নতুন রাজনীতি’র বার্তা মাঠপর্যায়ে ম্লান হয়ে যাবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে পথে হাঁটছেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারে। তবে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা সামলানোই হবে তার প্রধান চ্যালেঞ্জ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ড. মোযাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী যখন দেশ পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগী হচ্ছেন, তখন তাকে একইসঙ্গে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে কঠিন সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শুধু বহিষ্কারই যথেষ্ট নয়; অপরাধীদের আইনের মুখোমুখি করা এবং তারা যেন রাজনৈতিক প্রভাবে জামিন না পায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

সার্বিকভাবে, ২০২৬ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়টি বাংলাদেশের জন্য এক ক্রান্তিকাল। দীর্ঘ দমন-পীড়নের পর একটি গণতান্ত্রিক সরকার যেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করছে, তা প্রশংসনীয়। তবে এই পরিবর্তনের ধারা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে তৃণমূল পর্যায়ে আইনের শাসন এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলার ওপর। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান যেমন সফল হওয়ার পথে হাঁটছেন, দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় তাকে সেই কঠোরতার পরিচয় আরও গভীরভাবে দিতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ এখন আর রক্তক্ষয়ী কোনো অধ্যায় চায় না; তারা চায় একটি শান্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, যেখানে মতের অমিল থাকলেও জীবনের ঝুঁকি থাকবে না। ২০২৬ সালের এই শুরুটা যেন শেষ পর্যন্ত সার্থক হয়; এটাই এখন সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা।

Pin It