তারেক রহমানের সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক পরিকল্পনার পাশাপাশি এটি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের বার্তা দেওয়ারও বাজেট।
জনজীবনে মূল্যস্ফীতির অবিরাম কষাঘাত আর বিপুল সরকারি ব্যয় মেটানোর চাপের বিপরীতে চলছে রাজস্ব আদায়ে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা; যে দোলাচলের মধ্যে আগের ছকেই জনতুষ্টির বিশাল বাজেট আসছে।
অর্থনীতির উথালপাতাল এ সময়ে সংকট উত্তরণের পথে হাঁটার তাগিদ যখন জোরালো হচ্ছে, তখন তার প্রথম বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও প্রবৃদ্ধির আকাঙ্খা পূরণে সাহসী হওয়ার আভাস দিয়েছেন।
সম্পদ সীমিত হলেও ‘সবার সুখ-দুঃখের কথা বিবেচনা’ করার বাজেট নিয়ে আসার কথা বলছেন তিনি। প্রথমবারের মত অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার চার মাসের মাথায় এটি শুধু তার একার চ্যালেঞ্জ নয়, দুই দশক পর দেশ পরিচালনায় আসা বিএনপিরও প্রথম বড় পরীক্ষা।
তারেক রহমানের সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক পরিকল্পনার পাশাপাশি এটি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের বার্তা দেওয়ারও বাজেট। ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অর্ন্তভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ শিরোনামের সেই বাজেটে তিনি বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনকেও সামনে রেখেই এগিয়েছেন।
এই সরকারের প্রথম বাজেটের আকার চলতি অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে ১৯ শতাংশ বেশি হওয়ার আভাস মিলেছে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ব্যয় ধরে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের ফর্দ মেলাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে একবারেই আকার বাড়তে যাচ্ছে প্রায় এক লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা।
রীতি মেনে বাজেট উপস্থাপনের দিনটি এবারও হচ্ছে বৃহস্পতিবার। চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের হাত ঘুরে এক বছর পর আবার সংসদে দেওয়া হচ্ছে বাজেট। খালেদা জিয়ার সরকারে অর্থমন্ত্রী ছিলেন প্রয়াত সাইফুর রহমান। এরপর আর সরকারে থাকেনি বিএনপি। এবার তারেক রহমানের সরকারে অর্থমন্ত্রী হওয়া আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ওপর দায়িত্ব বর্তেছে সেই বাজেট সামলানোর।
বিএনপির আগের মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলে আসা চট্টগ্রামের এই রাজনীতিক ও এক সময়ের ব্যবসায়ী নেতা আমির খসরু বাজেটের আগে বিডিনিউজ টোয়েন্টেফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “একটা ভালো বাজেট আমরা দেব। সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কল্যাণের কথা এই বাজেটে থাকবে। ছাত্র-শ্রমিক-কামার-কুমার থেকে শুরু করে প্রান্তিক মানুষজন কেউই বাদ যাবে না।”
বরাবরের মত এবারও বিশাল ঘাটতি ধরেই বাজেট বাস্তবায়নের ছক একেছেন অর্থমন্ত্রী। বিশাল এ ঘাটতির বড় অংশই ঋণনির্ভর। মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বিপুল এ রাজস্ব আহরণ হলেও ঘাটতি ছাড়াবে ২ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার মত। দেশের ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র ও বিদেশি ঋণের সেই পুরনো ছকেই বাড়তি এ অর্থের যোগানের প্রত্যাশা।
আয়ের পকেট ছোট হওয়ায় এত বড় বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে যে কারণে নানাবিধ প্রশ্ন দীর্ঘ দিন থেকেই। এবারও সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সরকারের রাজস্ব আহরণের প্রধান সংস্থা খোদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআ) কর্মকর্তারাও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘আকাশচুম্বী’ এ বাজেট বাস্তবায়নের অর্থায়নের ছকের চেহারা দেখে ‘অবাক’। কেননা এতটা রাজস্বের মুখ কখনও দেখেনি বাংলাদেশ।
