রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার আগে সারতে হবে আরও পরীক্ষা

Screenshot 2026-10-10 021632

এসব পরীক্ষা সফল হলে ধাপে ধাপে চুল্লির শক্তি বাড়ানো হবে; এরপর পর্যাপ্ত বাষ্প তৈরি করে টারবাইন চালানোর মাধ্যমে শুরু হবে বিদ্যুৎ উৎপাদন।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমতি মিললেও উৎপাদনে যাওয়ার আগে আরও কয়েকটি পরীক্ষা সারতে হবে।

এসব পরীক্ষায় সফল হলে ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে চুল্লির শক্তি। এরপর পর্যাপ্ত বাষ্প তৈরি করে টারবাইন চালানোর মাধ্যমে শুরু হবে বিদ্যুৎ উৎপাদন।

বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারী নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, প্রথম ইউনিটে এরই মধ্যে তিন শতাধিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি ভরার কাজও সম্পন্ন হয়েছে। এখন নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর প্রস্তুতি চলছে।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা) প্রথম ইউনিটকে বি-১ থেকে বি-২ পর্যায়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। এ অনুমোদনের মাধ্যমে কেন্দ্রটি নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর পরবর্তী প্রস্তুতি নিতে পারবে।

তবে অনুমোদন পাওয়ার অর্থ এখনই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়া নয়।

এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, প্রথমে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করতে হবে। এই বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হবে। সেই তাপ দিয়ে বাষ্প তৈরি করা হবে।

পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর পর আরও কয়েকটি পরীক্ষা করতে হবে। এসব পরীক্ষা সফল হলে কেন্দ্রটি ‘পাওয়ার স্টার্টআপ’ পর্যায়ে যাবে। এ পর্যায়ে চুল্লির শক্তি ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে।

জাহেদুল হাছান বলেন, “আমরা পাওয়ার রেজ করব স্টেপ বাই স্টেপ। পাওয়ার রেজ করতে করতে যখন আমরা ৩৭ শতাংশ পাওয়ারে যাব, তখন আমরা স্টিম যেটা তৈরি করতে পারব, সেই স্টিম দিয়ে আমরা টারবাইন ঘোরাতে পারব। আর টারবাইন ঘোরাতে পারলে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে।”

তবে চুল্লির শক্তি বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করলেও তা সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে না। এজন্য গ্রিডের সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংযোগ স্থাপন করতে হবে।

‘আট সপ্তাহের কাজ দশ সপ্তাহেও গড়াতে পারে’

জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের বিদ্যুৎ কবে যুক্ত হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো দিনক্ষণ জানাতে চাননি এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

তিনি বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সংবেদনশীল। নিরাপত্তার কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয় বলে কোনো পরীক্ষা শেষ করতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে।

কোনো পরীক্ষা দুই দিনে শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও আড়াই থেকে তিন দিন লাগতে পারে। আবার দশ দিনের কাজ আট দিনেও শেষ হতে পারে।

এভাবে বিভিন্ন পরীক্ষায় বাড়তি সময় লাগলে পুরো প্রক্রিয়া ১৫ দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে।

জাহেদুল হাছান বলেন, “বিষয় হলো এরকম যে আপনি দিতেছেন ৮ সপ্তাহের কাজ, ১০ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে, দুই সপ্তাহ বেশি লাগতে পারে।”

বিশ্বের অন্যান্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ও চালুর অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করে রূপপুরের বিলম্বকে যৌক্তিক মনে করছেন তিনি।

তবে এই বিলম্বের অর্থ দুই মাসের কাজ শেষ করতে দুই বছর লেগে যাওয়া নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জাহেদুল হাছান বলেন, “আমরা খুব শিগগিরই গ্রিড সিনক্রোনাইজেশনে যাব।”

গ্রিড সিনক্রোনাইজেশন হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করার প্রক্রিয়া।

তার মতে, পারমাণবিক চুল্লিতে প্রথম নিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়া শুরু হওয়া থেকে গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হতে সাধারণত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। তবে রূপপুরের ক্ষেত্রে প্রতিটি পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করবে এই সময়।

ত্রুটি ধরা পড়ায় ‘স্বস্তি’ বায়রার

বায়রার চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বলেছেন, প্রথম ইউনিটের একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের ভালভে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগের সময়সূচি রক্ষা করা যায়নি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, প্রথম ইউনিট এতদিন বি-১ পর্যায়ে ছিল। ওই পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের ভেতরে থাকা কয়েকটি ভালভ ঠিকমতো কাজ করছিল না।

সমস্যা সমাধানে রাশিয়া থেকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা আসেন। তাদের কাজের পর বুধবার বিভিন্ন পরীক্ষা সম্পন্ন হয়।

এরপর প্রকল্প কর্তৃপক্ষ পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আবেদন করে।

মাহমুদুল হাসান জানান, দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞরা পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের প্রতিবেদন এবং প্রকল্প কর্তৃপক্ষের জমা দেওয়া পরীক্ষার ফল যাচাই করে বি-২ পর্যায়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

বায়রা চেয়ারম্যান বলেন, “বি-১-এ ছিল, বি-২-তে যাবে। এই পারমিশনটা দেওয়া হয়েছে।”

তিনি জানান, বি-২ পর্যায়েও পরীক্ষা চলবে। এরপর ‘সি’ ও ‘ডি’ পর্যায়ে যেতে আলাদা অনুমোদন নিতে হবে।

আগের সময়সূচি রক্ষা করতে না পারার বিষয়ে মাহমুদুল হাসান বলেন, “তারিখ তো নির্ধারণ করেছিলাম এবং আমাদের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ও বলেছিলেন।”

এরপর যন্ত্রের ত্রুটির কারণে সেই সময়সূচি রক্ষা করা যায়নি বলে জানান তিনি।

নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় ভালভের ত্রুটি ধরা পড়ায় স্বস্তি প্রকাশ করে বায়রা চেয়ারম্যান বলেন, “ভালভটার যে ইস্যু ধরা পড়ছে, এটা তো আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া যে ধরা পড়ে গেছে এবং সেটা ওভারকাম করা হয়েছে। আল্লাহর কাছে হাজার হাজার কোটি কোটি শুকরিয়া।”

পাবনার ঈশ্বরদীতে রাশিয়ার সহায়তায় নির্মাণ করা হয়েছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।

Pin It