এখন প্রশ্ন হলো, দেশের আদালতে দীর্ঘসূত্রিতার কঠিন বাস্তবতার মধ্যে এক মাসের মধ্যে কি বিচার করা সম্ভব?
কীভাবে এক মাসের মধ্যে রামিসা হত্যাকাণ্ডসহ শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলাগুলোর বিচার এবং সাজা কার্যকর সম্ভব, তা নিয়ে কয়েকজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছে বাংলানিউজ। দীর্ঘসূত্রিতা এড়িয়ে কীভাবে সম্ভব, তার উপায় বলেছেন তারা।
বাংলাদেশে বিচারিক আদালয়ে রায় হওয়ার পরও ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সাজা কার্যকরের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। যেমন, মাগুরায় শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার বহুল আলোচিত মামলায় দ্রুততম সময়ে বিচারে আসামির মৃত্যুদণ্ড হলেও এই ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য ঝুলে আছে বিচার। চলমান দীর্ঘসূত্রিতার হিসাব অনুযায়ী আছিয়ার মামলার শুনানি হতে পারে আরও ছয় বছর পর। ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলাসহ বহু মামলার সাজা কার্যকর হয়নি, এসব মামলা ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির অপেক্ষায় আছে।
ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির দীর্ঘসূত্রিতার বিষয়ে আইনজীবীরা বলছেন, হাইকোর্ট বিভাগে আলাদা বেঞ্চ করে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ ঘটনা থেকে সাজা কার্যকর পর্যন্ত অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করতে হয়। অন্যথায় শুধু বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় পেলেও দ্রুত সাজা কার্যকরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে বছরের পর বছর।
শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলাগুলোর ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি দ্রুততম সময়ে শেষ করতে ‘বিশেষ বেঞ্চ’ গঠন করতে প্রধান বিচারপতির বরাবর আবেদনও করেছেন আইনজীবীরা।
‘বিশেষ বেঞ্চ’ গঠন করতে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদনকারীদের একজন আইনজীবী ফয়জুল্লাহ ফয়েজ।
এক মাসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি সম্ভব কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই সম্ভব। চার্জশিট থেকে সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যেই সম্ভব। চার্জশিটের দিন থেকে ভালোভাবে চিন্তা করলেই সম্ভব। আজকে চার্জশিট দিলাম, কালকে গ্রহণ করলাম, পরশু চার্জগঠন হলো। একদিন সাধারণ সাক্ষীরা সাক্ষ্য দেবেন। একদিন মেডিক্যাল সাক্ষী, আরেকদিন তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেবেন। তিন দিনে শেষ। চতুর্থ দিনে যুক্তিতর্ক, ৫ম দিন রায়। ট্রাইব্যুনালে ৫টি কার্যদিবসে রায় সম্ভব।
রায়ে আসামির মৃত্যুদণ্ড হলে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি ইস্যুতে আইনজীবী ফয়জুল্লাহ ফয়েজ বলেন, ডেথ রেফারেন্সের ফাইলগুলো সাত দিনের মধ্যে হাইকোর্টে আসে। ডেথ রেফারেন্স রেডি করে পরবর্তী এক মাসের মধ্যে শেষ করা কোনো বিষয় না। বিচারিক আদালতে রায় তো হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখানে (হাইকোর্টে) ৫/৭ বছর পড়ে থাকে। এটা যেন পড়ে না থাকে, এ জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেছি।
ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি দ্রুততম সময়ে শেষ করতে বিশেষ বেঞ্চ গঠনে আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, নারী-শিশুর জন্য ট্রাইব্যুনাল আলাদা করা হয়েছে। তার মানে এটাকে তো অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কিন্তু হাইকোর্টে অগ্রাধিকার না দিলে ট্রাইব্যুনালে আলাদা করে লাভ কী? এখন ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি চলছে ২০১৯ সালের। ৬ বছর পিছিয়ে আছে। হিসাব অনুসারে আছিয়ার মামলা ছয় বছর পর শুনানি হবে। পেপারবুক হলেও লাভ কী? যদি বিশেষভাবে বেঞ্চ গঠন না করেন, তাহলে আগে শুনানি হবে না। কারণ কার্যতালিকায় লেখা আছে সন ও নম্বরের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে শুনানি করতে হবে।
সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির বলেন, এক মাসের মধ্যেই বিচার সম্ভব। যদি চার্জশিট গ্রহণের পর কোনো প্রকার মুলতবি না দিয়ে একটানা বিচারিক কার্যক্রম চলে। যেমন, আছিয়ারটা হয়েছিল। এ ছাড়া বিশ্বে অনেক উদাহরণ রয়েছে। বিভিন্ন দেশে ৪ থেকে ৭ দিনের মধ্যেও ট্রায়াল শেষ হয়।
‘বিশেষ বেঞ্চ’ গঠনের আবেদন
শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলাগুলো থেকে উদ্ভূত ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি দ্রুততম সময়ের মধ্যে করার জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠনে প্রধান বিচারপতি বরাবর আবেদন করেছেন আইনজীবীরা।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) তারা এ আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, আমরা, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ে কাজ করছি, দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রিতা এদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে, বিভিন্ন সময়ে অধস্তন আদালতে চাঞ্চল্যকর, নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার হলেও, হাইকোর্ট বিভাগে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল এবং আপিল বিভাগের আপিল শুনানি করতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে।
বিচারক ও আইনজীবী হিসেবে আপনাদের ও আমাদের সবার এই দায় এড়ানোর উপায় নেই, তবে জুডিসিয়ারির সীমাবদ্ধতা আমরা বুঝি। তবুও সীমাবদ্ধ পরিস্থিতিতেও শিশু ধর্ষণ, শিশু হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো আলাদা করে, এতদসংক্রান্ত মামলাগুলো (ডেথ রেফারেন্স ও আপিল), বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে শুনানির ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সাধারণ ধাপসমূহ
আইনজীবী শফিকুল ইসলাম রনি বলেন, একজন আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তদন্ত, বিচার ও আপিল পর্যায়ে অনেকগুলো আইনি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রতিটি ধাপের ওপর নির্ভর করছে বিচার ও সাজা কার্যকরে কত সময় লাগবে।
একজন আসামি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সাধারণত নিচের ধাপগুলো অতিক্রম করতে হয়:
ঘটনা, মামলা দায়ের, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, আলামত জব্দ, খসড়া মানচিত্র, ভিকটিম/মরদেহ উদ্ধার, সুরতহাল প্রতিবেদন, ডাক্তারি পরীক্ষা/ময়নাতদন্ত, আসামি গ্রেপ্তার, আসামির জবানবন্দি/দোষ স্বীকার, ডিএনএ প্রতিবেদন, ১৬১ ধারায় সাক্ষীর জবানবন্দি, চার্জশিট, চার্জশিট গ্রহণ, চার্জ গঠন, সাক্ষ্য গ্রহণ, ৩৪২ ধারায় আসামিকে পরীক্ষা, যুক্তিতর্ক, তারপর সাজার রায়।
সাজার রায়ের পর ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি, হাইকোর্টের রায়, আপিল বিভাগে আপিল, আপিল শুনানি, আপিল বিভাগের রায়।
এরপর আসবে আপিল বিভাগে রিভিউ, রিভিউ শুনানি এবং রিভিউয়ের রায়।
তারপর পরের ধাপে রাষ্ট্রপতির নিকট প্রাণভিক্ষা, রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত, এরপর ফাঁসি কার্যকর।




