মাইন বিস্ফোরণে ৩ মৃত্যু: ঘুমধুম এখন আতঙ্কের জনপদ
২০২৪ সালের পর থেকে সীমান্ত এলাকায় বেশ কিছু স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে বিজিবি সদস্য নিহতের ঘটনাও ঘটেছে।
মিয়ানমার সীমান্ত লাগোয়া পাহাড়ের একটি কলাবাগানে কলার ছড়া আনতে গিয়েছিলেন তিনজন। একসঙ্গে যাওয়ার সময় একজন সামনে এগিয়ে ছিলেন। প্রথম মাইন বিস্ফোরণের পর তিনি চিৎকার করেন। তখন তার কী অবস্থা, কী হয়েছে দেখতে যান বাকি দুজন। তারাও স্থলমাইনের উপর পা রাখেন। তখন আবার বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে একজনের পা সম্পূর্ণ উড়ে যায়; বাকি দুইজনেরও নিচের অংশে কিছু নাই।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় তিনজনের প্রাণহানির বর্ণনা দিচ্ছেলেন সেখানকার এক শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধি।
ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য ও গর্জনবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সৈয়দ হামজা স্থানীয়দের বরাত দিয়ে রাতে বলেন, সীমান্তে বেলা ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
বান্দরবানের সীমান্ত এলাকাজুড়ে বছর দুয়েক ধরে মাঝেমধ্যেই বিস্ফোরণে হতাহতের খবরের মধ্যে এবার এক স্থানেই প্রাণ গেছে এই তিনজনের। বছর দুই ধরে বিচ্ছিন্নভাবে স্থলমাইন বিস্ফোরণের এমন ঘটনা ঘটছে। এতে আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছেন এলাকাবাসী। তাদের চাষাবাদ ও দৈনন্দিন কাজে চরম দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।
সৈয়দ হামজা বলেন, “আমার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের এই এলাকাটা খবুই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রেজু ও ভালুকিয়া এলাকার সবাই চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে।”
শুধু স্থলমাইন নয়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরুর পর থেকে অপহরণের মত ঘটনাতেও আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে বান্দরবানের সীমান্ত এলাকাগুলো।
এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউপি সদস্য হামজা বলেন, “গত বছর দুজনকে অপহরণ করা হয়েছিল। আমরা সবাই মিলে বিজিবি ও পুলিশকে জানিয়েছি। এখনও পর্যন্ত কোনো খোঁজ মিলেনি। এখানকার মানুষ বেশিরভাগ খেটে-খাওয়া লোক। অভাবি মানুষ তারা। এভাবে ঘটতে থাকলে এখানকার মানুষ টিকে থাকতে পারবে না। এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে। এটা আপনারা পত্রিকায় লিখে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।”
নিহত তিনজনের মধ্যে চাকমা সম্প্রদায়ের দুজন এবং অপরজন তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের।
দুপুরে ঘুমধুম ইউনিয়নের বাইশফাঁড়ির সীমান্ত পিলার ৪১-৪২ মাঝে শূন্যরেখার বাংলাদেশের ২০০ গজ ভিতরে পলাশছড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে বান্দরবানের পুলিশ সুপার ওহাবুল ইসলাম খন্দকার জানান।
নিহতরা হলেন- ঘুমধুম ইউনিয়নের ঐমং চাকমার ছেলে চিংক্ষং চাকমা (৪৪), শুনি অং চাকমার ছেলে চোপোচিং চাকমা (৪৭) ও মৃত নেমং তংচ্যংগার ছেলে অংক্যমং তংচ্যংগা (৪৫)।
তারা সবাই ঘুমধুম ইউনিয়নের ভালুকিয়া এলাকার বাসিন্দা। বাগান থেকে কলার ছড়া আনতে গিয়ে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তারা নিহত হন।
এ ঘটনার পর স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা) তৎপরতার কথা বলেন।
তাদের ভাষ্যমতে, সীমান্তের এপারে ঘুমধুমের রেজু ও ভালুকিয়া এলাকায় আগে মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির তৎপরতা ছিল। ২০২৪ সালে ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্তে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মি ব্যাপক যুদ্ধ হয়। তখন রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা আরাকান আর্মির দখলে চলে যায়।
এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র সংগঠন আরসা ও আরএসও সংঘর্ষ ও গোলাগুলির খবর আসতে থাকে। এখন সীমান্তবর্তী ঘুমধুম এলাকায় আরসার প্রভার রয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করেন।
২০২৪ সালের পর থেকে সীমান্ত এলাকায় বেশ কিছু স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে বিজিবি সদস্যের নিহতের ঘটনাও ঘটেছে। কেউ কেউ পা হারিয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। এটি স্থানীয়দের কাছে উদ্বেগের।
‘আরাকান আর্মির পর আরসার নিয়ন্ত্রণ’
সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি তুলে ধরে ভালুকিয়ার পাড়ার বাসিন্দা বিমল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “২০২৫ সালের আগে ওই এলাকায় আরাকান আর্মি ছিল। তারা যাওয়ার পর তাদের সব এলাকায় আরসা এসে থাকে। গত বছর আমাদের পাড়ার দুজনকে অপরহরণ করে নিয়ে যায়। পরে আর তাদের পাওয়া যায়নি। তাদের উদ্ধারের জন্য বান্দরবান শহরে এসে মানববন্ধন পর্যন্ত করা হয়েছিল। মানববন্ধন শেষে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুর সন্ধান পাওয়া যায়নি।”
