ক্রমাগত কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা

Untitled-13-5e026b6466a13

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে অর্থ সহায়তার পরিমাণ ক্রমশই কমছে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানে (জেআরপি) আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ ছিল ৭৩ শতাংশ। চলতি বছরের শেষে সেই পরিমাণ নেমেছে ৬৭ শতাংশে। অর্থাৎ গত দু’বছরে সার্বিকভাবে সহায়তার পরিমাণ ছয় শতাংশ কমেছে। ইন্টার সেকশন করপোরেশন কো-অপারেশন গ্রুপের (আইএসসিজি) সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এ তথ্য মিলেছে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ঢোকার পর থেকে প্রতিবছরই এ দেশে জেআরপি তৈরি করা হয়। এতে অর্থায়নের যে প্রাক্কলন করা হচ্ছে, তা জোগাড় করার চ্যালেঞ্জ ক্রমাগত বাড়ছে। এমনিতেই চাহিদা অনুযায়ী অর্থের জোগান কোনোবারই সম্পূর্ণ আসেনি। তার ওপর এখন এর পরিমাণ কমতে থাকায় চ্যালেঞ্জ প্রকট আকার ধারণ করেছে। কূটনৈতিক সূত্র জানাচ্ছে, জেআরপিতে সহায়তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বই এখন পর্যন্ত সিংহভাগ অর্থের জোগান দিচ্ছে। সহায়তায় প্রত্যাশিত সাড়া মিলছে না মুসলিম বিশ্বের।

২০১৯-এর জেআরপির জন্য যা মিলেছে : জাতিসংঘ-সংশ্নিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, চলতি বছর রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংকট মোকাবিলায় ৯২ কোটি ডলারের চাহিদা ছিল। গত ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৬২ কোটি ডলার। অর্থাৎ চলতি বছর মোট চাহিদার মাত্র ৬৭ শতাংশ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালে ৯৫ কোটি চাহিদার বিপরীতে সাড়ে ৬৫ কোটি ডলার পাওয়া গিয়েছিল। যা সেই বছরের চাহিদার ৬৯ শতাংশ। চাহিদার তুলনায় জোগান সবচেয়ে বেশি এসেছিল ২০১৭ সালে- মোট চাহিদার ৭৩ শতাংশ। আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে সহায়তার পরিমাণ এভাবে কমতে থাকলে সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের ব্যয় বেড়ে যাবে।

২০১৯ সালের জেআরপিতে চারটি খাতে বিশেষ নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সেগুলো হচ্ছে- খাদ্য নিরাপত্তা, দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা, শিক্ষা ও যোগাযোগ। এগুলোসহ মোট ১৭টি প্রয়োজন নির্ধারণ করে সহায়তা চাওয়া হয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কাছে। জেআরপি অনুযায়ী, উখিয়া ও টেকনাফের তিন লাখ ৩৬ হাজার স্থানীয় ও ৯ লাখ ১৫ হাজার রোহিঙ্গা অর্থাৎ মোট ১২ লাখ ৫১ হাজার জনকে খাদ্য নিরাপত্তার আওতায় আনতে প্রয়োজন ছিল ২৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। পাওয়া গেছে এর ৭৫ শতাংশ অর্থাৎ ১৯ কোটি ডলার। ডাবলুএএসএইচ (ওয়াশ) প্রকল্পে জনগোষ্ঠীর সাড়ে ১২ লাখ জনের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে পাওয়া গেছে মাত্র তিন কোটি ৯০ লাখ ডলার। আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজন ছিলো ১২ কোটি ৯০ লাখ ডলার, পাওয়া গেছে সাড়ে চার কোটি ডলার, স্বাস্থ্য খাতে আট কোটি ৯০ লাখ ডলারের চাহিদার বিপরীতে পাওয়া গেছে তিন কোটি ২০ লাখ ডলার, সাইট ব্যবস্থাপনার জন্য ৯ কোটি ৯০ লাখের বিপরীতে পাওয়া গেছে দুই কোটি ৭০ লাখ ডলার। দুর্যোগ থেকে সুরক্ষার আট কোটি ৬০ লাখ ডলারের বিপরীতে পাওয়া গেছে সাড়ে তিন কোটি ডলার। শিক্ষার জন্য পাঁচ কোটি ৯০ লাখের বিপরীতে মিলেছে তিন কোটি ৯০ লাখ ডলার। পুষ্টির জন্য চার কোটি ৮০ লাখ ডলারের চাহিদার বিপরীতে পাওয়া গেছে এক কোটি ৭০ লাখ ডলার। কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এক কোটি ১০ লাখ ডলার চাহিদার বিপরীতে পাওয়া গেছে ৩২ লাখ ডলার। সমন্বয় কার্যক্রমের জন্য ৪২ লাখ ডলারের বিপরীতে পাঁচ লাখ ১৩ হাজার ডলার এবং সরবরাহের জন্য ২৮ লাখ ডলারের চাহিদার বিপরীতে সাত লাখ ২৭ হাজার ডলার পাওয়া গেছে। শতভাগ অর্থায়ন মিলেছে শুধু জরুরি প্রয়োজনের ১১ লাখ ডলারের চাহিদার বিপরীতে।

গত বছর রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ২০২০ সালের জেআরপিতে স্বাস্থ্যসেবায় অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে জেআরপি ২০২০-এর খসড়া প্রায় প্রস্তুত। এবারও গত বছরের প্রায় সমপরিমাণ কিংবা কিছু বেশি ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। শিগগিরি তা প্রকাশ করে বিশ্বের কাছে সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা চাওয়া হবে।

সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে :আইএসসিজির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর ২৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার সহযোগিতা দিয়ে চাহিদার সিংহভাগেরই জোগান দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থ সহায়তায় দ্বিতীয় স্থানে যুক্তরাজ্য এবং তৃতীয় স্থানে জাপান অবস্থান করছে। এর পরেই রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ২০১৮ সালেও মোট চাহিদার সিংহ ভাগ ৩৬ শতাংশ (২৪ কোটি ডলার) এসেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই। রাশিয়া মাত্র ১০ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তা দিলেও চীন কোনো জেআরপিতে কোনো ধরনের সহায়তা দেয়নি। এদিকে মুসলিম বিশ্বের ধনী দেশগুলো থেকে যে ধরনের সহায়তা প্রত্যাশিত ছিল, তা কোনো বছরই পাওয়া যাচ্ছে না। সহায়তার জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে মূলত পশ্চিমা বিশ্ব এবং জাপানের ওপরই।

Pin It