সারাদেশ যখন পবিত্র ঈদকে ঘিরে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছে; নতুন পোশাক, সেমাই, মাংস আর পারিবারিক আয়োজনের ব্যস্ততায় মুখর চারদিক; ঠিক তখনই সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা চোখে পড়ে ফরিদপুরের সালথা উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের বড় লক্ষণদিয়া গ্রামের আশ্রয়ন প্রকল্প এলাকায়। এখানে নেই ঈদের কোনো আমেজ, নেই আনন্দের ছোঁয়া; বরং চারদিকে বিরাজ করছে হতাশা, অনিশ্চয়তা আর না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস।
শুক্রবার (২০ মার্চ) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আশ্রয়ন প্রকল্পের অধিকাংশ পরিবারেই ঈদকে ঘিরে নেই কোনো প্রস্তুতি। অনেক ঘরেই সেমাই, চিনি, দুধ কিংবা মাংস কেনার সামর্থ্য নেই।
শিশুদের চোখে নেই নতুন জামার উচ্ছ্বাস; বরং আছে অনিশ্চিত অপেক্ষা; ঈদে তারা আদৌ কিছু পাবে কিনা, তা নিয়েই সংশয়।
ষাটোর্ধ্ব বিধবা কমেলা বেগম কণ্ঠ ভারী করে বলেন, আমার স্বামী-ছেলে কেউ বেঁচে নেই। নাতনি মানুষের বাসায় কাজ করে যা আয় করে, তা দিয়েই কোনো রকমে দিন চলে। একটি টিসিবি কার্ড আছে, কিন্তু নিয়মিত কিছু পাই না।
চেয়ারম্যানের কাছে অনেকবার গেছি, কিন্তু কোনো ভিজিডি, বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতা পাইনি। এই বয়সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো?
একই রকম অসহায়তার কথা জানান জানারা বেগম। তিনি বলেন, তিন বছর ধরে এখানে থাকি। স্বামী অসুস্থ, কাজ করতে পারে না।
এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি, ছেলে নেই। মানুষের কাছে সাহায্য চেয়ে যা পাই, তাই দিয়ে সংসার চালাই। সরকারি কোনো সহায়তা পাই না। ঈদ আসছে, কিন্তু ঘরে কিছুই নেই।
শুধু কমেলা বা জানারা নন, আশ্রয়ন প্রকল্পের আরও অনেক বাসিন্দার গল্প একই সুরে বাঁধা।
রাবিয়া বেগম, সাহেরা বেগম, জিয়াসমিন বেগম, চায়না বেগম, পাখি বেগম, আবে বেগম ও তাসলি বেগমসহ একাধিক নারী জানান, আমরা শুধু একটা ঘর পেয়েছি, কিন্তু জীবিকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। স্বামীরা নিয়মিত কাজ পায় না। অনেক সময় অন্যের বাড়িতে কাজ করে দিন চালাতে হয়। ঈদ সামনে, কিন্তু এখনো বাজার করতে পারিনি। সন্তানদের জন্য নতুন জামা কিনতে না পারাটাই সবচেয়ে কষ্টের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আশ্রয়ন প্রকল্পের বহু পরিবার নিয়মিত সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত। ভিজিডি, ভিজিএফ, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা কিংবা অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা অনেকেই পাচ্ছেন না। ফলে জীবনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করাই যেখানে কঠিন, সেখানে ঈদের মতো আনন্দঘন উৎসবও তাদের কাছে হয়ে উঠেছে বেদনার প্রতীক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আশ্রয়ন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য শুধু গৃহহীনদের ঘর প্রদান নয়; বরং তাদের টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করা, সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা এবং স্বাবলম্বী করে তোলা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এই প্রকল্পের উপকারভোগীরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান বা নিয়মিত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে তারা দারিদ্র্যের চক্র থেকেই বের হতে পারছেন না।
এ বিষয়ে গট্টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান লাভলু বলেন, আমি সম্প্রতি প্রতিজনকে ৫ হাজার টাকার একটি প্যাকেজ দিয়েছি। এছাড়া তিনজনকে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। যারা এখনো ভাতা পাননি, তারা আবেদন করলে বয়স্ক ও বিধবা ভাতার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।
অন্যদিকে সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আশ্রয়ন প্রকল্পের জন্য আলাদাভাবে কোনো সুবিধা বরাদ্দ নেই। সরকার যেসব স্কিম চালু করেছে, সেগুলোর মাধ্যমেই সহায়তা দেওয়া হয়। সরকার ধাপে ধাপে নতুন পরিকল্পনা নিচ্ছে। কেউ বাদ যাবে না; সবাইকে পর্যায়ক্রমে আওতায় আনা হবে।
তবে বাস্তবতা বলছে, এই ‘পর্যায়ক্রমে’ সহায়তা পাওয়ার অপেক্ষায় থেকেই বছরের পর বছর পার করছেন অনেক অসহায় পরিবার। তাদের কাছে ঈদ মানে নতুন পোশাক বা বিশেষ খাবার নয়; বরং টিকে থাকার সংগ্রামের মধ্যেও সামান্য স্বস্তির খোঁজ।
যেখানে ঈদ আনন্দ, ভালোবাসা ও ভাগাভাগির প্রতীক; সেখানে বড় লক্ষণদিয়া আশ্রয়ন প্রকল্পের মানুষের জীবনে ঈদ এসে দাঁড়িয়েছে নীরব, নিঃশব্দ ও বিষণ্ণ এক দিনে। এখন তাদের একটাই প্রত্যাশা শুধু একটি ঘর নয়, একটি স্থায়ী জীবিকা এবং বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা।