সংসদ ভবনে নিজের চেম্বারে বুধবার আসছে বাজেট নিয়ে মুখোমুখি হন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের বার্তা দেওয়ার যে বাজেট সাজানোর আভাস মিলছে তাতে বাস্তবায়নযোগ্য ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ থাকতে হবে।
তার মতে, বাজেটের আকার যদি বাস্তবায়নযোগ্য না হয়, তাহলে অন্যান্য চ্যালেঞ্জের কথা বলে লাভ নেই।
বর্তমান সংকটময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যয় ও আয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে অর্থ ব্যবহারে অগ্রাধিকার ঠিক করার মুন্সিয়ানা দেখানোর তাগিদ তার।
বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে যেয়ে খাদে থাকা অর্থনীতি আবার যেন ‘ঋণ ফাঁদে’ পড়ে না যায় সেটি বিএনপি সরকারকে বিবেচনায় রাখার কথা বলেছেন আরেক অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।
আর দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যেসব সংকট রয়েছে, সেগুলো থেকে উত্তরণে ক্ষমতাসীনদের ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছার’ দেখতে চাওয়ার কথা বলেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষক মাসরুর রিয়াজ।
কোনো গোষ্ঠীর কাছে অর্থনীতিকে জিম্মি করতে না দেওয়ার সদিচ্ছা ও রাজনৈতিক অবস্থান যদি থাকে, তাহলেই শুধু এই উত্তরণ সম্ভব, যোগ করেন তিনি।
তবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু অভয় দিচ্ছেন। মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাজেট নিয়ে আলাপকালে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দেশের প্রত্যেকটি মানুষের কথা মাথায় রেখে বাজেট দেওয়া হচ্ছে। সীমিত সম্পদের মধ্যেও প্রতিটি নাগরিককে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। কাউকে বাইরে রাখা হবে না। তাদের সুবিধা-অসুবিধা এবং জীবনযাত্রার মানের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি কীভাবে মোকাবেলা করা হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সীমিত সম্পদের তুলনায় বাজেটে সবার সুখ-দুঃখের কথা বিবেচনা করা হয়েছে।
জনগণের ওপর চেপে বসা মূল্যস্ফীতির বোঝা নামানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আবার কাঙ্খিত জায়গায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ খরা, কর্মসংস্থান, রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ধাক্কা, জ্বালানির বিপুল ব্যয়, বাণিজ্য ঘাটতি, বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব মোকাবেলায় অর্থমন্ত্রী তার ব্রিফকেস থেকে সংকট উত্তরণের কোন ফর্মুলা হাজির করেন সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বাজেট নিয়ে অনেক কিছুই খোলাসা করেছেন তিনি। তবে চমক থাকছে কি না তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত।
বিশাল বাজেট, ঘাটতি অর্থায়ন কীভাবে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এ সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনই হচ্ছে বাজেট অধিবেশন। বিকাল ৩টায় বাজেট উপস্থাপনের সূচি রয়েছে।
এ বাজেটের মাধ্যমে প্রথম পূর্ণাঙ্গ আর্থিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক দর্শন দেখানোর সুযোগ পাচ্ছে রাজনৈতিক ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার।
ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করতে বড় অঙ্কের প্রণোদনা, সরকারি চাকুরেদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নসহ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাড়ানোর পরিকল্পনার ছক কষে সামষ্টিক অর্থনৈতিক বহুমাত্রিক সংকট কাটানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। যে কারণে চলমান সংকোচনমূলক আর্থিক নীতির মধ্যেই তিনি বাজেটের আকার খুব বেশি না বাড়াতে বিশ্লেষকদের পরামর্শ মানছেন না। চলতি বাজেটের চেয়ে এক দফাতেই সোয়া লাখ কোটি টাকা বাড়ানোর আভাস দিয়েছেন।
সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরে বর্তমান বাজেটের আকারের চেয়ে প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি ব্যয়ের ছক কষেছেন অর্থমন্ত্রী।
ব্যয়ের বিশাল ক্যানভাস সাজাতে গিয়ে আয়ের খতিয়ানকেও নজিরবিহীনভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য ধরা হয়েছে। ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরে নতুন বাজেটের মূল কাঠামো দাঁড় করানোর খবর এসেছে। যেখানে প্রতিবারের মত এনবিআরের কাঁধেই থাকছে রাজস্ব আহরণের মূল ভার; লক্ষ্য রাখা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এর পরিমাণ ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা বেশি। তবে জুন শেষে যে প্রকৃত রাজস্ব আহরণ হবে সেটির চেয়েও বেশি আদায় করতে হবে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে এনবিআরের মাধ্যমে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে।
এনবিআর যদি চলতি অর্থবছরে ৪ লাখ কোটি টাকার আশপাশে আহরণ করতে পারে, তাহলে আগামী অর্থবছরের লক্ষ্য ছোঁয়ার জন্য দরকার হবে প্রায় ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। এর আগে সংস্থার ইতিহাসে এত প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি। সাধারণত এনবিআরের রাজস্বে প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশের আশপাশে হয়ে থাকে। যে কারণে এমন লক্ষ্যমাত্রাকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলেছেন বিশ্লেষকরা।
জুলাই আন্দোলন পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ দুর্দশায় এ সময়ে প্রবৃদ্ধির আরও কমেছে।
এছাড়া নন-এনবিআর কর থেকে ২৫ হাজার কোটি এবং রাজস্ব-বহির্ভূত কর থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আয়ের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করা হতে পারে প্রস্তাবিত বাজেটে।
এ হিসাবে ঘাটতির ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা মেটাতে বিদেশি ঋণ হিসেবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা (৪৬.৩৮ শতাংশ) এবং দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা (৪৭.২৮ শতাংশ) ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে।
ঘাটতির বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা (৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ) মিলবে জাতীয় সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য খাত থেকে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য অন্তর্বর্তী সরকার নিলেও পরে উন্নয়ন কাজের ধীরগতিতে এবং বিদেশি অর্থছাড় কমে যাওয়ায় সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৬৩ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজেটের এ বিশাল অঙ্কের ঘাটতি পূরণ করাই হবে আগামী দিনগুলোতে সরকারের সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ঘাটতি অর্থায়নে দেশি ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে কতটা সংকুচিত করবে, তা নিয়ে শিল্পোদ্যোক্তাদের কপালে এখনই চিন্তার ভাঁজ তৈরি করছে।
সরকারের বড় অঙ্কের ব্যয় পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। এতে করে কাঙ্খিত আয় প্রাপ্তির শঙ্কার পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন হাজির হচ্ছে।
সংসদ ভবনে নিজের চেম্বারে বুধবার আসছে বাজেট নিয়ে সঙ্গে আলাপের পর অধিবেক্ষণ কক্ষের দিকে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
যে সংকটের পাটাতনে বিএনপির বাজেট
