শর্তে আইএমএফ’র সঙ্গে সরকারের মতবিরোধ

IMF-(1)-68ffdc6c65477

সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আবারও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। সংস্থাটি মনে করছে, বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি দিয়েও ঋণের শর্ত পূরণ করেনি। সেজন্য তারা আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে আসা নতুন সরকারের কাছ থেকে শর্ত বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি নিয়েই ঋণের ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় করতে চায়। অন্যদিকে বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, আইএমএফের মৌলিক অধিকাংশ শর্তই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যেগুলো হয়নি সেগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। হুট করে এগুলো করা সম্ভব নয়। সময় নিয়ে করতে হবে। এসব কারণে আগামী কিস্তি ডিসেম্বরের মধ্যেই ছাড় করা উচিত। এমন পরিস্থিতিতে আইএমএফের ঋণের ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড়ের শর্ত পূরণের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে আগামী বুধবার একটি মিশন বাংলাদেশে আসছে। তারা দুই সপ্তাহ দেশে অবস্থান করে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করবে।

সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ঋণের শর্তের বিষয়ে আইএমএফের প্রধান আপত্তি হচ্ছে ডলার নিয়ে। সংস্থাটি মনে করে অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশে ডলারের দাম তুলনামূলকভাবে কম। এর দাম আরও বেশি হওয়া উচিত। সরকার মনে করছে, বাংলাদেশে ডলার অতিমূল্যায়িত। এর দাম এত বেশি হওয়া উচিত নয়। কারণ বিগত সরকার ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেশি হারে কমিয়েছে। কিন্তু আইএমএফ মনে করছে, প্রকৃত বিনিময় হারে ডলারের দাম বাজার দরের চেয়ে বেশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য রয়েছে এমন ১৫টি দেশের মুদ্রার সঙ্গে সমন্বয় করে ডলারের বিপরীতে টাকার মান নিরূপণ করে সেটি প্রকৃত বিনিময় হার নামে পরিচিত। বাজারে যে দামে ডলার বেচাকেনা হয় সেটি সাধারণ বা নমিনাল বিনিময় হার নামে পরিচিত। বর্তমানে প্রকৃত বিনিময় হার ১২৭ টাকা, বাজারে ডলার বিক্রি হচ্ছে ১২২ টাকায়। এখানে ৫ টাকার ব্যবধান রয়েছে। এ কারণে ডলারের দাম বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া উচিত।

সংস্থাটির মতে, বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ না করলে বাজারই ডলারের প্রকৃত দাম নির্ধারণ করবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের কারণে এর দাম বাজার নির্ধারণ করতে পারছে না। এজন্য আইএমএফ চাচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনবেও না, বিক্রিও করবে না।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ডলারের দাম এখন বাজারই নির্ধারণ করছে। বাজারের ডলারের প্রবাহ বেড়ে গেলে এর দাম পড়ে গিয়ে মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে, এটি ঠেকাতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে। এছাড়া রিজার্ভ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েই ডলার কেনা হচ্ছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি করছে না। প্রতিবেশী ভারতসহ প্রায় সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকই বাজার থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার কেনে ও বিক্রি করে। এটি শুধু বাংলাদেশ করছে তা নয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত জুলাইয়ে মুদ্রানীতি ঘোষণার সময়ই বলেছিল, সেপ্টেম্বর থেকে নীতি সুদের হার কমাবে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশিতভাবে না কমায় সেটি করেনি। এখন বলছে, আগামী জানুয়ারি থেকে নীতি সুদের হার কমাবে। এতেও আইএমএফ আপত্তি করেছে। তারা বলেছে, মূল্যস্ফীতির হার ঝুঁকির নিচে না আসা পর্যন্ত নীতি সুদের হার কমানো ঠিক হবে না। এ হার কমপক্ষে ৫ শতাংশের মধ্যে এলে নীতি সুদের হার কমানো যায়, এর আগে নয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক একাধিক প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার অনেকটা বাজার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণে হচ্ছে। মুদ্রানীতি বা টাকার প্রবাহের সঙ্গে এর তেমন সম্পর্ক নেই। যে কারণে চলতি অর্থবছরসহ পরপর চার অর্থবছর ধরে টাকার প্রবাহ কমানোর নীতি অনুসরণ করেও মূল্যস্ফীতির হার কমানো যায়নি।

