ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ওপর বাড়তে থাকা চাপ এবার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও প্রভাব ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক তৎপরতা জোরদার করতে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) রাতে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জর্জ ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাবে এবং সেখানে দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের স্থলাভিষিক্ত হবে।
এর ফলে সাময়িকভাবে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরী থাকবে না।
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সাময়িকভাবে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী না থাকার সুযোগ চীন নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনে কাজে লাগাতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষক ব্রায়ান ক্লার্কের মতে, এই সাময়িক ‘ক্যারিয়ার গ্যাপ’ ব্যবহার করে বেইজিং জাপান, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়াসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর কাছে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারে।
তবে একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী সরিয়ে নেওয়ার কারণে চীন তাইওয়ানে হামলা চালাবে—এমন আশঙ্কা করছেন না বিশেষজ্ঞরা। বরং তাদের মতে, এটি চীনের জন্য সামরিক শক্তি প্রদর্শনের একটি বাড়তি সুযোগ তৈরি করেছে।
আগেই সামরিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে বেইজিং
মার্কিন রণতরী সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা এমন সময়ে ঘটছে, যখন পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের বিভিন্ন বিতর্কিত এলাকায় চীনের সামরিক তৎপরতা বাড়ছে।
চলতি সপ্তাহেই চীন ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে নৌ মহড়া চালিয়েছে। এর আগে জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকাতেও সামরিক তৎপরতা চালিয়েছে চীনা বাহিনী। চলতি মাসে দক্ষিণ চীন সাগরের স্কারবরো শোল এলাকাতেও মহড়া চালিয়েছে চীন। ওই এলাকার মালিকানা নিয়ে চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
গত মাসে চীনের একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার জাপানের দক্ষিণতম দ্বীপ ওকিনোটোরির কাছে লাইভ-ফায়ার মহড়াও চালায়।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, অঞ্চল ছাড়ছে না
তবে জর্জ ওয়াশিংটনকে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে সরিয়ে নেওয়ার অর্থ এই অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহার নয়—মিত্রদের এমন আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ফ্র্যাঙ্ক ব্র্যাডলি ফিলিপাইনের কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, যৌথ সামরিক মহড়া আরও বাড়ানোর জন্য মার্কিন বিশেষ বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। তিনি জাপান সফরও করবেন বলে জানা গেছে।
তবে কাতো ইনস্টিটিউটের চীনবিষয়ক নীতি বিশ্লেষক ইভান স্যাঙ্কির মতে, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরী না থাকা এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ওয়াশিংটন অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
২৬৬ দিন সমুদ্রে থাকার পর ফিরছে আব্রাহাম লিংকন
জর্জ ওয়াশিংটনকে সরিয়ে নেওয়ার অন্যতম কারণ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিংকন ২৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে মোতায়েন রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত প্রায় ২৬৬ দিন সমুদ্রে থাকার পর দেশে ফিরতে পারে।
দীর্ঘ সময়ের এই মোতায়েন নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতা ও নৌসেনাদের পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাহাজে খাবার ও অন্যান্য সরবরাহ, পানি ও প্লাম্বিং ব্যবস্থা, ডাক যোগাযোগ এবং নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে।
কিছু প্রতিবেদনে দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের কারণে কয়েকজন নাবিকের আত্মহত্যার চেষ্টা করার অভিযোগও উঠে এসেছে। তবে পেন্টাগন এসব প্রতিবেদনের কিছু অংশের বিরোধিতা করেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, লিংকনের খারাপ পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত কিছু তথ্য ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’। মার্কিন নৌবাহিনীও নাবিকদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে—এমন দাবি অস্বীকার করেছে।
দীর্ঘ যুদ্ধ, বাড়ছে রক্ষণাবেক্ষণের চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর হাতে মোট ১১টি বিমানবাহী রণতরী রয়েছে। তবে একই সময়ে সবগুলোকে মোতায়েন করা সম্ভব হয় না। কিছু রণতরী রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ অথবা ভবিষ্যৎ মোতায়েনের প্রস্তুতিতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকা রণতরীগুলো দেশে ফেরার পর বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হবে। এতে ভবিষ্যতে মার্কিন নৌবাহিনীর রণতরী মোতায়েনে ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের বিমানবাহী রণতরী রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা থাকা শিপইয়ার্ডের সংখ্যাও মাত্র দুটি। ফলে একাধিক রণতরী একসঙ্গে ফিরে এলে রক্ষণাবেক্ষণের কাজের চাপ ও জট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভবিষ্যতে বড় রণতরী কতটা কার্যকর?
এই পরিস্থিতি মার্কিন প্রতিরক্ষা মহলে পুরোনো একটি প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে-ড্রোন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও আধুনিক অ্যান্টি-শিপ অস্ত্রের যুগে যুক্তরাষ্ট্রের কি এত বড় ও ব্যয়বহুল বিমানবাহী রণতরীর ওপর আগের মতো নির্ভর করা উচিত?
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের গবেষক মাইকেল সোয়াইন মনে করেন, চীনের মতো প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিমানবাহী রণতরী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের কাছে ক্রমেই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তার মতে, ছোট যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন এবং অন্যান্য সামরিক ব্যবস্থা তুলনামূলক কম ঝুঁকি নিয়ে একই ধরনের কিছু সক্ষমতা দিতে পারে।
তবে আপাতত মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য বিমানবাহী রণতরী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর ইরান যুদ্ধ ওয়াশিংটনকে এসব রণতরী বিশ্বের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সরিয়ে নিতে বাধ্য করছে। এর ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলটি আপাতত কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ছাড়াই থাকছে।




