অতিরিক্ত লবণ খেয়ে কিডনির বারোটা বাজাচ্ছেন না তো ?
রক্ত পরিশোধন, দেহের ক্ষতিকর বর্জ্য নিষ্কাশন এবং তরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে কিডনি বা বৃক্ক সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করে চলে।। আর এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটিকে সুস্থ ও সচল রাখার জন্য খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে পটাসিয়াম থাকা অপরিহার্য।
এটি এমন এক খনিজ উপাদান যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে কিডনিকে দীর্ঘকাল সুরক্ষিত রাখে। তবে আধুনিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্যাভ্যাসের কারণে বেশিরভাগ মানুষের শরীরেই এই জরুরি পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থেকে যায়।
এই তথ্য জানিয়ে ‘হেলথ ডটকম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে, নিউ ইয়র্কের নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ জিলিয়ান কুবাল্লা বলেন, “ডায়েটে পটাসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যোগ করে, কিডনির রোগ ও পাথর হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।”
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও নেফ্রনের সুরক্ষা
জিলিয়ান কুবাল্লা জানান, উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন হল কিডনি বিকল হওয়ার প্রধান কারণ। রক্তচাপ অতিরিক্ত থাকলে, কিডনির সূক্ষ্ম ছাঁকনি বা ‘নেফ্রন’-কে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
পটাসিয়াম আসলে রক্তনালীগুলোকে শিথিল বা ‘রিল্যাক্সড’ করে এবং প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীরের অতিরিক্ত সোডিয়াম বের করে দিয়ে রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রায় নামিয়ে আনে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ পটাসিয়ামযুক্ত খাদ্যাভ্যাস, হাইপারটেনশনের রোগীদের স্ট্রোক ও কিডনির ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি বহু গুণ কমিয়ে দেয়।
দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের ঝুঁকি ২০ শতাংশ কমাতে পারে
২০২৪ সালে প্রকাশিত, কোরিয়ার সিউলে অবস্থিত ‘ইন্সটিটিউট অফ কিডনি ডিজিজ রিসার্চ’-এর ৩ লক্ষ ১৭ হাজারের বেশি মানুষের ওপর করা এক জনসংখ্যা-ভিত্তিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যাদের শরীরে পটাসিয়ামের উপস্থিতি পর্যাপ্ত ছিল, তাদের ‘ক্রনিক কিডনি রোগ’ বা ‘সিকেডি’-তে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্য সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম ছিল।
পটাসিয়াম সুস্থ মানুষের কিডনি ভালো রাখার পাশাপাশি, প্রাথমিক স্তরের কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে রোগের গতি ধীর করতে সাহায্য করে।
অতিরিক্ত লবণের ক্ষতিকর প্রভাব দূর করা
ফাস্টফুড, প্যাকেটজাত নাস্তা এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার কারণে অজান্তেই প্রচুর সোডিয়াম বা লবণ গ্রহণ করা হয়। যা রক্তনালীর ক্ষতিসাধন করে।
খাদ্যাভ্যাসে পটাসিয়ামের মাত্রা বাড়ালে, সোডিয়ামের ক্ষতিকর প্রভাবের বিরুদ্ধে বর্ম হিসেবে কাজ করে। এটি রক্তনালীর অভ্যন্তরীণ প্রদাহ বা ‘ইনফ্লেমেটরি মার্কা’র কমায় এবং ‘ভাস্কুলার ফাংশন’ বা রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া উন্নত করে।
কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমে
কিডনির বেশিরভাগ পাথরই ক্যালসিয়াম-ভিত্তিক হয়ে থাকে। পটাসিয়াম প্রস্রাবের মাধ্যমে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম বের হয়ে যাওয়ার হার কমিয়ে দেয় এবং মূত্রে ‘সিট্রেইট’ নামক যৌগের মাত্রা বাড়ায়।
এই যৌগ, ক্যালসিয়ামকে অন্য কোনো খনিজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শক্ত পাথরে পরিণত হতে বাধা দেয়। ফলে কিডনিতে পাথর বা স্টোন হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
পটাসিয়ামের উৎস ও গ্রহণে সাবধানতা
শরীর প্রাকৃতিকভাবে পটাসিয়াম তৈরি করতে পারে না, তাই প্রতিদিনের খাবারে পটাসিয়াম সমৃদ্ধ উপাদান রাখা জরুরি।
খাবার: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের ডাল বা বিন্স, কলা, টুনা বা সামুদ্রিক মাছ, মিষ্টি আলু, পালংশাক এবং কমলার রস রাখা উপকারী।
রোগীদের জন্য সতর্কতা: পুষ্টিবিদ জিলিয়ান কুবাল্লা সতর্ক করে বলেন, “পটাসিয়াম সুস্থ মানুষের কিডনির জন্য আশীর্বাদ হলেও, যারা ইতিমধ্যে ‘অ্যাডভান্সড’ বা শেষ ধাপের কিডনি রোগ বা ডায়ালাইসিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পটাসিয়াম উল্টো হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।”
তাই কিডনি বিকল রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পটাসিয়াম নিয়ন্ত্রণ করা বাধ্যতামূলক।
পর্যাপ্ত পানি পানের নিয়ম: পটাসিয়ামের সাহায্যে সোডিয়াম ও ক্যালসিয়ামের ক্ষতিকর পদার্থ শরীর থেকে সহজে ছেঁকে বের করতে কিডনিকে সাহায্য করার জন্য সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।