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি দেশ পরিচালনা ও সম্পদের আহরণ এবং বণ্টনের দায়িত্ব নিয়ে এ বাজেট এমন সময়ে দিতে যাচ্ছে যখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি গত দেড় দশকের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি পার করছে।
অর্থমন্ত্রী নিজেই তার আলাপে-আলোচনায় এ কথা বারবার স্বীকার করেছেন যে, সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলো তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। অবস্থা এতটাই নাজুক যে তিনি বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘আমাদের দুই বছর কষ্ট করা লাগবে’।
এর পর কী ভালো হবে? মানুষের কষ্ট লাঘব হবে? উত্তর মেলা ভার। কেননা, সব কিছু দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহের ওপর নির্ভর করে না; দেশের বাইরের ঝড়-ঝঞ্ঝার মোকাবেলা করতেও হয়- যার নজির রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ ও ইরান যুদ্ধ। এর আগে ছিল কোভিড মহামারী। ফলে ছয় বছরের বেশি সময় ধরে একটার পর একটা ধাক্কা লেগেই আছে।
এর মধ্যেই গত ৩ জুন এক লাফে বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বাড়িয়েছে সরকার। দুই দফায় জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর পর এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় বাড়তি খরচের চাপে থাকা মানুষ আরও চাপের মুখে পড়েছে। সংসার চালানোর খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে বলে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
যে মুহূর্তে এ বিশাল বাজেট দিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু তখন অর্থনীতির অবস্থা মোটেই ভালো নয়। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ছাড়া অর্থনীতির অন্য সব সূচকই নেতিবাচক। রেমিটেন্সের উল্লম্ফন ও অব্যাহতভাবে ডলার কেনায় বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ সন্তোষজনক থাকলেও আমদানি বাড়লে এই সূচকও চাপের মধ্যে পড়বে।
এছাড়া রয়েছে লাগামহীন মূল্যস্ফীতির চাপ। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি একদম গেড়ে বসার তথ্য দিচ্ছে। বাজেটে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার রাজনৈতিক প্রত্যয় ব্যক্ত করার আভাস মিললেও তা অর্জনের জন্য মুদ্রা ও রাজস্বনীতির সমন্বয় বেশ অস্পষ্ট আকারে হাজির হচ্ছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের রক্তক্ষরণ ও ডলারের টাকার অবমূল্যায়ন হওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে গেছে। তাছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন ঠেকাতে আমদানির ওপর দীর্ঘদিন কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ থাকায় বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিছে।
এরমধ্যে আবার পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটে উচ্চ মূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানি ব্যাহত হওয়ায় দীর্ঘদিতের ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কলকারখানার উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।
রিজার্ভের পতন ঠেকাতে আওয়ামী লীগের নেওয়া আইএমএফের ঋণচুক্তির শর্ত মেনে সুদের হার বাজারভিত্তিক করার পর ব্যাংক ঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে ঠেকায় ব্যবসার খরচ অনেক বেড়েছে, যা নতুন বিনিয়োগের পথকে থামিয়ে দিয়েছে।
একই সঙ্গে আগের মেগা প্রকল্পগুলোর বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের দায় বাজেটের অনুন্নয়ন খাতকে গ্রাস করছে। এতে বিদেশি ঋণের অর্থছাড় থেকে ঋণ পরিশোধে খরচা বেশি হওয়ার পরিসংখ্যান দেখা যাচ্ছে বিগত কয়েকবছরে।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারের ১০০ দিনের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি উদ্বোধন করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। ফাইল ছবি
কী করা যেত? সাহস দেখাচ্ছে সরকার?
