মুজিবনগরে শপথ গ্রহণ দিবসে শ্রদ্ধা

1776436718-fe61949c14dc5136a350718cfa62e0fc

মহান মুক্তিযুদ্ধের অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ দিবস উপলক্ষ্যে মেহেরপুরের মুজিবনগরে (বৈদ্যনাথতলা) শপথস্থল পরিদর্শন ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। এসময় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনাগুলোর পুনর্বাসনে জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) বিকেল ৩টায় নাগরিক সমাজের একটি প্রতিনিধি দল ঐতিহাসিক আম্রকাননে অবস্থিত শপথস্থলে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে তারা মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ এলাকা ও আশপাশের মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা ঘুরে দেখেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ও অবহেলিত স্মৃতিচিহ্নগুলোর বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর) বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার শপথ গ্রহণ করে। এ ঘটনা মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর মধ্যে এনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে শক্তিশালী ভিত্তি দেয়।

ফলে দিনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও লেখক আবু সাইদ খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি সর্বজনীন জনযুদ্ধ, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই অংশ নিয়েছিল।

তাই মুক্তিযুদ্ধকে কোনো ব্যক্তি বা দলের একক অর্জন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে রাষ্ট্রের আন্তরিক ও দায়িত্বশীল উদ্যোগ থাকা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ‘এসব ঘটনার পরও দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী,’ যোগ করেন তিনি।

এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, ‘এই বৈদ্যনাথতলা থেকেই মুক্তিযুদ্ধকে একটি সংগঠিত রূপ দেওয়া হয়েছিল। অস্থায়ী সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের তিনটি ফোর্সে সংগঠিত করে পরবর্তীতে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে যুদ্ধ পরিচালিত হয়। তাই এই স্থানটি শুধু একটি স্মৃতিচিহ্ন নয়, এটি আমাদের স্বাধীনতার কৌশলগত ভিত্তির প্রতীক।’

তিনি বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংসের অপচেষ্টায় লিপ্ত। আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই– মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মারকও যেন হারিয়ে না যায় এবং যারা এসবের সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।’

সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র বারবার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এখনো কিছু গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত বা মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। মুক্তিযুদ্ধকে সর্বোচ্চ স্থান না দিলে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।’

নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের যে অঙ্গীকার ছিল, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও আমরা তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারিনি। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর উচিত সেই আদর্শকে সামনে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করা।’

তিনি আরও বলেন, মুজিবনগরে একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা গেলে তা নতুন প্রজন্মের জন্য ইতিহাস জানার একটি কার্যকর মাধ্যম হবে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

প্রতিনিধি দলে আরও উপস্থিত ছিলেন বাসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী, মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা, রফিক আহমেদ সিরাজীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্রতিনিধিরা।

অংশগ্রহণকারীরা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ শুধু অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দায়িত্ব। তাই ইতিহাসের সঠিক চর্চা, গবেষণা ও সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

Pin It