আইএমএফের অন্যতম একটি শর্ত হচ্ছে, খেলাপি ঋণ ২০২৬ সালের মধ্যে সরকারি ব্যাংকে ১০ শতাংশের মধ্যে ও বেসরকারি ব্যাংকে ৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা। এ শর্ত দিয়েছিল ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাটের চিত্র বেরিয়ে আসতে থাকে। যে কারণে এখন খেলাপি ঋণ বেড়ে ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এ কারণে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি কমানো যাচ্ছে না। দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়ে গেছে, এ কারণে অর্থনীতিতে ওলটপালট হচ্ছে, আইএমএফ এটি আমলে নিচ্ছে না।

আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ব্যাপকভাবে সংস্কার করতে হবে। তা না হলে রাজস্ব আয় বাড়ানো যাবে না। কর জিডিপি অনুপাতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন। এটি বাড়াতে হবে। এজন্য করছাড় ও কর অবকাশে ছাড় দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে বলেছে সংস্থাটি। এদিকে সরকার এনবিআরে ব্যাপক সংস্কার এনেছে। আরও সংস্কার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। করছাড় ও কর অবকাশ কমানোর জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার জন্য আইএমএফের একটি পর্যালোচনা মিশন আগামীকাল বুধবার ঢাকায় আসছে। তারা এবার দুই সপ্তাহ দেশে অবস্থান করে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করবে।

আইএমএফের নজরে নবম পে স্কেল

==========================

নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে ঋণ অনুমোদনের আগে চলতি অর্থবছরের বাজেট, রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থায়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চাইছে সংস্থাটি।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১২ থেকে ১৬ জুলাই আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করবে। সফরের প্রথম দিন অর্থ বিভাগের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম বৈঠকে বাজেট, রাজস্বনীতি, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থায়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে। দ্বিতীয় বৈঠকে গুরুত্ব পাবে নবম জাতীয় পে স্কেল, সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা এবং এ খাতে সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা।

চলতি বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। জুলাই থেকেই নতুন পে স্কেল কার্যকর হয়েছে। অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইএমএফের কাছে সরকারের মধ্যমেয়াদি বাজেট পরিকল্পনা, রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং নতুন পে স্কেলের অর্থায়নের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। সরকারের প্রত্যাশা, এসব আলোচনার ভিত্তিতে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে নবম পে স্কেলের জন্য অতিরিক্ত ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হবে। এই অর্থ বাজেটের অপ্রত্যাশিত ব্যয় খাতে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে। সরকার আগামী অর্থবছরের মধ্যে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ পে স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে।

এ অবস্থায় আইএমএফ জানতে চাইছে, বর্তমান রাজস্ব আদায়ের ধারা, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং কমে যাওয়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে অতিরিক্ত এই ব্যয় কীভাবে সামাল দেওয়া হবে। সংস্থাটির মতে, নতুন ঋণ কর্মসূচি অনুমোদনের জন্য সরকারের শক্তিশালী নীতিগত অঙ্গীকার, বাস্তবসম্মত সংস্কার পরিকল্পনা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার গ্রহণযোগ্য ভিত্তি থাকা প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা রাজস্ব আহরণ। জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার অনেক কম। অন্যদিকে সরকারি ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে পে-স্কেলের মতো বড় ব্যয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়ে যাবে।

আইএমএফের পর্যবেক্ষণে রয়েছে, কয়েক বছর ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। একই সময়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতিও অর্থনীতির জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও দক্ষতা দেখাতে হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং ই হেলথ কার্ড কর্মসূচি চালুর ঘোষণাও আইএমএফের আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্বাস্থ্য খাত এবং সরকারি বেতন ব্যয় একসঙ্গে বাড়লে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর তার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইবে প্রতিনিধি দল।

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। তবে এর সঙ্গে অবশ্যই রাজস্ব আহরণ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সমন্বয় থাকতে হবে। সরকারকে ব্যয়ের পাশাপাশি রাজস্ব বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দেখাতে হবে। আইএমএফ হয়তো সেটিই দেখতে চাইছে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, আইএমএফ শুধু ঋণ দেয় না, অর্থনীতির সক্ষমতাও মূল্যায়ন করে। নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তবে একই সঙ্গে কর সংস্কার, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো জরুরি। অন্যথায় সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ কর্মসূচি অনুমোদনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে আইএমএফের সুপারিশ করা সংস্কার বাস্তবায়ন। কারণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনাই আগামী দিনে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করবে।

Pin It