ইরান যুদ্ধ: ইসরাইলের সঙ্গে কি যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব তৈরি হয়েছে ?

US-698825349ec42-69bd243d6a5d5

ইরান ও কাতারের যৌথ মালিকানাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে নিজের স্বভাবসুলভ কঠোর ভাষায় একটি বিবৃতি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র- ইরানের সাউথ পার্স- এ হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। প্রতিশোধ হিসেবে কাতারের একটি জ্বালানি কমপ্লেক্সে হামলা করে তেহরান।

পাল্টাপাল্টি এই হামলার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যে। একই সঙ্গে এই ঘটনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষোভও তীব্র করেছে। খবর বিবিসির।

জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলার এ ঘটনা নিয়ে নিজের ট্রুথ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে আবারও ইরানকে হুমকি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এমনকি ইসরাইল যে এই হামলার পরিকল্পনা করছে , এ সম্পর্কেও কিছু জানতেন না বলে দাবি করেছেন তিনি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজের পোস্টে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই যুদ্ধ নিয়ে কতটা একমত ও একই অবস্থানে রয়েছে, এই প্রশ্ন সামনে আসছে।

এছাড়া ট্রাম্পের এই পোস্ট যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এবং এর কৌশল ও লক্ষ্য নিয়ে কী বার্তা দিচ্ছে- তা নিয়েও নানা চলছে আলোচনা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র “এই হামলার বিষয়ে কিছুই জানত না।” যদিও তার এই বক্তব্যটি হামলার পর ইসরাইলের একাধিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সম্পূর্ণ বিপরীত।

ডানপন্থি পত্রিকা ইসরায়েল হায়োম দাবি করেছে যে, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত সপ্তাহের শেষে পারস্য উপসাগরীয় তিনটি দেশের নেতাদের সঙ্গে আসালুয়েহ-তে আসন্ন ইসরাইলি হামলার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।”

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অন্যান্য অনেক দাবির মতো এখানেও বক্তব্যের সত্যতা আসলে কতটা সেটি নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

ইসরাইলি হামলা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে শব্দগুলো বেছে নিয়েছেন, তাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে” গ্যাসক্ষেত্রের ওপর “হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ইসরাইল।”

এই ধরণের ভাষা সাধারণত ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার বর্ণনা দিতেই ব্যবহার করেন তিনি- যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ঘনিষ্ঠ মিত্রের সুপরিকল্পিত সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে নয়।

তাহলে ট্রাম্প কি ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে ইসরাইল অবিবেচকের মতো কাজ করেছে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে যেসব পোস্ট দেন, সেখানে মাঝেমধ্যেই ক্যাপিটাল লেটার বা ইংরেজি বড় হাতের অক্ষর ব্যবহার করেন।

কিন্তু ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরাইলের হামলার পর যে দীর্ঘ পোস্টটি তিনি দিয়েছেন সেখানে মাত্র একবারই সবকটি বড় হাতের অক্ষর ব্যবহার করেছেন।

তিনি লিখেছেন, “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান সাউথ পার্স ক্ষেত্রের ওপর ইসরাইল আর কোনো হামলা করবে না, যদি না ইরান বোকামি করে অত্যন্ত নিরপরাধ একটি দেশ- কাতার এর ওপর হামলার সিদ্ধান্ত নেয়।”

সবসময় পরিস্থিতির ওপর সরাসরি নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাওয়া প্রেসিডেন্টের জন্য, এটি কি আগে থেকেই দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন, নাকি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি এটি একটি সতর্কবার্তা?

বিভিন্ন সময় সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ ট্রাম্পের দেওয়া অনেকটা অগোছালো পোস্টগুলোর মতো এক্ষেত্রেও মূল বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বোঝা কঠিন।

তবে এর মাধ্যমে আগের সেই সব প্রতিবেদনগুলো আবারও সামনে আসছে, যেখানে বলা হয়েছিল যে, যুদ্ধ শুরুর দিকে ইরানের তেলের ডিপোগুলোতে ইসরাইলি হামলার কারণে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।

গভীর রাতে দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্টের একটি পোস্ট থেকে, খুব বেশি কিছু ধারণা করা, হয়তো ভুল হবে। ইসরাইলি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন যে, দুই দেশ একই পথে চলছে।

যদিও মাঝেমধ্যেই অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও তাদের মধ্যে দূরত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

এদিকে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। যেখানে তিনি ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বলেছেন, গ্যাসক্ষেত্রে হামলায় ইসরাইল “একাই কাজ করেছে।”

আর ইসরাইলি বাহিনীকে ভবিষ্যতে এই ধরণের হামলা থেকে “বিরত থাকতে” অনুরোধ করেছেন ট্রাম্প।

নেতানিয়াহু নিজেকে এবং ট্রাম্পকে ইরানের বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন- যেখানে ট্রাম্পই প্রধান।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, “কেউ কি সত্যিই মনে করে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কেউ বলে দিতে পারে কী করতে হবে?”

ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে পাল্টা-পাল্টি হামলার কারণে তেল ও গ্যাসের দাম আবারও বাড়ছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করার চেষ্টায়ও কোনো অগ্রগতি না থাকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ধৈর্য হারাচ্ছেন বলেই মনে হচ্ছে।

এই যুদ্ধ তাকে এমন সব অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখে ফেলছে, যা তার প্রশাসন সম্ভবত আগে থেকে অনুমান করতে পারেনি।

ইসরাইলে এই যুদ্ধের সমর্থন এখনও আকাশচুম্বী থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রে তা বর্তমানে ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

এই সংঘাত নেতানিয়াহুকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আরও একটি মেয়াদে টিকে থাকতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

Pin It