জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই পদে লড়বেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার লক্ষ্যে বাংলাদেশ এখন ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। ড. খলিলুর রহমান নিজেও এই পদে প্রার্থী হিসেবে আন্তর্জাতিক লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সভাপতি পদে নির্বাচন সামনে রেখে বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। সেখানে বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করছেন তিনি। এছাড়া নিউইয়র্কে যাওয়ার পথে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়।
এবার ৪০ বছর পর আবার এই পদে নির্বাচন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
ফিলিস্তিনের প্রত্যাহার
তবে শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিন সভাপতি পদ থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেয়। এখন বাংলাদেশকে সাইপ্রাসের সঙ্গে এই পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। সাইপ্রাসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পার্মানেন্ট সেক্রেটারি আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস এই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রতি বছর গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনে সাধারণ পরিষদের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি একটি করে ভোট দেয়। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সভাপতি নির্বাচিত হন।
সভাপতি পদটি সাধারণত ভৌগোলিক রোটেশন অনুযায়ী বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নির্বাচিত হয়ে থাকে এবং এর মেয়াদ এক বছর। ২০২৫ সালের জুন মাসে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক ৮০তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। এবার ৮১তম অধিবেশনের জন্য এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হবে। এর আগে ২ জুন এই পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের প্রতি সমর্থন আদায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তৎপর রয়েছেন। তিনি বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনায় এই পদে সমর্থন চাইছেন। গত ৬ মার্চ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সম্মানে আয়োজিত এক ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সমর্থন চান।
প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার তৎপরতা
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতার পক্ষে বিভিন্ন বৈঠকে সমর্থন চাইছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
ঢাকায় রাশিয়া, ডেনমার্ক, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে সভাপতি পদে প্রার্থী হিসেবে সমর্থন চান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আবদেলওয়াহাব সাইদানির এক বৈঠক হয়। বৈঠকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশকে সমর্থন দেয় আলজেরিয়া।
এ ছাড়া হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত লিবিয়ার রাষ্ট্রদূত আবদুল মুতালিব এস এম সোলাইমানের বৈঠক হয়। লিবিয়াও এই পদে বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছে।
ওআইসি বৈঠকে লবিং
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. খলিলুর রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল সৌদি আরব। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জেদ্দায় ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) বৈঠকে যোগ দেন তিনি।
বৈঠকের সাইডলাইনে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেন তিনি। সে সময় পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার, সৌদি আরবের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ এ আলখরেইজি, তুরস্কের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুসা কুলাকলিকায়া, ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ভারসেন ওহানেস ভার্তান আগাবেকিয়ান এবং গাম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরিং মদু এনজির সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।
এসব বৈঠকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে সমর্থন চান তিনি। অধিকাংশ নেতাই তাকে এই পদে সমর্থন দিয়েছেন।
কমনওয়েলথ বৈঠকে সমর্থন
গত ৮ মার্চ লন্ডনে কমনওয়েলথ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগ দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। সে সময় সাইডলাইনে বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার, কানাডার পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি রবার্ট অলিফ্যান্ট, দক্ষিণ আফ্রিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতাবিষয়ক উপমন্ত্রী আলভিন বোটেস, অ্যান্টিগুয়া ও বার্বুডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ই.পি. চেট গ্রিন এবং ঘানার পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যামুয়েল ওকুডজেটো অ্যাবলাকওয়ার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এসব দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমর্থন চান ড. খলিলুর রহমান।
বাংলাদেশ আশাবাদী
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশ প্রার্থী হিসেবে বেশ আশাবাদী। জেদ্দায় ওআইসির বৈঠক শেষে দেশে ফিরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের এই প্রার্থিতার বিষয়ে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর পূর্ণ এবং দ্ব্যর্থহীন সমর্থন পাওয়া গেছে।
তবে তিনি উল্লেখ করেন, সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের প্রার্থী পরিবর্তন করা হয়েছে। অন্যদিকে সাইপ্রাস সারা বছর প্রচার চালিয়েছে, অথচ বাংলাদেশের হাতে সময় রয়েছে মাত্র তিন মাস বা তারও কম। এটিই বড় চ্যালেঞ্জ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, ওআইসিভুক্ত দেশগুলো শুধু ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিই দেয়নি, বরং ঢাকার পক্ষে বিশ্বজুড়ে সক্রিয়ভাবে প্রচারও চালাবে।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও বলেন, ওআইসি দেশগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশ খুবই ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। এ পর্যন্ত পাওয়া সমর্থন বেশ জোরালো বলেও তিনি উল্লেখ করেন।




