ভিটামিন ট্যাবলেটের ক্ষতিকর দিক

Screenshot 2026-09-09 023418

নিজের বুদ্ধিতে মাল্টি-ভিটামিন খেয়ে লিভার বা যকৃতের বারোটা বাজাচ্ছেন নাতো ?

সুস্থ জীবনযাপন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো বা তারুণ্য ধরে রাখার মোহে বর্তমানে হরেক রকমের ভিটামিন বড়ি ও পুষ্টিকর পাউডার খাওয়ার চল হয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথাকথিত ‘ইনফ্লুয়েন্সার’দের ‘সাপ্লিমেন্ট স্ট্যাকিং’ (ভিটামিনের স্তূপ) বা তারকাদের দিনে ৩০টিরও বেশি পিল খাওয়ার অবাস্তব রুটিনের চটকদার প্রচারণায় প্ররোচিত হয়ে সাধারণ মানুষও ঝুঁকছেন এই ধারায়।

আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিয়মিত কোনো না কোনো সাপ্লিমেন্ট সেবন করছেন। তবে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ও চিকিৎসকদের মতে, শরীরের সুনির্দিষ্ট ঘাটতি ছাড়া এই নির্বিচারে ভিটামিন সেবন কোনো উপকার তো করেই না, উল্টো লিভার বা যকৃৎ ও কিডনি বা বৃক্কের স্থায়ী ক্ষতি ডেকে আনে।

স্বাস্থ্য-বিষয়ক পোর্টাল ‘হেলথ’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. কারিনা অ্যাপল বলেন, “সুষম খাদ্যতালিকাই পুষ্টির আসল উৎস। কোনো বড়ি বা ট্যাবলেট খেয়ে অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার ক্ষতিপূরণ করা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব।”

‘ট্রিপল ডিপিং’ বা অতিরিক্ত সেবনের ফাঁদ

ডা. কারিনা সতর্ক করেন, “মানুষ অনেক সময় না বুঝেই একই উপাদান একাধিক বড়ির মাধ্যমে বারবার গ্রহণ করেন, যাকে চিকিৎসায় ‘ডাবল বা ট্রিপল ডিপিং’ বলা হয়।”

যেমন, কেউ যদি একই সঙ্গে একটি মাল্টিভিটামিন, নখ ও চুলের জন্য বিশেষ ‘গামিজ’, ইমিউনিটি বুস্টার পাউডার এবং প্রোটিন শেইক নিয়মিত গ্রহণ করেন, তবে তিনি অবচেতনেই একই ভিটামিন ও খনিজ তিন-চারবার করে সেবন করছেন।

পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলো (যেমন ভিটামিন ‘সি’ বা ‘বি’) প্রস্রাবের সঙ্গে ধুয়ে বের হয়ে গেলেও, ‘ফ্যাট-সলিউবল’ বা চর্বিতে দ্রবণীয় উপাদানগুলো শরীরে বিষাক্ত মাত্রায় জমে যায়।

চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনের বিষাক্ততা

স্থূলতা ও জীবনযাপন-বিষয়ক মার্কিন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. নিওমা ওপারাজি ব্যাখ্যা করেন, “ভিটামিন ‘এ’, ‘ডি’, ‘ই’ এবং ‘কে’ প্রাকৃতিকভাবেই শরীরের মেদ বা ফ্যাটি টিস্যুতে দীর্ঘকাল জমা থাকে। চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া এগুলো অনবরত খেয়ে গেলে, রক্তে ও কোষে বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছায়। ফলে কিডনিতে শক্ত পাথর জমা, স্নায়ুতন্ত্র স্থায়ীভাবে অবশ হয়ে যাওয়া এবং হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক পাম্পিং গতি ওলটপালট হয়ে মারাত্মক ‘অ্যারিদমিয়া’ বা অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন দেখা দিতে পারে।

যকৃতের অকাল অবক্ষয়

গবেষণার চোখ কপালে তোলার মতো তথ্য হল, ‘প্রাকৃতিক’ বা ‘ভেষজ’ ট্যাগ লাইনে বিক্রি হওয়া সাপ্লিমেন্টগুলোই ইদানীং লিভার বা যকৃত নষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই তথ্য জানিয়ে ডা. ওপারাজি বলেন, “আমার রোগীরা মারাত্মক অবাক হন, যখন আমি তাদের বলি অতিরিক্ত হলুদ বা গ্রিন টি এক্সট্রাক্টের মতো অতি-জনপ্রিয় সাপ্লিমেন্টগুলো লিভারের টিস্যু পুড়িয়ে দেয়।”

