রোজা অবস্থায় ইনহেলার ব্যবহার করলে কি রোজা ভেঙে যায় ?

asthma-attack-inhaler-140326-1773487970

ইনহেলার শ্বাসনালীর সংকোচন কমায় এবং দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে।

রমজান মাসে রোজা পালন ইসলামের অন্যতম ফরজ ইবাদত। তবে শারীরিক অসুস্থতা, বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট (হাঁপানি/ অ্যাজমা বা সিওপিডি) রোগীদের ক্ষেত্রে প্রায়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে— রোজা অবস্থায় ইনহেলার ব্যবহার করলে কি রোজা ভেঙে যায়?

রোজা অবস্থায় অ্যাজমার ইনহেলার ব্যবহারের ‘ফিকহি’ বিশ্লেষণ কেবল ‘কিয়াস’ ও প্রতিষ্ঠিত ‘ফিকহে’র ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি সরাসরি কোরআনিক নির্দেশনার ভিত্তিতেও প্রতিষ্ঠিত।

আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বলেন— “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৩)

এই আয়াত রোজার গুরুত্ব ও তার আধ্যাত্মিক লক্ষ্য নির্ধারণ করে। তবে একই প্রসঙ্গে কোরআন শরীফ অসুস্থ ব্যক্তির জন্য সরাসরি ছাড় প্রদান করেছে— “আর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ থাকবে বা সফরে থাকবে, সে অন্য দিনসমূহে তা পূরণ করবে।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫)

এই আয়াত অসুস্থতার ক্ষেত্রে শরীয়তের সহজীকরণ নীতির মৌলিক দলিল। প্রাচীন ও সমসাময়িক- দুই যুগের ফকিহগণ চিকিৎসাজনিত প্রয়োজনীয়তার আলোচনায় এই আয়াতকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

এতে স্পষ্ট যে, প্রকৃত অসুস্থতার ক্ষেত্রে শরীয়ত কষ্ট আরোপ করতে চায় না।

আসুন জেনে নেই, ইনহেলার কীভাবে কাজ করে।

ইনহেলার একটি আধুনিক চিকিৎসা-যন্ত্র, যাতে তরল ওষুধ সংকুচিত বায়ু বা গ্যাসের মাধ্যমে স্প্রে আকারে নির্গত হয়। রোগী মুখ দিয়ে এই সূক্ষ্ম কণাসমৃদ্ধ ওষুধ শ্বাসের সাথে গ্রহণ করেন, যা সরাসরি ফুসফুসে পৌঁছে। এর উদ্দেশ্য শ্বাসনালীর সংকোচন কমানো এবং দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক করা।

যেহেতু এ ধরনের যন্ত্র প্রাচীন যুগে বিদ্যমান ছিল না, তাই এর বিধান সমসাময়িক ফিকহি ইস্যুর অন্তর্ভুক্ত।

আধুনিক যুগের আলেমগণ ইসলামী শরিয়তের প্রতিষ্ঠিত নীতিমালার আলোকে এ বিষয়ে গবেষণা ও সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন।

এ বিষয়ে মিশরের প্রখ্যাত ইসলামি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমসাময়িক আলেমগণ বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছেন। অধিকাংশ সমসাময়িক আলেমের মতে, রোজা অবস্থায় ইনহেলার ব্যবহার করলে রোজা ভঙ্গ হয় না।

এই মতের পক্ষে তাদের যুক্তিগুলো হলো—

১. এটি খাদ্য বা পানীয় নয়। ইনহেলারের ওষুধ শরীরকে পুষ্টি দেয় না; এটি খাওয়া বা পান করার অন্তর্ভুক্ত নয়।

২. খাওয়া-পানের সমতুল্য নয়। রোজা ভঙ্গের যেসব কারণ কুরআন-হাদিস ও ফিকহে নির্ধারিত হয়েছে, ইনহেলার তার মধ্যে পড়ে না।

৩. ওষুধ সরাসরি ফুসফুসে পৌঁছে। ইনহেলারের ওষুধ প্রধানত শ্বাসতন্ত্রে কাজ করে, পরিপাকতন্ত্রে নয়।

৪. বাতাস গ্রহণের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে। এটি অনেকটা বাতাস গ্রহণের মতো, যা জীবনের জন্য অপরিহার্য এবং রোজা ভঙ্গ করে না।

উপরোক্ত নীতিমালার ভিত্তিতে আল-আযহার-এর আলেমগণ সিদ্ধান্ত প্রদান করেন যে, ইনহেলার ব্যবহার খাওয়া বা পান করার সাথে তুলনীয় নয়; অতএব রোজা সহিহ থাকবে।

এই ব্যাখ্যা সমসাময়িক ফিকহি নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ— যে সকল বস্তু পুষ্টিকর নয় এবং পরিপাকতন্ত্রের উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা হয় না, সেগুলো রোজা ভঙ্গ করে না।

কিছু আলেম সতর্কতামূলকভাবে মত দেন যে, যদি ইনহেলারের ওষুধ নিশ্চিতভাবে পাকস্থলীতে পৌঁছে যায় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তা গিলে ফেলা হয়, তাহলে রোজা ভঙ্গ হতে পারে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন— “তিনি তোমাদের জন্য যা হারাম করেছেন তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন—তবে যদি তোমরা বাধ্য হও (প্রয়োজনের কারণে), তবে তা ব্যতিক্রম।” (সূরা আল-আন‘আম ৬:১১৯)

এই আয়াত থেকে ফিকহি মূলনীতি উদ্ভূত হয়েছে— প্রয়োজনীয়তা নিষিদ্ধ বিষয়কেও বৈধ করে তোলে।

অতএব, কোনো ফকিহ যদি তাত্ত্বিকভাবে ইনহেলারের ব্যবহারকে সন্দেহজনক বলে বিবেচনাও করেন, তবুও প্রকৃত চিকিৎসাগত প্রয়োজন থাকলে তা ব্যবহার করা গুনাহ হবে না।

সুতরাং কুরআনিক কাঠামো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, রোজা একটি ইবাদত হলেও তা রহমত, সহজীকরণ এবং জীবন সংরক্ষণের নীতির আলোকে প্রণীত— যা চিকিৎসাজনিত প্রয়োজনে ইনহেলার ব্যবহারের বৈধতাকে সমর্থন করে।

তবে মতভেদের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম।

সতর্কতামূলক পরামর্শ

যদিও অনুমোদিত মত অনুযায়ী ইনহেলার ব্যবহারে রোজা ভাঙে না, তবুও সতর্কতার জন্য—

ইনহেলার ব্যবহারের পরপরই ইচ্ছাকৃতভাবে লালা গিলে ফেলা থেকে বিরত থাকা উত্তম।
গলায় ওষুধের স্বাদ অনুভূত হলে তা ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে না ফেলার চেষ্টা করা উচিত।
যে সব ইনহেলার ব্যবহারের পর পানি দিয়ে মুখ গড়গড়া করতে হয়, সেগুলো পারতপক্ষে দিনের বেলা না নেওয়া বা খুব সাবধানতার সাথে মুখ পরিষ্কার করা উচিত।
কেবল প্রকৃত চিকিৎসাগত প্রয়োজনেই ব্যবহার করা উচিত।
প্রসঙ্গত বলে রাখি, নেবুলাইজারের মাধ্যমে ওষুধ ব্যবহারে কোনো বাধা নেই।

Pin It