খুলনায় নদী খননের মাটিতে চাপা পড়ছে শতাধিক গৃহহীনের স্বপ্ন

Screenshot 2026-06-17 041255

বুড়িভদ্রা নদী খননে দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের শতাধিক বাসিন্দা খোলা মাঠে আশ্রয় নিয়েছেন।

খুলনার বুড়িভদ্রা নদী খননের মাটি চাপা পড়েছে ডুমুরিয়া উপজেলার দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের শতাধিক ঘর। সেখানে বসবাস করা পরিবারগুলো এখন উপজেলার চুকনগর বাজারের পাশে গরুর হাটে খোলা মাঠে বসবাস করছেন।

তারা বলছেন, ছোট ছোট দুটি কক্ষ বিশিষ্ট আধাপাকা ঘর আর জমির মালিকানা ছিল বাসিন্দাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। নদী ভাঙন, দারিদ্র্যতা আর ঠিকানাহীন জীবনের অবসান ঘটিয়ে মাথা গোঁজার যে শেষ আশ্রয়স্থল তারা পেয়েছিলেন, আজ তা ধ্বংসের মুখে।

উপজেলার চুকনগর এবং কাঁঠালতলার বরাতিয়া সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প লাগোয়া বুড়িভদ্রা নদী খননের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে এই মানবিক বিপর্যয়ের সূচনা।

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জী বলেন, নদী খননের ৫৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হবে। খননের মাটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর পাশে রাখায় মানুষের যাতায়াতে একটু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এতে কিছু ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার বলেন, ২০২১ সালে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় তিনটি ধাপে ডুমুরিয়ার চুকনগর, বরাতিয়া এবং খর্নিয়া এলাকায় শতাধিক ভূমি ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করে সরকার। তাদের জন্য দুই কক্ষবিশিষ্ট সেমি-পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়।

ভুক্তভোগীরা জানান, বুড়িভদ্রা নদীর চরে চুকনগর অংশে ১৪৫টি এবং কাঁঠালতলার বরাতিয়া অংশে ১২৪টি ঘর নির্মাণ করেছিল সরকার। কিন্তু পাঁচ মাস আগে বুড়িভদ্রা নদী খনন শুরু হওয়ায় চুকনগর অংশে উচ্ছেদ করা হয় ১৪৩টি ঘর। বর্তমানে সেখানে অক্ষত আছে মাত্র দুটি ঘর।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো চুকনগর বাজারের পাশে পুরনো টিন, পলিথিন আর কাপড় দিয়ে বানানো ছোট ছোট ঝুপড়িতে প্রচণ্ড রোদ, কাদা-বৃষ্টির মধ্যেই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে আটলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হেলাল উদ্দীন বলেন, প্রায় এক হাজার মানুষ কয়েক মাস ধরে চুকনগর বাজারের পাশে খোলা একটি মাঠে বাস করছে। সেখানে বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, নিরাপত্তা নেই, খাবারের কষ্টও আছে।

বিষয়টি অনেকবার প্রশাসনকে জানানো হয়েছে দাবি করে হেলাল বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা; কিন্তু চুকনগরে সেই প্রকল্পের বাসিন্দাদেরই এখন খোলা মাঠে আশ্রয় নিতে হয়েছে।

তিনি বলেন, একদিকে নদী খনন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে আশ্রয়হীন মানুষের মানবিক সংকট- দুই বাস্তবতার মাঝখানে আটকে পড়েছে প্রায় এক হাজার মানুষের জীবন। পুনর্বাসনের আশ্বাস মিললেও কবে তারা আবার স্থায়ী ঠিকানায় ফিরতে পারবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।

চুকনগরে উচ্ছেদের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন সংকটে পড়েছেন কাঁঠালতলার বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা। নদী খননের মাটি বাসিন্দাদের ঘরগুলোর পাশে রাখা হয়েছে স্তূপ করে। সেই মাটির চাপেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ১০টি ঘর। বন্ধ হয়েছে বাসিন্দাদের চলাচলের পথ। বর্ষা শুরু হওয়ায় মাটির স্তূপ ঘিরে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদীতে ধসে যাওয়ার হুমকিতে রয়েছে অনেক ঘর।

বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, খননের মাটি একেবারেই নদীর পাড়ে ফেলায় কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে বিশাল স্তূপ; যা বৃষ্টিতে ধুয়ে নামছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের উপর।

পলিমাটিতে অনেক ঘরের পেছনের দেয়াল ও জানালা ভেঙে ভেতরে কাঁদা ঢুকে গেছে। মাটির ভারে ঘরের দেয়াল ও মেঝেতে ফাটল ধরেছে। বেশ কয়েকটি পরিবার ঘরের খাট, হাঁড়ি-পাতিলসহ আসবাবপত্র বাইরে বের করে খোলা আকাশের নিচে রেখেছেন।

কাঁঠালতলার স্থানীয় বাসিন্দা রোজিনা বেগম বলেন, নদী খননের মাটি পাহাড়ের মত উঁচু করে রাখা হয়েছে। এতে বন্ধ হয়েছে বাসিন্দাদের চলাচলের পথ। কয়েক দিন আগে বৃষ্টির সময় সেই মাটি ধসে তিন বছরের এক শিশু চাপা পড়ে। পরে আশপাশের লোকজন উদ্ধার করায় বেঁচে যায়।

বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সি রহিমা বেগম অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, “নদী ভাঙনে সব হারায়ে এইহানে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পাইছিলাম। সরকার ঘর দিছিল। এহন নদীর কাঁদা-মাটি এনে আমাদের ঘরের ওপর ফেলছে। ঘরের দেয়াল চড়চড় করে ফাটতেছে। রাইতে ঘুমাতে পারি না, মনে হয় এই বুঝি মাটি চাপা পড়ে মরে গেলাম।”

খননের সময় মেশিন দিয়ে ঘরের একদম গোড়া পর্যন্ত মাটি কাটা হয় দাবি করে রহিমা বলেন, একটু বৃষ্টি হলেই ঘরগুলো নদীতে ধসে যাবে। মাটির অতিরিক্ত চাপের কারণে ঘরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নিজেরাই মাটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রকল্পের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সি ময়না বেগম বলেন, “প্রচন্ড গরমে ঘরে থাহার উপায় নেই। ঘরে দরজার অংশ ভেঙে গেছে। কাঠামো নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। শিশুদের নিয়ে ঘরে নিরাপদে থাকতি পারতিছি নে। রান্না করার জায়গা নেই। বাথরুম, টিউবওয়েল নষ্ট হয়ে গেছে। ঘরের জিনিসপত্রও সরিয়ে রাখতে হয়ছে।”

পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানা গেছে, খুলনা ও যশোর অঞ্চলে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি নদীর ৮১ দশমিক পাঁচ কিলোমিটার খননকাজ চলছে।

যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জী বলেন, যশোর সদরের আংশিক, অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার ৫৪টি বিলের পানি নিষ্কাশিত হয় শ্রী নদীর ওপর নির্মিত ভবদহ স্লুইস গেইট দিয়ে।

নদীতে পলি পড়ে এলাকার মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদীর বুক উঁচু হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি জমে এলাকার বিলগুলো প্লাবিত হচ্ছে। ২০১৬ সাল থেকে ভবদহ এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে বোরো আবাদ হচ্ছে না। এতে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, এর মধ্যে নদী খননের ৫৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হবে। খননের মাটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর পাশে রাখায় মানুষের যাতায়াতে একটু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। কিছু ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

“প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত পুনর্বাসনে কোনও অর্থ বরাদ্দ নেই। তবে মাটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো মেরামত করে দেওয়া হবে।”

বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে নদী খননের মাটি সরিয়ে নেওয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামতের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন ডুমুরিয়ার ইউএনও সবিতা সরকারও।

চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়ে ইউএনও বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হয়েছে; তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

Pin It