যেহেতু সাপ্লিমেন্টগুলোর ওপর কড়া ওষুধ প্রশাসনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তাই এগুলোর ভেতরে অনেক সময় ক্ষতিকর ভারী ‘মেটাল’ বা সীসার দূষণ লুকিয়ে থাকে যা লিভারকে অবশ করে ফেলে।

জরুরি প্রেসক্রিপশন ওষুধের কার্যকারিতা হ্রাস

ডা. কারিনা আপেল জানান, সাপ্লিমেন্টগুলো রক্তে প্রবেশ করে অন্যান্য নিয়মিত ওষুধের ‘মেটাবলিজম’ বা হজম প্রক্রিয়া পুরোপুরি ওলটপালট করে দেয়।

বাতের ওষুধ, রক্ত পাতলা করার মেডিসিন বা উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের জন্য নির্দেশিত ওষুধের সঙ্গে এই ভিটামিনগুলোর নেতিবাচক বিক্রিয়া ঘটে। ফলে মূল ওষুধের কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে কমে যায়, যা একজন ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগা রোগীর জীবনকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।

অলস জীবনযাত্রার মানসিক কুপ্রবৃত্তি

চিকিৎসকেরা লক্ষ্য করেছেন, যারা মুঠো মুঠো সাপ্লিমেন্ট খান, তাদের মাঝে এক ধরনের মিথ্যা সুরক্ষাবোধ তৈরি হয়। তারা ভাবেন বড়িই যখন সব পুষ্টি দিচ্ছে, তখন অনিদ্রা, ‘ক্রনিক স্ট্রেস’ বা তীব্র মানসিক চাপ, কায়িক শ্রমের অভাব এবং প্রতিদিন অতি-প্রক্রিয়াজাত জাঙ্ক ফুড বা ফাস্টফুড খাওয়ায় কোনো ক্ষতি নেই।

ডা. ওপারাজি কড়া সতর্ক করেন যে, “আপনি কোনোভাবেই ওষুধ খেয়ে রাতে ঘুম না হওয়া, অলস বসে থাকা আর চিপস-বা ‘রিচ ফুড’ খাওয়ার ক্ষতিকর ঘাটতি পূরণ বা সাপ্লিমেন্ট করতে পারবেন না।”

যাদের জন্য সাপ্লিমেন্ট দরকার হয়

চিকিৎসাবিজ্ঞানে কিছু সুনির্দিষ্ট বিশেষ ক্ষেত্রে সাপ্লিমেন্টকে পরম প্রতিষেধক ও বাধ্যতামূলক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।

গর্ভবতী নারী: গর্ভস্থ শিশুর মস্তিস্ক ও স্নায়ুর জন্মগত বিকৃতি রোধ করতে চিকিৎসকের নির্দেশনায় ‘প্রিন্যাটাল ভিটামিন’ ও ফলিক অ্যাসিড সেবন করা যায়।

ভেগান বা কঠোর নিরামিষাশী: যারা ডিম, মাংস বা দুগ্ধজাত খাবার সম্পূর্ণ বর্জন করেন, তাদের শরীরে প্রাকৃতিকভাবেই রক্তাস্বল্পতা দেখা দেয়। এদের জন্য ওরাল ‘ভিটামিন বি১২’ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যায়, তাও চিকিৎসকের পরামর্শে।

নিজের সাপ্লিমেন্ট রুটিন যাচাইয়ের ৩টি বৈজ্ঞানিক নিয়ম

ডাক্তারের বার্ষিক মূল্যায়ন: ইন্টারনেট বা এআই-এর মনগড়া পরামর্শ বাদ দিয়ে, প্রতি বছর ল্যাবরেটরিতে রক্তের পুষ্টি মার্কার পরীক্ষা করা উচিত। চিকিৎসক শরীরের নির্দিষ্ট অভাব দেখেই কেবল সঠিক ডোজ নির্ধারণ করবেন।

থার্ড-পার্টি টেস্টিং সিল: বাজার থেকে সাপ্লিমেন্ট কেনার সময় বোতলের গায়ে এনএসএফ, ইউএসপি বা কনজ্যুমারল্যাব-এর মতো আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ সংস্থার ‘ল্যাব-টেস্টেড সিল’ বা ‘স্ট্যাম্প’ সতর্কতার সঙ্গে দেখে নেওয়া নিরাপদ।

অভ্যন্তরীণ আর্দ্রতা সচল রাখা: কৃত্রিম কেমিক্যালের অতিরিক্ত ধকল থেকে কিডনি ও লিভারের স্বাভাবিক ছাকন প্রক্রিয়া সচল রাখতে সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।

Pin It