ছাত্রনেতা থেকে ‘মহামান্য’

Untitled-3-672def7a74b32-6a7e3a00ef8c7

তৃণমূল থেকে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুরুটা ছাত্র রাজনীতি দিয়ে, অতঃপর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে বিএনপির মহাসচিব থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার দ্বারপ্রান্তে তিনি।

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বৃহস্পতিবার বিএনপির প্রার্থী হিসাবে তার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ বিএনপির প্রার্থী হিসাবেই নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল। সেক্ষেত্রে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হবেন তিনি। আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা রয়েছে।

ছাত্রজীবনের বামপন্থি রাজনীতি থেকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির শীর্ষে উঠে আসা মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন নানা বাঁকবদলে সমৃদ্ধ। শিক্ষকতা করেছেন। সরকারি চাকরিও করেছেন। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন। মন্ত্রী হয়েছেন। আর দীর্ঘ দেড় দশক ধরে সামলেছেন বিএনপির মহাসচিবের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের মতে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একজন ভদ্র রাজনীতিবিদ ও সজ্জন ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত।

আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের সামনের সারিতে ছিলেন তিনি। দলের সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে দেশের ভেতরে দলকে সংগঠিত রাখার বড় দায়িত্বও ছিল তার কাঁধে। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকার স্বীকৃতি হিসাবেই রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নকে দেখছেন বিএনপির নেতারা।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ী এলাকায় জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য হওয়ার পাশাপাশি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ-সদস্যও ছিলেন। এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভায়ও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

বাবার রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পথচলা ছিল ভিন্নধারায়।

ঠাকুরগাঁওয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পড়াশোনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই যুক্ত হন মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর প্রতি অনুরক্ত বামপন্থি ছাত্র রাজনীতিতে।

পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ইউনিটের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। পরে সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতিও হন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকার কারণে কারাবরণও করতে হয় তাকে। জাতীয় রাজনীতিতে মির্জা ফখরুলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) মাধ্যমে।

সহপাঠীদের কাছে মির্জা ফখরুল ছিলেন মেধাবী ও সক্রিয় ছাত্রনেতা। পড়াশোনার পাশাপাশি রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেও অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ১৯৭২ সালে শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।

সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপপরিচালক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। কাজ করেন ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে।

১৯৭৯ সালের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারী এ.টির ব্যক্তিগত সচিব হিসাবে যোগ দেন। সরকারি চাকরি ছেড়ে ১৯৮৬ সালে পুরোপুরি রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন।

দুই বছর পর ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। স্থানীয় রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি।

১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। এরপর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান তিনি। ২০১৬ সালে দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর থেকে ২০২৬ সালের ১৩ আগস্ট পর্যন্ত টানা ১৫ বছর এ পদে দায়িত্ব পালন করছেন মির্জা ফখরুল। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে ওঠার আগে দলের কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সঙ্গেও দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন তিনি। সংগঠনটির প্রথম সহসভাপতি ও পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই বিএনপিকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে মামলা, গ্রেফতার ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে দলটির নেতাকর্মীদের। এই সময়ে দলের মাঠের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর এবং তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করায় দেশের ভেতরে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ সামলাতে হয়েছে তাকে। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনেও সামনের সারিতে ছিলেন তিনি। ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে তার বিরুদ্ধে ১১১টি মামলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে ছয়বার তিনি কারাবরণ করেছেন। তবু দলের নেতৃত্ব থেকে সরে যাননি।

দলের দুই শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতিতে দীর্ঘ সময় বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুলই ছিলেন অন্যতম প্রধান মুখ।

বিএনপিতে যোগ দেওয়ার প্রায় এক দশক পর ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারে কৃষি এবং বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হন। বগুড়া-৬ থেকে নির্বাচিত হলেও নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ নেননি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশের আসনটিও ছিল তার।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মির্জা ফখরুলের অন্যতম বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে তার পরিমিত বক্তব্য ও অপেক্ষাকৃত নমনীয় রাজনৈতিক আচরণ। দলীয় রাজনীতিতে কঠোর অবস্থান নিলেও ব্যক্তিগত আচরণে বিভিন্ন মহলে তিনি ‘সজ্জন’ রাজনীতিক হিসাবে পরিচিত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যেও তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার কথা প্রায়ই আলোচনায় আসে।

বিএনপির নেতাদের মতে, দীর্ঘদিন দলের কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দেওয়া, আন্দোলন সংগঠিত করা এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার স্বীকৃতি হিসাবেই রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। মির্জা ফখরুলের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তাদের দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।

বড় মেয়ে শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। পরে শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্টডক্টরাল গবেষণায় যুক্ত। ছোট মেয়ে সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। বর্তমানে তিনিও শিক্ষকতা করছেন। মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতা। তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন।

পরিবারের রাজনৈতিক পরিসরও বিস্তৃত। চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। জিয়াউর রহমান সরকারের ভূমিমন্ত্রী এবং খালেদা জিয়া সরকারের আইনমন্ত্রী হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যুক্ত। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম তদারকিতেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মির্জা ফখরুলের ভগিনীপতি লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান এবং জাতীয় সংসদের সদস্য।

ছাত্র রাজনীতি থেকে শিক্ষকতা। সরকারি চাকরি থেকে স্থানীয় সরকার। সেখান থেকে জাতীয় রাজনীতি। সংসদ-সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং মহাসচিব দীর্ঘ এই পথ পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার অপেক্ষায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজনৈতিক জীবনের প্রায় পাঁচ দশকের নানা অভিজ্ঞতা এবার তাকে নিয়ে যাচ্ছে বঙ্গভবনে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০ আগস্ট ভোটের পর ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি’ হিসাবেই নতুন অধ্যায় শুরু হবে বিএনপির এই প্রবীণ নেতার।

Pin It