‘অন্তর্বর্তী সরকারের গোপন চুক্তির কারণে রাশিয়ার তেল কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নিতে হচ্ছে’
কম দামের জ্বালানি আমদানির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে, এমন ইঙ্গিত করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করেছে। সেই চুক্তির কারণে বাজার প্রতিযোগিতায় নেই এমন দেশ অর্থাৎ রাশিয়া থেকে কম দামের জ্বালানি আনতে গেলে প্রতিবন্ধকতা হয় কিনা, সেটি এখন সরকারের বিবেচ্য বিষয়। আসলে অর্থনীতির সঙ্গে বিদেশনীতি যুক্ত হয়ে গেছে।
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের অতিরিক্ত অর্থ খরচ করার সুযোগ কম।
দেশের ধারদেনা অনেক বেড়েছে। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যও চাপে রয়েছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বিগত সময় থেকেই দুর্বল। সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি একটা পর্যায়ে রয়ে গেছে, কমছে না।
খাদ্যের মূল্যস্ফীতিও বাড়তি। চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতা আগের আর্থিক দুর্বলতাগুলোকে প্রকট করে তুলেছে।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মেলনকেন্দ্রে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ‘নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের জন্য ভাবনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ আয়োজিত এই ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান, জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী নাজিবা মোহাম্মদ আলতাফ প্রমুখ।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে তিন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এক. তরল জ্বালানিসংকট। দুই. গ্যাসের সংকট। তিন. বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিঘ্ন। এমন পরিস্থিতিতে বাজেটের জন্য অপেক্ষা না করে এখনই সরকারকে অর্থসংস্থানে উদ্যোগী হতে হবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমানে জ্বালানি তেল আমদানিতে সরকার দুই-তিনটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তেল আমদানি বাড়িয়ে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। দাম কম রাখতে কর ও আবগারি শুল্ক কমানো যেতে পারে।
সরকারের ব্যয় কমানোয় জোর দিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ভর্তুকি সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। ভর্তুকির মধ্যে কোনো অন্যায্য আছে কি না, সেটি দেখতে হবে। অর্থাৎ ভর্তুকির সুবিধা দরিদ্র নাকি ধনী মানুষ পাচ্ছে, সেটি দেখা উচিত। নগদ প্রণোদনা দুই-তিন ধাপে কমিয়ে আনতে হবে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পর্যালোচনার জন্য টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, কাজটি এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে করতে হবে। এডিপি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। এটি না করে আগের মতো উন্নয়ন প্রকল্প নিলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না।
সরকারি কলকারখানা লাভজনক করার ওপর জোর দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আয় বাড়াতে হবে। না হলে শ্বেতহস্তীগুলো কেন রাখা হবে। বন্ধ সরকারি কলকারখানাগুলো রাষ্ট্রীয় খাতে চলার মতো অবস্থায় নেই। সেগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়ে দায়দেনা পরিশোধের ব্যবস্থা করা দরকার।
সরকারের হাতে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে বলেছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান প্রথম সরকারি শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিদায়ী সরকারও সেটি করেনি। মূলত আমলারা সরকারি শেয়ার বিক্রি করতে দেন না। অথচ সরকারের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করলে শেয়ারবাজার চাঙা হবে। সরকারের আর্থিক সংকটও কিছুটা ঘুচবে।
রাজস্ব আয়ে অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা না দেওয়ার ওপর জোর দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়, সেটি যে অর্জিত হবে না এনবিআরও জানে। তাই রাজস্ব আয়ের বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। তাতে বাজেটের আকার ছোট হলেও সমস্যা নেই। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষগুলো প্রশ্ন তুলতে পারে, সরকার আয় করতে পারছে না। বিষয়টি বুঝিয়ে বললে ভুল–বোঝাবুঝি হবে না।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কর অবকাশ–সুবিধা বাদ দিতে হবে। কর কমিয়ে করজাল বৃদ্ধি এবং কর আদায়ে ডিজিটালাইজেশন ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সম্পদের ওপর কর বসাতে হবে। এনবিআর দুই ভাগ করার প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করা দরকার। তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে করছাড় কমানো ও সম্পদের ওপর কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। এটি আমরা দেখতে চাই।’
ব্রিফিংয়ে মূল প্রবন্ধে বলা হয়, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টম কর অবকাশ বাবদ ২ লাখ ৭২ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা রাজস্ব হারায় সরকার, যা জিডিপির ৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এ ছাড়া সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি, রপ্তানি, পাটপণ্য এবং প্রবাসী আয়ে ৩২ হাজার ২৩০ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, যা জিডিপির দশমিক ৬০ শতাংশের কাছাকাছি।


