কখনও কখনও বন্ধুত্ব মানসিক চাপের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একসময় যার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা হত, ফোন এলেই মন ভালো হয়ে যেত— সেই বন্ধুর নাম স্ক্রিনে ভেসে উঠলে এখন কেমন একটা অস্বস্তি লাগে। কথা বলবেন কি বলবেন না, ভাবতে থাকেন।
দেখা করতে যাওয়ার কথা ভাবলে মনে হয় এত ‘এনার্জি’ নেই।
এই অনুভূতিটা কি চেনা ?
যদি চেনা লাগে, তাহলে জানুন— আপনি একা নন। আর এটা আপনার দোষও নয়। মনোবিজ্ঞানীরা এই অবস্থার নাম দিয়েছেন— ‘ফ্রেন্ডশিপ বার্নআউট’।
বন্ধুত্ব যেভাবে চাপের কারণ হয়
বন্ধুত্ব মানে সবসময় হাসি আর আনন্দ, এটা সত্যি। তবে সব বন্ধুত্ব একরকম হয় না।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলছেন, “অনেক সম্পর্কেই দেখা যায় একজন বন্ধুত্বটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বারবার চেষ্টা করছেন, তবে অন্যজন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছেন। একজন নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছেন, পাশে থাকছেন, সময় দিচ্ছেন— অন্যজন শুধু প্রয়োজনে ফোন করছেন।”
এই ভারসাম্যহীনতাটাই সমস্যার শুরু।
যখন একটা সম্পর্কে দেওয়া আর নেওয়া সমান থাকে না, তখন যে বেশি দিচ্ছেন তিনি আস্তে আস্তে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। বন্ধুত্ব তখন আর স্বস্তির জায়গা থাকে না, বরং মনে হয় একটা দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যের কষ্টের বোঝা কতটুকু বহন করবেন?
বন্ধুর দুঃখে পাশে থাকা ভালো মানুষের লক্ষণ। তবে কখনও কখনও এই পাশে থাকাটা একটা ফাঁদ হয়ে যায়।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলা হয় ‘ইমোশনাল ডাম্পিং’।
‘সাইকোলজি টুডে’তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মার্কিন মনোবিদ জুডিথ অরলফ বলেন, “যখন একজন বন্ধু শুধু ‘ডাম্পিং’ করে, সে আসলে তার জমে থাকা ক্ষোভের গ্রেনেডটি অপর বন্ধুর কোর্টে ছুঁড়ে দিয়ে নিজে হালকা হয়ে যায়। তবে অপর বন্ধুটিকে সেই ক্ষোভের আফটার-ইফেক্ট বা নেতিবাচক প্রভাব একাই সামলাতে হয়।”
মানে যে শুনছেন, তার কথা কেউ শোনে না।
প্রথম প্রথম এটা খুব একটা চোখে পড়ে না। তবে ধীরে ধীরে বন্ধুর ফোন দেখলেই মনে হতে থাকে, ‘আবার কী হল’। কথা বলতে বসার আগেই ভেতরে একটা ভার অনুভব হয়। বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে উঠলে নিজেকে আরও ফাঁকা মনে হয়।
এই অনুভূতিটাই ইমোশনাল বার্নআউটের লক্ষণ।
দেখা হওয়ার আগেই যদি ক্লান্তি আসে
ফ্রেন্ডশিপ বার্নআউটের সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ হল এটা।
যে বন্ধুর সঙ্গে একসময় দেখা হলে মন হালকা হয়ে যেত, তার সঙ্গে দেখা করার কথা ভাবলে এখন দমবন্ধ লাগে। মিটিং বাতিল না করার অজুহাত খোঁজেন। ফোন রিসিভ না করে রেখে দেন। মেসেজ পড়ে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেলে রাখেন।
২০২৫ সালে ‘হাঙ্গেরিয়ান সোশ্যাল কেয়ার লিডারস স্টাডি’র অংশ হিসেবে গবেশক শুটজম্যান ও তার দল ৪৪৯ জন ‘সোশাল কেয়ার লিডার’য়ের ওপর পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা চালান।
‘রেফরেন্সগ্লোবাল’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফলে জানানো হয়, অতিরিক্ত বন্ধুমহল বা সামাজিক সম্পর্কের চাপ উল্টো ‘বার্নআউট’ তৈরি করতে পারে। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার অতিরিক্ত মানসিক চাপ সরাসরি ‘বার্নআউটে’র সাথে যুক্ত।
এটা সবসময় খারাপ মানুষ হওয়ার লক্ষণ নয়। বরং এটা শরীরের সেই সংকেত যে, এই সম্পর্কে আপনি আর পুষ্টি পাচ্ছেন না, শুধু শক্তি হারাচ্ছেন।
ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলছেন, “এই অনুভূতিগুলো হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। এগুলো মানসিক স্বাস্থ্যের সংকেত, সেটা বোঝা জরুরি।”
সম্পর্ক ভাঙা একমাত্র সমাধান নয়
