ওজন কমাতে অপরিকল্পিত ভাবে ক্যালরি গ্রহণ কমালে ত্বক ঝুলে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
ওজন কমানোর চেষ্টায় অনেকেই এতটাই মনোযোগ দেন যে স্বাস্থ্যের অন্যান্য দিকগুলো চোখ এড়িয়ে যায়।
ফলাফল? স্কেলে ওজন কমে ঠিকই, তবে মুখে ভাঁজ পড়ে, ত্বক ঝুলে যায়, চুল পড়ে, শরীরে ক্লান্তি লেগে থাকে—দেখতে মনে হয় বয়স বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “ওজন কমানোর লক্ষ্য শুধু সংখ্যা কমানো নয়, শরীরের মেদ কমিয়ে সুস্থ ও সতেজ থাকা। ভুল পদ্ধতিতে কমালে ত্বক-চুল-হাড়-পেশি সবকিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা দ্রুত বয়স্ক করে তোলে।”
আসুন জেনে নিই কোন কোন ভুলের কারণে ওজন কমাতে গিয়ে বুড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে, আর কীভাবে সেগুলো এড়িয়ে সুন্দরভাবে ওজন কমানো যায়।
দ্রুত ওজন কমানোর ফাঁদ
সপ্তাহে দুতিন কেজি কমানোর লোভে অনেকে খুব কম খান, ডায়েট চার্ট অনুসরণ করেন, যাতে থাকে ক্যালরি মাত্র ৮০০ থেকে ১ হাজার।
এতে শরীরের চর্বির সঙ্গে পেশি ও পানিও হারিয়ে যায়। ফলে ত্বক ঝুলে পড়ে, গাল ভেতরে ঢুকে যায়, চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে— দেখতে অনেক বয়স্ক লাগে।
বিজ্ঞানসম্মত উপায় হল- সপ্তাহে ০.৫ থেকে ১ কেজি কমানো। এতে ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বজায় থাকে, শরীর ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়।
প্রোটিন বা আমিষের ঘাটতি
ওজন কমাতে গিয়ে অনেকে আমিষ খাওয়া কমিয়ে দেন— ডিমের কুসুম, মাংস, দুধ সব বাদ। তবে প্রোটিনের অভাবে পেশি ক্ষয় হয়, ত্বকের কোলাজেন কমে যায়। ফলে ত্বক ঝুলে, বলিরেখা পড়ে, শরীর দুর্বল লাগে।
ডা. নয়নের পরামর্শ, “প্রতিদিন শরীরের ওজনের প্রতি কেজিতে ১.২ থেকে ১.৬ গ্রাম প্রোটিন খান।”
প্রোটিনের উৎস
- সেদ্ধ ডিম (সাদা অংশ বেশি। কুসুম কম হলেও পুরো ডিম খাওয়া যায়, যদি কোলেস্টেরল না থাকে)
- মুরগির বুকের মাংস, মাছ
- দুধ, টক দই, পনির
- ডাল (মসুর, মুগ, ছোলা), সয়াবিন, টোফু, বাদাম, চানাবুট
- খেসারি ডাল- নিয়মিত খাওয়া যাবে না। এতে ‘ল্যাথিরাস স্যাটিভাস’ থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা করতে পারে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিনের অভাব
ত্বকের তারুণ্যের জন্য ভিটামিন এ, সি, ই, জিংক এবং সেলেনিয়াম খুব জরুরি।
এগুলো ‘ফ্রি র্যাডিক্যালে’র বিরুদ্ধে লড়াই করে।
ওজন কমাতে গিয়ে শাকসবজি-ফল কম খেলে এসবের ঘাটতি হয়। ফলে ত্বক নিস্তেজ লাগে, বলিরেখা বাড়ে, চুল পড়ে।
প্রতিদিনের খাবারে রাখতে হবে-
- রঙিন ফল-সবজি (গাজর, টমেটো, পালংশাক, লালশাক, ব্রকোলি, কমলা, আম, পেঁপে)
- বাদাম, ওটস, লাল চাল, মসুর ডাল
- মাছ, ডিম, মুরগি (সেলেনিয়ামের জন্য)
পানিশূন্যতা: ত্বকের সবচেয়ে বড় শত্রু
ওজন কমাতে গিয়ে মিষ্টি পানীয় বাদ দেন ঠিকই, কিন্তু পানি গ্রহণও কমে যায়।
পানির অভাবে ত্বক শুকিয়ে যায়, ঝুলে যায়, চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে।
দিনে কমপক্ষে আড়াই থেকে তিন লিটার পানি পান করার অভ্যাস গড়তে হবে। গরমে বা ব্যায়ামের পর আরও বেশি।
ভেষজ চা, ডাবের পানি, টক দইয়ের লাচ্ছি— এগুলোও সাহায্য করে।
ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি-র ঘাটতি
ক্যালসিয়ামের অভাবে হাড় দুর্বল হয়, শরীরের ভেতরের স্থিতি কমে। ফলে ত্বক টানটান থাকে না।
ভিটামিন ডি না থাকলে ক্যালসিয়াম শোষণ হয় না। রোজ ১৫ থেকে ২০ মিনিট সকালের রোদে থাকতে হবে।
খাবারে রাখতে হবে-
- দুধ, টক দই
- ছোট মাছ (কাঁটাসহ)
- গাঢ় সবুজ শাক
- কাঠবাদাম
ব্যায়ামের ভুল পদ্ধতি
শুধু কার্ডিও (দৌড়, সাইকেল, হাঁটা) করলে ‘ফ্যাট’ বা চর্বি কমে। তবে পেশি না বাড়লে শরীর ঢিলেঢালা হয়ে যায়।
সপ্তাহে অন্তত দুতিন দিন স্ট্রেংথ ট্রেনিং (ওয়েট লিফটিং, বডি-ওয়েট এক্সারসাইজ- যেমন পুশ-আপ, স্কোয়াট, প্ল্যাঙ্ক) করতে হবে।
এতে পেশি ও ত্বক টানটান হয়, শরীর যৌবনোজ্জ্বল দেখায়।
ওজন কমানোর সঠিক পরিকল্পনা
- ক্যালরি গ্রহণ কম রাখা- তবে ৫০০ থেকে ৭৫০ ক্যালরির বেশি নয়
- প্রোটিন ৩০-৩৫ শতাংশ, কার্ব ৪০-৪৫ শতাংশ, ফ্যাট ২৫-৩০ শতাংশ
- প্রতিদিন পাঁচ-সাত সার্ভিং ফল-সবজি
- পর্যাপ্ত পানি ও ঘুম সাত থেকে আট ঘণ্টা
- মানসিক চাপ কমাতে ধ্যান বা হাঁটা
ওজন কমানো মানে সুন্দর হওয়া, বুড়িয়ে যাওয়া নয়। ধীরে, সঠিকভাবে, পুষ্টিকর খাবার ও সঠিক ব্যায়াম দিয়ে ওজন কমালে দেখতে থাকবেন তরুণ ও সতেজ।





