যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় কাটছে জ্বালানি আতঙ্ক

1775676693-5872c90063d45931424f88c2651ef574

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শর্তসাপেক্ষে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এই চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দিয়েছে।

ফলে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি তেলের আতঙ্ক কমবে এবং নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, এই খবরে তাৎক্ষণিকভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও স্থিতিশীলতা আনতে পারে।

পারস্য উপসাগরে আটকা পড়া বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ ইতোমধ্যেই হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধবিরতির পর জাহাজটি নোঙর তুলে গন্তব্যের পথে অগ্রসর হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুদ্ধবিরতির খবরে ইতোমধ্যেই তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। শেয়ারবাজারের সূচকে উত্থান হয়েছে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম অন্তত ১৫ শতাংশ কমেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১৫.৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯২ ডলার ৩০ সেন্টে নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্রে লেনদেন হওয়া তেলের দাম প্রায় ১৬.৫ শতাংশ কমে ৯৩ ডলার ৮০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালী প্রায় বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ে। একপর্যায়ে তা ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলারে উঠে যায়। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বেড়ে যায় জ্বালানি ব্যয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম বলেন, আমরা দেখেছি যখন যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হবে মনে হচ্ছিল, তখন ক্রুড অয়েলের দাম কীভাবে বাড়ছিল। এখন আবার যুদ্ধবিরতির খবরে দ্রুতই দাম কমতে শুরু করেছে। এর প্রভাব দেশের বাজারেও পড়বে। বিশেষ করে আতঙ্কিত জনগণ এবার হয়তো কিছুটা আশ্বস্ত হবে। আসলে এখন এলএনজি ও তেল আমদানির ক্ষেত্রে শিপিং খরচ কমবে পাশাপাশি কমবে ইন্সুরেন্স খরচও। যুদ্ধ বন্ধের কারণে ঝুঁকি বা রিস্ক ফ্যাক্টর অনেখানি কমে গেল। তবে ডিজেলের বাজার, বিশেষ করে সিঙ্গাপুরে কিন্তু এখনো দাম কমেনি। সুতরাং সরকারকে অবশ্যই সিঙ্গাপুরের বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে। এরই মধ্যে ভারত থেকে ডিজেল আসা শুরু হয়েছে। এক্ষেত্রে কাজাখস্তানসহ আরও কয়েকটি দেশের কথা চিন্তা করা যেতে পারে, যাদের কাছ থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে ডিজেল কেনা সম্ভব।

অন্যদিকে কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির কয়েকটি এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে যে ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে, সে প্রসঙ্গে এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলছেন, তাদের কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হতে হয়তো কিছুটা সময় লাগবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) এক কর্মকর্তা বলেন, ক্রমাগত বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার পরও দেশের বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায়নি সরকার। অসাধু মহলের ধারণা ছিল যুদ্ধ দীর্ঘয়িত হবে এবং সরকার ভর্তুকি না বাড়িয়ে দাম বাড়াতে বাধ্য হবে। কিন্তু যুদ্ধবিরতির কারণে তাদের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেল বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা। এখন তাদের পক্ষে আর মজুত করা তেল ধরে রাখা সম্ভব হবে না। কারণ এখন বিশ্ব বাজারেই দাম নিম্নমুখী। তাই দেশের বাজারে দাম বাড়ার আপাতত কোনো সম্ভাবনা নেই।

এদিকে যুদ্ধবিরতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে কী ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম বলেন, এখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি সম্পর্কিত যে চুক্তি রয়েছে, সে অনুযায়ী পণ্য আসতে আর কোনো বাধা রইল না। ফলে আপাতত জ্বালানি নিয়ে জনমনে আর কোনো আতঙ্ক থাকবে না।

এ ছাড়া আমদানি রপ্তানি সম্পর্কিত অনিশ্চয়তাও কাটল। ফলে দেশের অভ্যন্তরে পণ্য সরবরাহ ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক হবে বলেও মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ আর কোনো কারসাজি না থাকলে দ্রব্যমূল্যও আপাতত স্থিতিশীল থাকবে।

পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব মীর আহসান পারভেজ বলেন, যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় জ্বালানি তেল মজুত করার প্রবণতা কমবে এবং জনগণের মধ্যে আতঙ্ক কমবে। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে।

তিনি বলেন, গত বছর মার্চে আমরা যে পরিমাণ তেল ডিপো থেকে নিয়েছিলাম, এবার ১৫ দিনেই সেই পরিমাণ তেল নিয়েছি। সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। দেখা যাচ্ছে, সংকট অনেকটাই কৃত্রিম।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির খবরে প্রশাসনে শিথিলতা এড়াতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এটি অপরিহার্য।

প্রসঙ্গত, শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা স্তিমিত হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এর মাধ্যমে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা ইরান যুদ্ধের অবসান আশা করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে ইরানকে সময় বেঁধে দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সময় শেষ হওয়ার আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানালেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে।

Pin It