কেউ কেউ মনে করেন, বন্ধুত্বে সমস্যা হলে সম্পর্কটাই শেষ করে দেওয়া উচিত। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটা প্রয়োজন হয় না।
যা দরকার, তা হল সীমারেখা।
‘সাইকোলজি টুডে’তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘নিউ রুলস অফ ফ্রেন্ডশিপ’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বর্তমান ডিজিটাল যুগে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের কারণে বার্নআউট এড়াতে বন্ধুদের ‘মাইক্রো-ইন্টারেকশন’ বা স্বল্প যোগাযোগের দিকে ঝুঁকতে হবে।’
বন্ধুত্ব মানেই সবসময় সব কিছুতে হ্যাঁ বলা নয়। বন্ধুর মানসিক ভার বহন করতে করতে নিজেকে শেষ করে ফেলাটা কোনো সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ নয়। ‘আজ আমি একটু ক্লান্ত, পরে কথা বলব’ — এটুকু বলার অধিকার প্রত্যেকের আছে।
নিজের জন্য একটু সময় রাখা, নিজের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া— এটা স্বার্থপরতা নয়, এটা প্রয়োজনীয়তা।
সম্পর্কেও শ্বাস নেওয়ার জায়গা লাগে
যে কোনো সুস্থ সম্পর্কের জন্য একটু ফাঁকা জায়গা দরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস-ভিত্তিক কাউন্সিলিং সংস্থা ‘মর্ডান থেরাপি অনলাইন’য়ে প্রকাশিত নির্দেশিকায় জানানো হয়, ‘ফ্রেন্ডশিপ বার্নআউটের একটি বড় কারণ হল- বন্ধুদের সমস্যা শোনার সাথে সাথেই তা সমাধান করার জন্য নিজে অতিরিক্ত দায়িত্ব বা চাপ মাথায় নিয়ে নেওয়া।’
তবে এই কাজটি করা সব সময় ঠিক না। বন্ধু মানেই চব্বিশ ঘণ্টা পাশে থাকতে হবে, সব কথা জানতে হবে, সব সমস্যার সমাধান করতে হবে — এই ধারণাটা আসলে বন্ধুত্বকে দুর্বল করে দেয়।
সম্পর্কের মধ্যে শ্বাস নেওয়ার জায়গা না থাকলে সেটা একসময় চাপে পরিণত হয়।
নির্দেশিকার সমাধান হল- কোনো বন্ধু সমস্যা বললে নিজে উপযাচক হয়ে উপদেশ দেওয়া বন্ধ করতে হবে। বদলে কেবল ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’ বা সক্রিয় শ্রোতা হওয়া যেতে পারে। বন্ধুকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা যায়, ‘তুই কি এখন শুধু মন হালকা করতে চাস, নাকি কোনো সমাধান খুঁজছিস?’
যদি সে শুধু মন হালকা করতে চায়, তবে আপনার ওপর কোনো মানসিক চাপ সৃষ্টি হবে না।
আসলে কিছুটা দূরত্ব, কিছুটা নিজের জন্য সময়— এটা সম্পর্ককে ভাঙে না, বরং বাঁচায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটু বিরতির পর বন্ধুত্ব আবার আগের মতো হয়ে যায়, বরং আরও গভীর হয়।
নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন
বর্তমান সময়ে তরুণদের মধ্যে আবেগের গভীরতা অনেক বেশি। তারা সম্পর্কে নিরাপত্তা, বোঝাপড়া আর মানসিক সংযোগ খোঁজেন। তবে সেই আবেগের ভার বহন করার মতো শক্তি সবার সবসময় থাকে না।
আর এটা দোষের কিছু নয়।
সিঙ্গাপুরের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের বিশেষজ্ঞ দল নিয়ে তৈরি, ‘অ্যানাবেল সাইকোলজি ক্লিনিক্যাল গাইডস (২০২৬)’-এ ‘বার্নআউট’ থেকে বাঁচতে ‘সেলফ-কম্প্যাশন’ বা নিজের প্রতি সহানুভূতির ওপর জোর দিয়েছেন।
আমরা প্রায়ই বন্ধুদের সময় দিতে না পারলে এক ধরনের আত্মগ্লানি বা লজ্জায় ভুগি, যা মানসিক অবসাদ আরও বাড়িয়ে দেয়। মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ হল- নিজেকে বোঝানো যে, বন্ধুত্বে সীমারেখা টানা কোনো অপরাধ নয়, বরং নিজের মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া।
তাই নিজেকে প্রশ্ন করুন— এই বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার পর ‘আমি কি হালকা বোধ করি, নাকি ভারী?’ তার সঙ্গে সময় কাটালে নিজের ‘এনার্জি’ বাড়ে, নাকি কমে?
উত্তরটা যদি বারবার নেতিবাচক হয়, তাহলে বিষয়টা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
সম্পর্ক রক্ষা করতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলার কোনো মানে হয় না। পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই সুস্থ বন্ধুত্ব টিকে থাকে, একজনের ক্লান্তির মধ্য দিয়ে নয়।