বিশ্লেষকরা বলছেন, জনজীবনে ব্যয়ের বোঝা না বাড়িয়ে বিএনপি সরকার প্রশাসন ও অর্থনীতি দেখভালের দায়িত্ব নিয়েই প্রশাসনিক সংস্কারে জোর দিতে পারত; উল্টো এনবিআর, ব্যাংকিং খাত ও আর্থিক খাতের নানা সংস্কারের আলাপ বন্ধ করে দিয়ে পূর্বের খত দীর্ঘস্থায়ী করার ইঙ্গিত দিয়েছে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে।
এর মধ্যে রাজস্ব প্রশাসন ও নীতি ভাগে সংস্কার বিষয়ক অধ্যাদেশ বাতিল করা, ব্যবসায়ী ও দলীয় পদধারীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব দেওয়া, এবং দুর্নীতি কমাতে দুদক সংস্কারে পিছু হটায় সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।
অর্থনীতিবিদ ও বাজেট বিশ্লেষকদের মতে, নতুন মেয়াদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হওয়ায় সরকারের সামনে কিছু কঠোর কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের ঐতিহাসিক সুযোগ ছিল। নির্বাচিত সরকারের যে রাজনৈতিক পুঁজি থাকে, তা ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতগুলো নিরাময় করা যেত।
তবে নতুন অর্থবছরের বাজেটে সেই সাহসিকতার চেয়ে ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখার ক্ষেত্রেই জোর দেওয়া হয়েছে। অতীতের ছকেই সাজানো হয়েছে বাজেটের হিসাব-নিকাষ। আমলাতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকার আভাসের কথাই বলছেন তারা।
এর সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত থেকে ঘুরে দাঁড়াতে করের হার না বাড়িয়ে আওতা বাড়ানোর কথা হলেও সরকার সেই পুরনো কর ছাড়ের সংস্কৃতির বেড়াজালে আটকে রয়েছে। সেখানে সাধারণের ওপর করছাড় বা করের বোঝা মেলার কোনো আভাস মিলছে না।
জ্বালানি সংকটে ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের চার দিনের মাথায় ঘোষণা হতে যাওয়া বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ার তথ্যও মিলছে না; বরং তারা এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার–যার কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল না তাদের দেওয়া করহারের ওপরই ভরসা রাখছে বিএনপি সরকার।
অন্যদিকে বিভিন্ন শিল্পে করছাড়ের পরিমাণ বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হতে পারে বলে যে খবর আসছে তাতে রাজস্বের বিশাল লক্ষ্য পূরণ কী করে হবে তা নিয়ে ‘অবাক’ খোদ এনবিআর কর্মকর্তারাই।
এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, “রাজস্ব প্রশাসনের ব্যাপক সংস্কার ছাড়া এতবড় লক্ষ্য অর্জন হবে না। তাছাড়া আইএমএফের কর্মসূচি স্থগিত হওয়ায় সম্ভবত এত ছাড় দিচ্ছে সরকার। প্রথম বাজেটে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে সুবাতাস দেওয়ার চেষ্টা করছে তারা। তবে পরে রাজস্ব কর্মকর্তাদের ওপর আদায়ের চাপ দেওয়া হলে সেটি সম্ভব হবে না।”
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি, এর মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘটনাবহুল দেড় বছর পেরিয়ে দেশ আবার গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরেছে। ফাইল ছবি
ভর্তুকির চোরাবালি
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে হয় সরকারকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও ভতুর্কির চাপ থাকবেই।
নতুন বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি রাখা হচ্ছে, যা অবশ্য চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে ভর্তুকি লক্ষ্য নির্ধারণের সমান। আর সংশোধিত ভর্তুকির তুলনায় এক হাজার কোটি টাকা বেশি।
খাদ্যে ভর্তুকির পরিকল্পনা করা হচ্ছে ৯ হাজার ৬০০ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ভর্তুকি রাখা হচ্ছে ২৫ হাজার ৫০০ টাকা। সাকূল্যে ৭২ হাজার ১০০ কোটি টাকার ভর্তুকি বরাদ্দের পরিকল্পনার ছক কষছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু- এমনটাই আভাস মিলেছে।
নির্বাচনি ইশতেহার ঘিরে সামাজিক সুরক্ষা
বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সামাজিক সুরক্ষাজালের আওতা ও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো এবং বিভিন্ন ধরনের কার্ড দেওয়ার মাধ্যমে তাদের জীবনমানের উন্নয়নের কথা বলা হয়েছিল।