বিমলের ভাষ্য, “আরসা আমাদের এলাকাগুলোতে মাইন পুঁতে রেখেছে। কেউ গেলে প্রথমে ভয় দেখায়। তারপর মারধর করে। ভয় এবং আতঙ্কে অনেকেই নিজের এলাকায় এখন ঠিকমত কাজ করেও খেতে পারে না। আজকে আমাদের পাড়ার তিনজন কলার ছড়া আনতে গিয়ে এই পরিস্থিতি হল।”
বিমল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “গত বছর অপহরণ ঘটনার পর একজন নারী তার ছেলেকে নিয়ে ফুলঝাড়ু কাটতে যায়। সেখানে ১০-১২ জন আরসা সদস্য তাদেরকে বন্দুক দিয়ে আটকে রাখে। ছেলেটাকে দুই ঘণ্টা ধরে মারধর করেছে। পরে ছেড়ে দেওয়ার সময় হুমকি দিয়ে বলেছে, সেখানে যেন আর না আসে। কেউ আসলে জীবন নিয়ে আর ফিরতে পারবে না।
“দুই-তিন বছর হল আমাদের এলাকায় আর কোনো নিরাপত্তা নাই। কেউ ঠিকমত কোনো কাজ করতে পারে না। বাগানগুলো এমনি পড়ে আছে এখন।”
ঘুমধুম ইউনিয়নে বড়ইতলি পাড়ার বাসিন্দা শান্ত তঞ্চঙ্গ্যা নিজেদের ভোগান্তির কথা তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “শুরু থেকে জুমে কাজ করতে বাধা দিয়ে আসছে তারা। বাগানেও কাজ করতে দেয় না। এসে ভয় দেখায়, মারধর করে। গরু-ছাগলও নিয়ে যায়। কারও কাছ থেকে চাঁদাও নিয়ে যায়। ভয়ে কেউ কিছু বলতে পারে না। সবাই নিরবে সহ্য করে ছিল। ওখানে বিজিবিকে জানানো হয়েছিল। এখন তিনজন মারা যাওয়ার পর সবাই খবর নিচ্ছে।”
বড়ইতলি পাড়ার আরেক বাসিন্দা কিরণ তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “সবাই যেহেতু খেটে-খাওয়া মানুষ তাই ঝুঁকি নিয়ে হলেও জুমে কাজ করতে যায়। ঝুঁকি নিয়ে কেউ যায় বাগানে কাজ করতে। আজকে ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ভয়ে আর কেউ কাজ করতে যাবে না বলছে।
“এখন সবাই মিলে বসে একটা কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এভাবে তো আর সম্ভব নয়। কাজ করে টিকে তো থাকতে হবে। এখন এলাকায় কোনো জনপ্রতিনিধিও নাই যেখানে গিয়ে অভিযোগ দেব।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশে তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থার কেন্দ্রীয় মহাসচিব বলেন, “আজকের ঘটনা বাংলাদেশ সীমান্তের এপারে। কোনো একটা দেশের সশস্ত্র গোষ্ঠীর লোকজন এভাবে দেশের অভ্যন্তরে এসে মাইন পুঁতে রাখা সত্যি উদ্বেগজনক। গত বছর যে দুজনকে অপহরণ করা হয়েছিল তাদেরকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে সন্দেহ করছে স্থানীয়রা। এ ব্যাপারে আমরা প্রশাসন ও আইশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”
‘জনপ্রতিনিধিরা’ও চুপ
বিভিন্ন এলাকায় মাঠ পর্যায়ে স্থানীয়দের প্রশাসনিক দাপ্তরিক কাজ, নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা এবং জনগণের সেবাগুলো জনপ্রতিনিধিরাই করে থাকেন। কিন্তু নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমসহ বান্দরবানের তিনটি ইউনিয়নে কোনো নাগরিক সেবা যথাযথভাবে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। কেননা এই তিনটি ইউনিয়ন ইউনিয়ন মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। বর্তমানে সরাসরি কোনো জনপ্রতিনিধি নেই। স্থানীয় সরকারে নিয়োগ দেওয়া সরকারি কর্মকর্তা ও স্কুল শিক্ষকরাই জনপ্রতিনিধির কাজ সামলাচ্ছেন।
২০২৫ সালে মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় বান্দরবানে চার ইউনিয়নের প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তার মধ্যে তিন ইউনিয়নই নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার। সেগুলো হল নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়ন, ঘুমধুম ইউনিয়ন, সোনাইছড়ি ইউনিয়ন এবং লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন। ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে একজন সরকারি কর্মকর্তাকে প্রশাসক ও স্কুল শিক্ষকদের সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
ঘুমধুম ইউনিয়নে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সদদস্য ও গর্জনবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সৈয়দ হামজা বলেন, “আমার ওয়ার্ড, বাসা ও স্কুল একই জায়গায় হওয়ায় জনপ্রতিনিধির কাজ সামলাতে কোনো সমস্যা হয় না। আমার ওয়ার্ডটা একটু আলাদা। সবাই আমার পরিচিত, আমার প্রতিবেশী। সবাই খুব আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। সবার সঙ্গে একটা আলাদা সম্প্রীতির বন্ধন আছে আমার। কিন্তু অন্য এলাকার ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্তদের খুব হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরাসরি জনপ্রতিনিধি হলে জনগণকে আরও সেবা দিতে পারবে।”
ঘুমধুম ইউনিয়নে স্থলমাইন বিস্ফোরণের বিষয়ে জানতে চাইলে ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর বলেন, “ঘটনা শুনছিলাম। কিন্তু আমরা তো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সরকারি দায়িত্বে নাই। কোনো কিছু হলেও জনগণ আর আমাদের জানায় না। আর আমাদেরও সেভাবে কাজ করতে হচ্ছে না। যেহেতু আমরা কোনো দায়িত্বে নাই।”


