মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী ও কার্যকর করার ওপর জোর

1773243499-673f3bc762c4b3b8c856d13b62037593

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়ন, ন্যায়পাল নিয়োগ এবং কমিশনের কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বক্তারা।

বুধবার (১১ মার্চ) বিকেলে রাজধানীর শের-ই-বাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (বিসিএফসিসি) অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫: নতুন সংসদের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক সংলাপে তারা এসব কথা বলেন।

সংলাপে স্বাগত বক্তব্যে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নব্বইয়ের দশক থেকে নাগরিক সমাজের দীর্ঘ আন্দোলনের ফল হিসেবে ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রথম জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠিত হয়। তবে পরবর্তী ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে পাঁচটি কমিশন কাজ করলেও গণতান্ত্রিক সংকটের সময়ে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি এবং জনমনে তেমন প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি বলেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর পুরোনো কমিশন বিলুপ্ত হতে সময় লেগেছে। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে কমিশন পুনর্গঠন করেছে।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, বর্তমান অধ্যাদেশে কিছু ত্রুটি থাকলেও ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে এবং ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে এটি আপাতত গ্রহণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী এটি সংশোধনের সুযোগ থাকবে।

তিনি আরও বলেন, কমিশনকে কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে না রেখে বাস্তব ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে একটি কার্যকর বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়ন এবং ন্যায়পাল নিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংলাপে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, মানবাধিকারের সংজ্ঞা উন্মুক্ত হওয়া উচিত এবং একে শুধু দেশের প্রচলিত আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়।

তিনি বলেন, অনেক সময় এমন আইনও থাকতে পারে যা মানুষের মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মতো বিতর্কিত আইনের কথা উল্লেখ করেন।

রুমিন ফারহানা বলেন, মানবাধিকারের সংজ্ঞা এমন হওয়া উচিত যেখানে দেশের আইন কিংবা আন্তর্জাতিক আইন উভয় মাধ্যমেই তা স্বীকৃত হয়। সংজ্ঞাটি উন্মুক্ত থাকলে সাধারণ মানুষ অন্তত মানবাধিকার কমিশনে গিয়ে নিজের অভিযোগ জানানোর একটি প্ল্যাটফর্ম পাবে।

তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের জন্য যে বাছাই কমিটি গঠন করা হয়, সেটিকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য কাঠামোর মধ্যে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

রুমিন ফারহানা বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে অনেক সময় এমন ধারণা তৈরি করা হয় যে তিনি কোনো ভুল করতে পারেন না, বরং অন্যরা তাকে ভুল বোঝায়। কাউকে এভাবে অতিরঞ্জিত প্রশংসা করা বা ‘পেইড সার্ভিস’ করাও এক ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন।

এ ধরনের মানসিকতা থেকে বের হয়ে সত্যকে গ্রহণ করা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।সংলাপে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান বলেন, পাকিস্তান আমলের সামরিক শাসন ও দুঃশাসনের সময় আমি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে জেল-জুলুম সহ্য করেছি। সেই সময় মানুষের কোনো অধিকার ছিল না; ছিল শুধু শোষণ ও অন্যায়।

তিনি বলেন, সেই শোষণের বিরুদ্ধেই বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এবং সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করা হয়।

ফজলুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার ৫৪-৫৫ বছর পরও মানবাধিকার নিয়ে কথা বলতে হওয়া কষ্টের বিষয়। গত ১৫ বছরের দুঃশাসনে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের কার্যক্রমে আশার আলো দেখা যাচ্ছে এবং মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শে ফিরে যাওয়া দিকে ইঙ্গিত করে।

তিনি আরও বলেন, দেশে প্রকৃত উন্নয়ন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তার আগের গৌরবময় অবস্থানে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সংলাপে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ব্যারিস্টার মুহম্মদ নওশাদ জমির, টাঙ্গাইল-৮ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান এবং নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না।

এছাড়া আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন প্রমুখ।

Pin It