বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ জয়ে কীভাবে ‘বড় ভূমিকা’ রেখেছে বাংলাদেশ

Screenshot 2026-05-05 040538

“মূলত একটি লাল (বামপন্থি) রাজ্যকে গেরুয়া রঙে বদলে দিতে একটি শক্তিশালী গল্পের প্রয়োজন ছিল, যা ব্যালট বক্সের মাধ্যমে এক ধরনের রঙিন বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে।”

বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে টানা ১৫ বছর ধরে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসকে ধসিয়ে দিয়ে ইতিহাস গড়েছে বিজেপি। বিপুল এ জয়ের কারণ নিয়ে শুরু হয়েছে নানারকম বিশ্লেষণ; সামনে আসছে নানা ব্যাখ্যা।

ভারতের অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টের কন্ট্রিবিউটিং এডিটর দ্বীপ হালদার মনে করছেন, বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ জয়ে বাংলাদেশও বড় ভূমিকা রেখেছে।

তার মতে, বাংলাদেশে চব্বিশের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর হিন্দুদের ওপর হওয়া ‘নির্যাতন’ হোক কিংবা বাংলাদেশে শিকড় থাকা মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোট অথবা ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের’ কারণে রাজ্যের জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে যাওয়ার ভয়- সবই কাজ করেছে বিজেপির এই জয়ে।

সোমবার দ্য প্রিন্টে মতামত বিভাগে প্রকাশিত বিশ্লেষণে দ্বীপ হালদার লেখেন, “বিজেপির ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী’ বিষয়ক বয়ানের বিপরীতে স্বতন্ত্র বামপন্থি ঘরানার এ রাজ্যে দীর্ঘকাল ধরে নির্বাচনি আলোচনায় হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণকে যেভাবে আগে দূরে রাখা হয়েছিল, এবার আর সেটি কাজ করেনি।

“মূলত একটি লাল (বামপন্থি) রাজ্যকে গেরুয়া রঙে বদলে দিতে একটি শক্তিশালী গল্পের প্রয়োজন ছিল, যা ব্যালট বক্সের মাধ্যমে এক ধরণের রঙিন বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে।”

পশ্চিমবঙ্গে টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলের কাছে হার মেনে নিতে হয় বামফ্রন্টকে। কিন্তু মমতার অধীনেও পশ্চিমবঙ্গ অনেকাংশেই ‘বামপন্থি’ ভাবধারায় রয়ে গিয়েছিল বলে মত দ্বীপ হালদারের।

তিনি লেখেন, তৃণমূলের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের বিশাল জাল এবং বড় শিল্পের বিপক্ষে থাকার ইতিহাস (২০০৬-২০০৮ সালে টাটা শিল্প গ্রুপের বিরুদ্ধে সিঙ্গুর আন্দোলন এবং ক্ষমতায় থাকাকালীন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নতুন বিনিয়োগ টানতে ব্যর্থ হওয়া) রাজ্যে সাধারণত ‘বামের চেয়েও বেশি বাম’ হিসেবে মমতার দলকে পরিচিত করেছে। আর এটিই ব্যাখ্যা করে যে কেন ৪ মের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে এত বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে বিজেপির এই নির্ণায়ক জয়ের পেছনে একটি বড় কারণ ছিল প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ।

হাসিনার পতন, হিন্দুত্ববাদের উত্থান

মতামতে দ্বীপ হালদার বলছেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের বাইরে হিন্দু সন্ন্যাসী এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে একটি বিশাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। তাদের দাবি ছিল, বাংলাদেশে দীপু চন্দ্র দাসের হত্যার বিচার। ময়মনসিংহের ভালুকায় ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা পোশাক শ্রমিক দীপু দাসকে। তার হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর ‘হামলার খবর’ বিশ্বজুড়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছিল এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

দীপু দাসের হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও হাতাহাতি শুরু হয়। সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের বিরুদ্ধে কড়া অভিযোগ তোলেন। সে সময় এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের কাউকে কাউকে চিৎকার করে বলতে শোনা গেছে- ‘এই পুলিশ রাজ্যের পুলিশ নয়, এরা বাংলাদেশি পুলিশ। এই পুলিশ সন্ন্যাসীদের লাঠি দিয়ে পিটিয়েছে এবং প্রতিবাদী নারীদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেছে’।

বিজেপির যুব শাখা ভারতীয় জনতা যুব মোর্চার (বিজেওয়াইএম) রাজ্য সহ-সভাপতি অরুণ শাহ দ্য প্রিন্টকে বলেন, “কল্পনা করুন, দীপু চন্দ্র দাসকে শুধু হিন্দু হওয়ার কারণে হত্যার প্রতিবাদ করায় কলকাতার বুকে গেরুয়া বসনধারী সন্ন্যাসীদের জনসমক্ষে পেটানো হচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কার পক্ষে ছিলেন? তিনি না ছিলেন বাংলাদেশি হিন্দুদের পক্ষে, না পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের পক্ষে।”

