বহু আশা জাগিয়ে শুরু হচ্ছে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার কাজ

Screenshot 2026-07-27 212622

সিইআইজেড নিয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয় ২০১৬ সালে, কিন্তু একনেক পার হয় এক দশক পর; গত ১৬ জুন।

সমঝোতার এক দশকের মাথায় চট্টগ্রামের আনোয়ারায় শুরু হতে যাচ্ছে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে শিল্পায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি চট্টগ্রাম একটি শিল্প ও পণ্য আনা-নেওয়ার প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।

কারো কারো মতে, ‘চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ (সিইআইজেড) প্রতিষ্ঠা হলে কর্ণফুলীর তলদেশে নির্মিত টানেলের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। সেই সঙ্গে নদীর দক্ষিণ পাড়ে শিল্পায়ন ও নগরায়নে বড় ভূমিকা রাখবে এই প্রকল্প।

এই শিল্প জোনে বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি, অবকাঠামো ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া আরো সহজ করার আহ্বানও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

সোমবার সকালে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় প্রস্তাবিত সিইআইজেডের উন্নয়ন কাজ উদ্বোধন হবে।

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটির (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের উপস্থিত থাকার কথা।

২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে আলোচনা ও দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। তবে গত এক দশক নানা জটিলতায় ঝুলে ছিল প্রকল্প।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের আগে গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সরকারি পর্যায়ে প্রায় ৭৮৩ একর জমিতে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

এর মধ্যে সরকারের নিজের অর্থায়ন থেকে ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা, আর বাকি ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা ঋণ দেবে চীন। ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার কথা রয়েছে।

বেজা বলেছে, এ প্রকল্পের আওতায় শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। এরমধ্যে আছে আধুনিক সড়ক, বহুমুখী জেটি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ, সিইটিপি, পানি সংরক্ষণাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধাসহ বিশ্বমানের শিল্প অবকাঠামো।

প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক সড়ক, ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক, ২০ হাজার ৩০৪ ঘনমিটার ধারণ ক্ষমতার পানি সংরক্ষণাগার, ৪ দশমিক ২৪ এমএমসিএফডি ক্ষমতার গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন ও ‘ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন’, ২৫ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন ‘সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’, ২০ হাজার টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, ৬০ টন দৈনিক সক্ষমতার ‘সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন’, প্রায় ১২ কিলোমিটার সীমানা দেয়াল এবং দুটি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন নির্মাণ করা হবে।

বেজা বলছে, “প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি লোকের কর্মসংস্থান হবে এবং কমপক্ষে ৫০ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আনা সম্ভব হবে।”

জানতে চাইলে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা একটা বিরাট সূচনা। এই শিল্প জোন হলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে কাছের ইকোনমিক জোন হবে এটি। কর্ণফুলী টানেল পার হলেই আনোয়ারায় এই শিল্প জোনের অবস্থান। এতে টানেলের উপযোগিতা অনেক গুণ বাড়বে।

“কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম বন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় এর অবস্থানগত গুরুত্ব হবে অপরিসীম। কারণ পরিবহন ও লজিস্টিকস সংযোগের দিক থেকে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে এই শিল্প জোন।”

ব্যবসায়ী নেতা আমিরুল হক বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, সরকার সেখানে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে। এখানকার কাজে কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকতে পারবে না।

“বিনিয়োগ প্রক্রিয়া এবং কাস্টমসের সেবা হতে হবে সহজ এবং দ্রুত গতির। পাশাপাশি জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবশ্যই বিনিয়োগ উপযোগী রাখতে হবে।”

এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য অংশীদারত্ব শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেও মন্তব্য করেন আমিরুল হক।

বেজার ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, এই শিল্প জোনে রাসায়নিক, অটোমোবাইল, গার্মেন্টস ও ওষুধ শিল্পসহ রপ্তানিমুখী বিভিন্ন শিল্প কারখানা হবে।

ইন্টারন্যাশনার বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রামের সভাপতি এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চাইনিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প জোন অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। তবে এখান থেকে বাংলাদেশে প্রকৃত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

“কোন শিল্প খাতে বিনিয়োগ হবে, সেটার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। টেক্সটাইল, কেমিক্যাল, এক্সেসরিজ এবং ভারি শিল্পের কারখানা হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে। কিন্তু এখানেও শুধু আরো কিছু গার্মেন্টস হলে সেটা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তেমন কার্যকর বিনিয়োগ হবে না।”

শিল্প জোন স্থাপনের এ উদ্যোগকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পর্যটন ও কর্ণফুলীর অপর পাড়ের নগরায়নের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বলে মনে করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।

এস এম আবু তৈয়ব বলেন, “এই শিল্প জোন হলে নদীর ওপারে নগরায়ন হবে। পর্যটন শিল্প বিকশিত হবে এবং আনোয়ারায় আবাসিক এলাকা গড়ে উঠবে।

“কর্ণফুলী টানেলটি করাই হয়েছিল টেকনাফ সামনে রেখে। যেহেতু দক্ষিণ চট্টগ্রামে এখনো তেমন শিল্প কারখানা নেই। আমি খুবই আশাবাদী এই চীনা ইকোনমিক জোনের মাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পায়নের সূচনা হবে।”

বেজার তথ্য মতে, চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলটি হবে প্রথম বিশেষায়িত জি-টু-জি অর্থনৈতিক অঞ্চল।

এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ১৮ কিলোমিটার এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

Pin It