রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বণিক বার্তা কার্যালয়ে গত ২৮ জুলাই ‘বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয় ও টেকসই প্রতিরোধের রূপরেখা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অনলাইনে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার |
ড. এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার
প্রধান অতিথি , মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, স্বাস্থ্যবিষয়ক , স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়
বাংলাদেশে হাম প্রতিরোধে বহু বছর ধরে টিকাদান কর্মসূচি চালু রয়েছে। প্রতি চার বছর পরপর ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকা দেয়া হয়। পাশাপাশি রুটিন টিকাদান কর্মসূচিতেও নয় মাস বয়স থেকে শিশুদের হামের টিকা দেয়া হয়। তবে ২০২০-২১ সালের কভিড পরিস্থিতির কারণে এসব ক্যাম্পেইন বাস্তবায়ন হয়নি বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। এরপর ২০২৩-২৪ সালের ক্যাম্পেইনও বাস্তবায়ন হয়নি। সে সময় স্বাস্থ্য খাতের অর্থায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। অপারেশনাল প্ল্যানের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যায় এবং উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু সেই অর্থ সময়মতো না আসায় প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন কেনা সম্ভব হয়নি। এর ফলে এক বছরের নিচে এবং এক থেকে দুই বছরের মধ্যে থাকা বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। পাশাপাশি মায়ের শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি না থাকলে শিশুও পর্যাপ্ত সুরক্ষা পায় না। দেশে প্রথম হামজনিত মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় চলতি বছরের মার্চে। হামের কারণে যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের অনেকেই মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছিল। অপুষ্টি ও সংক্রমণ একে অপরকে আরো জটিল করে তোলে। তাই এ দুটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। মার্চের মাঝামাঝি প্রথম মৃত্যু শনাক্ত হওয়ার পর ৬ এপ্রিলের মধ্যেই সরকার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে সক্ষম হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন সংগ্রহ, জনবল মোতায়েন এবং দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। প্রথমে ৩০টি উপজেলায় কর্মসূচি শুরু হয়। পরে চারটি বড় শহরে এবং পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য এলাকায় তা সম্প্রসারণ করা হয়। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে। মাত্র চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে প্রায় শতভাগ কাভারেজের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন , নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
দক্ষ ও সুস্থ জনশক্তি ছাড়া কোনো দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই স্বাস্থ্য খাতকে আলাদা করে দেখি, অথচ স্বাস্থ্যই অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকেও (হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট) দেশের অবস্থান ইতিবাচক ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি একসময় বিশ্বজুড়ে সফলতার উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ছন্দপতন দেখা যাচ্ছে। এটি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। স্বাস্থ্য খাতে ধারাবাহিক ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন পরিস্থিতি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। ধারাবাহিকভাবে জাতীয় জিডিপির ১ শতাংশেরও কম এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অনেক সময় পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারে না। ফলে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সেবার মানোন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। উন্নয়নের জন্য অবকাঠামো, হাসপাতাল কিংবা আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি অবশ্যই প্রয়োজন। এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত স্বাস্থ্য খাতের ‘সফট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’-এ; অর্থাৎ দক্ষ চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে। সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে কী ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাব তারই একটি বাস্তব উদাহরণ। এটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কেস স্টাডি হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ শিক্ষা আমাদের অনেক বড় মূল্য দিয়ে অর্জন করতে হচ্ছে।
মঈনুল ইসলাম , স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল অনুবিভাগ) এএনএম
আমাদের হাতে বর্তমানে প্রায় ২২ মাস বা দুই বছরের হামের টিকাদান কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিনের মজুদ ও নিশ্চয়তা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ মাসের টিকা সরাসরি মজুদ আছে এবং আরো পাঁচ মাসের টিকা পাইপলাইনে অর্থাৎ আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এছাড়া আগামী এক বছরের জন্য আমরা বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) করছি। ফলে সব মিলিয়ে প্রায় দুই বছরের জন্য আমাদের ভ্যাকসিন সুরক্ষিত আছে। এছাড়া টিকাদানের ক্ষেত্রে টার্গেট এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে যে ঘাটতি রয়েছে, তা আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। অনেক সময় শহর অঞ্চলের বস্তি এলাকা বা দুর্গম অঞ্চলে আমরা সহজে পৌঁছাতে পারি না। এ কারণে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা ‘মপ-আপ’ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছি। এর মাধ্যমে প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে যাতে একটি শিশুও টিকার আওতার বাইরে না থাকে। গত ২৬ জুলাই থেকে এ ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আমরা থার্ড পার্টির মাধ্যমে এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে ‘ক্রস-চেকিং’ বা তদারকির ব্যবস্থা করেছি। সিভিল সার্জনদের কাছ থেকে যে তথ্যগুলো আসছে সেগুলো যথাযথ কিনা, তা আমাদের মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং ইউনিসেফের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন উপজেলা বা এলাকায় সরাসরি যাচাই করছেন। এছাড়া বর্তমানে গবেষণায় বিশেষ জোর দেয়ার সময় এসেছে। কেন হামের প্রাদুর্ভাব হচ্ছে বা কেন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার পরও রোগী পাওয়া যাচ্ছে—এ কারণগুলো গবেষণার মাধ্যমে চিহ্নিত করে আমাদের পলিসি গ্রহণ করতে হবে। এবার স্বাস্থ্য খাতের বাজেট প্রায় দ্বিগুণ করে ৬৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। আমরা এখন অবকাঠামোর পাশাপাশি গবেষণা ও সেবার মান উন্নয়নের এরিয়াগুলো চিহ্নিত করে প্রজেক্ট নিচ্ছি যাতে বাজেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
ডা. লামিসা রহমান , সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট , ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ , ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়,
নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব কেন দেখা যাচ্ছে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। এ বিষয়ে আমরা সীমিত পরিসরে প্রায় ২৬০ শিশুর ওপর একটি গবেষণা করার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে মায়েরা নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়াননি। অনেক মা মনে করেছেন, শিশুর পর্যাপ্ত দুধ হচ্ছে না। ফলে তারা বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা বিকল্প খাদ্যের ওপর নির্ভর করেছেন। এখানে একটি বড় সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। অনেক মা এখনো জানেন না যে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই। এ বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভ্যাকসিন হেজিট্যান্সি বা টিকা নেয়ার অনীহা। বাংলাদেশে আগে এ ধরনের সমস্যা তেমন ছিল না। এমনকি কভিডের সময়ও অনেক উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের দেশে টিকা গ্রহণের প্রবণতা ভালো ছিল। কিন্তু বর্তমানে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা কিছু উদ্বেগজনক বিষয় লক্ষ করছি।