সরকার সেদিক বিবেচনায় রেখে বাজেটে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা চলতি অর্থবছরে ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।
এর মধ্যে প্রথমবারের মত আটটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করার কথা ভাবছে সরকার, যেগুলোর মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ থাকছে। সরকারের পরিকল্পনায় আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ উপকারভোগীকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।
এছাড়া ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এ বাজেটের মাধ্যমে শুরু হচ্ছে। এ কার্যক্রমে উপকারভোগী ঠিক করা হয়েছে ৪২ লাখ ৫০ হাজার জন, যাদের প্রত্যেককে দেওয়া হবে বছরে আড়াই হাজার টাকা।
নতুন কর্মসূচির মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানে ‘শহীদের’ পরিবার এবং আহত ব্যক্তিদের মাসিক সম্মানী ভাতা কার্যক্রম ও মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানী কার্যক্রম রয়েছে।
অর্থনীতি যেন ‘ঋণ ফাঁদে’ না পড়ে
এতবড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে যেয়ে খাদে থাকা অর্থনীতিটা আবার যেন ‘ঋণ ফাঁদে’ পড়ে না যায় সেটি বিবেচনায় রাখার কথা বলছেন অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান।
মধ্যম আয়ের অনেক দেশের এ ধরনের ‘ঋণের ফাঁদে’ পড়ার উদাহরণ স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, এ শঙ্কা মাথায় রেখে নতুন সরকারকে আসছে অর্থবছরে ‘সাশ্রয়ী ব্যয়’, ‘প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা’ বাড়িয়ে ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠা এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে।
আগামী অর্থবছরে অর্থনীতিতে ‘সবচেয়ে বড় ঝুঁকি’ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যয়ের দিকগুলো ঠিক রাখা হলেও আয় যেভাবে প্রাক্কলন করা হয়েছে তা না হলে ঋণের ঝুঁকি তৈরি হবে।
“এই ঋণ ফাঁদে পড়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা, আমার মনে হয়- এই ঝুঁকিটা সরকারকে খুবই বিবেচনার মধ্যে রাখতে হবে।”
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের’ চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ এ বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের ‘আকাশচুম্বী প্রত্যাশার’ কথা তুলে ধরে বলেন, বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থেকে রেহাই পেতে চাইবেন তারা।
“দেখেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিটা গত কয়েকটা বছর ধারাবাহিকভাবে একটা চ্যালেঞ্জ বা একটা সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।”
এরমধ্যে মূল্যস্ফীতিকে ‘সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য’ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, “তো এখন আমরা ১২ (মূল্যস্ফীতি সূচক) বলি, ৯ বলি, সাড়ে ৮ বলি–সবই কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এই মূল্যস্ফীতিতে মানুষের কষ্ট হচ্ছে।”
এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকারের বাজেট নিয়ে মাসরুর রিয়াজ বলেছেন, উন্নয়ন ব্যয় কতটা বাড়বে আর মূল্যস্ফীতি কমাতে কতটা আঁটসাঁট নীতি মানা হবে–এই দুইয়ের সমন্বয় করাটাই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এক্ষেত্রে পরামর্শ হিসেবে মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনা, জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর কথা বলেন তিনি।
এ বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে, রাজস্ব সংকট ও ঋণের ফাঁদ হল- ‘দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ’।
‘প্রতিশ্রুতি পূরণের বার্তার’ বাজেট
মূল্যস্ফীতি ও সামষ্ঠিক অর্থনীতির চাপের মধ্যে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও বিভিন্ন সামাজিক ভাতা বাড়ানোর পরিকল্পনাকে ‘অত্যন্ত সময়োপযোগী’ হিসেবে বর্ণনা করলেও এর প্রাপ্তি ও বণ্টন নিয়ে সংশয়ের কথা প্রকাশ করেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, “এটাকে স্বাগত জানাতে হবে যে বর্তমানের প্রেক্ষাপটে এটার প্রয়োজন আছে, কিন্তু যেটা দেওয়ার কথা–সহায়তা, দরিদ্র মানুষের কাছে, নন-পুওর কিন্তু ভালনারেবল পরিবারগুলোর কাছে, সেখানে পৌঁছাতে পারবে কিনা–সেটা এখনো দেখার বিষয়।”
বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর জন্য প্রায় ১০০টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প সচল রয়েছে।
তার মতে, এসব প্রকল্পের ‘অতীত পারফরম্যান্স একেবারেই সন্তোষজনক নয়’ এবং এক টাকা দিতে গিয়ে দেড় টাকা খরচ হওয়ার মত ব্যবস্থাপনার সমস্যা রয়েছে।
এ বিশাল বাজেট দেশের বর্তমান সংকটময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করে জাহিদ হোসেন বলেন, “বিশাল বাজেট যেটা বার্তা দিচ্ছে সেটা হলো যে আমরা নির্বাচনে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। অনেক ধরনের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা খাত, অবকাঠামো–এখানে আমরা সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নের কথা বলেছি। এবং সেটা যেহেতু এটা তাদের প্রথম বাজেট, এই বড় আকারের বাজেট নির্ধারণ করে আমরা প্রতিশ্রুতি পালন করার পথে হাঁটা শুরু করেছি–সেরকম একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
“প্রশ্নটা হলো যে এত বড় আকার বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য হবে কিনা? এইটার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন, সেই অর্থটা পাওয়া যাবে কিনা? আর সেইটা যদি না করতে পারেন, তাহলে প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন বাজেটে থাকলেও ‘বাস্তবে কিন্তু সেইটা দেখা যাবে না।”
সমাধান কীভাবে?
নির্বাচিত সরকার এলে বিনিয়োগ স্থবিরতা কেটে ব্যবসা-বাণিজ্য গতি পাবে- অর্থনীতি ছন্দে ফিরতে শুরু কবে এমন প্রত্যাশার কথা এসেছে ঘুরে ফিরে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার চার মাস পরও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। সবাই তাকিয়ে এখন বাজেটের দিকে।
ধুঁকতে থাকা বিনিয়োগ আর প্রবৃদ্ধির চাকায় গতি ফেরাতে অর্থমন্ত্রীর এই বিশাল ব্যয় পরিকল্পনায় এক মরিয়া ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াই স্পষ্ট। তবে অর্থনীতির এই ক্রান্তিকালে এত বড় ব্যয় কাঠামোর অর্থায়ন করতে গিয়ে অতিরিক্ত ঋণ নির্ভরতা বিপদ তৈরি করবে কি না তা নিয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ এসেছে।
একই সঙ্গে ধুঁকতে থাকা ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট কাটানো, আর্থিক খাতের সংস্কার করা না গেলে ব্যাংক থেকে সরকার যে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে তা মাঠে মারা যাবে। তাতে সরকারকে ঝুঁকতে হবে টাকা ছাপানোর দিকে, যা শুধু মুদ্রাস্ফীতিই বাড়াবে না, উচ্চমূল্যের কষাঘাত আর সীমিত মজুরির এ সময়ে প্রকৃত আয় আরও কমে যাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, অর্থনীতিকে এমন এক নিম্নস্তরে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে একে আবার ওপরে তুলতে হলে কঠিন সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে হবে এবং কাঠামোগত পরিবর্তন আনতেই হবে।
শেষ পর্যন্ত সাধারণকে রক্ষায় অধিক গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি জরুরি ব্যয়ের অগ্রাধিকার ঠিক করা, মেগা প্রকল্প নিতে দ্বিতীয়বার ভাবা, পণ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছানোকে সংকট থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থমন্ত্রীও অবশ্য আশাবাদী সময় বদলাবে। সামনে সুদিন আসবে, তবে এজন্য কিছুটা সময় চান তিনি।
তিনি বলেছেন, এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে আগামী দুই বছর ‘কঠিন সময়’ যেতে পারে। তিনি এও বলেছেন, এই সময়ে সরকারকে এমন কিছু সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিতে হবে, যা জনপ্রিয় নাও হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি টেনে তুলতে প্রথমবার বাজেট দিতে এসে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কী সংস্কার করবেন, কী পরিবর্তন আনবেন–তা দেখার জন্য তার প্রথম বাজেটের দিকে তাকিয়ে আছে দেশের মানুষ।