অন্যদিকে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী তৎক্ষণাৎ একটি পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন এবং বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন বন্ধের দাবি জানান। হিন্দু বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশি অ্যাকশন নিয়ে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন।

দ্বীপ হালদার লেখেন, এই ঘটনা শুভেন্দু অধিকারীকে তার ওই বয়ান প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশীর্বাদেই পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় সোয়া কোটি অবৈধ অভিবাসী রয়েছে। দীপু দাসের হত্যা এবং কলকাতায় বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলার অনেক আগেই শুভেন্দু বলেছিলেন, “এবার মুখ্যমন্ত্রীকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। ভুয়া ভোটের ঘটনা কমে যাবে। যারা ভুয়া ভোট দিত তাদের ছেঁটে ফেলা হবে।”

তখন থেকেই বিজেপির মূল বয়ান ছিল, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে হিন্দুরা যেমন ‘নিরাপত্তাহীনতায়’ ভুগছে, তেমনি মুসলমানরা সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করতে পারে এবং ভোটার তালিকায় নাম তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘বিশেষ নির্বাচনি সুবিধা’ দিতে পারে।

মতুয়া ফ্যাক্টর

ঊনবিংশ শতাব্দীতে পূর্ববঙ্গ অধুনা বাংলাদেশ হরিচাঁদ ঠাকুরের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত মতবাদভিত্তিক হিন্দু সামাজিক আন্দোলনের অংশ মতুয়া সম্প্রদায়ও পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন দ্বীপ হালদার।

তিনি বলছেন, “মতুয়ারা পশ্চিমবঙ্গেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি তফশিলি জাতি গোষ্ঠী। বিজেপি নিরলসভাবে মতুয়াদের কাছে টানার চেষ্টা করলেও ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় তাদের অনেকের নাম বাদ পড়ায় ধারণা করা হয়েছিল, তারা বিজেপির বিরুদ্ধে চলে যাবে। কিন্তু তা হয়নি।”

যুক্তরাজ্যের সাসেক্স ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞান বিভাগের ব্রিটিশ একাডেমি ইন্টারন্যাশনাল ফেলো অয়ন গুহ দ্য প্রিন্টকে বলেন, “ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার কারণে মতুয়াদের একটি বড় অংশের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ থাকলেও, দেখা যাচ্ছে তারা এই নির্বাচনে বিজেপিকেই বেছে নিয়েছে। এর প্রধান কারণ বাংলাদেশ।

অয়ন গুহের মতে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মতুয়াদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। তবে এটি স্পষ্ট যে বিজেপিই তাদের প্রথম পছন্দ। কারণ বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পরবর্তী সময়ে হিন্দুদের ওপর ব্যাপক ‘সহিংসতা ও নির্যাতন’ তাদের হিন্দু শরণার্থী হিসেবে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে বলে মনে হচ্ছে।

অয়ন গুহ একে ‘স্মৃতির রাজনীতি’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিজেপির স্মৃতির রাজনীতিকে এক ধরনের গতি দিয়েছে। এটি পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে মতুয়া-নমশূদ্রদের ওপর হওয়া ধর্মীয় নির্যাতনের স্মৃতিকে উসকে দেয়, যাতে তাদের নিম্নবর্ণের গোষ্ঠী হিসেবে নয়, বরং নির্যাতিত হিন্দু শরণার্থী হিসেবে ঐক্যবদ্ধ করা যায়।”

পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া প্রধান এলাকাগুলোতে নিজের মাঠ পর্যায়ের পরিচিতদের কাছ থেকে অবাক করা তথ্য পেয়েছেন বলেও দাবি করেন অয়ন গুহ।

তিনি বলছেন, “মতুয়া সম্প্রদায়ের যাদের নাম বা পরিবারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তারাও বিজেপির নির্বাচনি প্রচারে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে। তাদের আশা, বিজেপি যেহেতু হিন্দুঘেঁষা দল। তাই তারা তাদের নাগরিকত্ব এবং ভোটাধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে।”

হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক মেরুকরণ পশ্চিমবঙ্গের বহুত্ববাদী সমাজে আগে সেভাবে কাজ না করলেও, প্রতিবেশী বাংলাদেশের ঘটনাবলী রাজ্যের রাজনীতিকে একটি বড় মোড় দিয়েছে এবং বিজেপিকে ক্ষমতার স্বাদ পাইয়ে দিয়েছে বলেও লেখায় তুলে ধরেন দীপ হালদার।

Pin It