বয়স বৃদ্ধি একটা কারণ। তবে নানান অভ্যাসেও ঠোঁটের আকারে পরিবর্তন আসতে পারে।
বার্ধক্যের সঙ্গে ত্বকে বলিরেখা পড়া বা চামড়া কুঁচকে যাওয়া স্বাভাবিক এবং দৃশ্যমান প্রক্রিয়া। তবে অনেকেই খেয়াল করেন না যে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটের প্রাকৃতিক গঠন ওলটপালট হয়ে যায়।
যৌবনের ভরাট ও সুনির্দিষ্ট ঠোঁট বার্ধক্যে এসে অনেকটাই পাতলা, চ্যাপ্টা এবং ঝুলে পড়ে। অনেকেই একে সাধারণ ঠোঁটের শুষ্কতা মনে করে অবহেলা করেন, যা মূলত মুখের অভ্যন্তরীণ হাড়, চর্বি ও প্রোটিন ক্ষয়ের একটি স্বাভাবিক শারীরিক পরিণতি।
তবে হেল্থ ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ফ্লোরিডার স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষক লিন্ডসে কার্টিস বলেন “বয়স বৃদ্ধি ছাড়াও ঠোঁট দিন দিন ছোট ও আকার হারাতে পারে। আর এজন্য নানান অভ্যাসও দায়ী।”
কোলাজেন ও ইলাস্টিন প্রোটিনের ঘাটতি
বয়স ২০ পার হওয়ার পর থেকেই শরীর প্রাকৃতিকভাবে দুটি জরুরি প্রোটিন উৎপাদন কমিয়ে দেয়, একটি হল কোলাজেন এবং অন্যটি ইলাস্টিন।
কোলাজেন: এটি ত্বকের ভেতরের দৃঢ়তা এবং সুনির্দিষ্ট কাঠামো ধরে রাখে। প্রতি বছর শরীর থেকে প্রায় ১ শতাংশ হারে কোলাজেন কমতে শুরু করে। নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজ বা স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হওয়ার প্রথম ৫ বছরে এই প্রোটিন ক্ষয়ের গতি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।
ইলাস্টিন: এটি ঠোঁটের টিস্যুগুলোকে স্থিতিস্থাপকতা বা টানটানভাব ধরে রাখতে সাহায্য করে। এই দুই প্রোটিনের অভাবে ঠোঁটের ভরাটভাব প্রাকৃতিকভাবেই কমে যায় এবং ঠোঁটের চারপাশে সূক্ষ্ম বলিরেখা বা ‘স্মাইল লাইন’ দেখা দেয়।
চোয়াল ও মুখের হাড়ের ক্ষয়
বার্ধক্য কেবল চামড়ার ওপর প্রভাব ফেলে না, এটি মুখের ভেতরের হাড়ের কাঠামোও বদলে দেয়।
হাড়ের সংকোচন: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চোয়াল এবং মুখের হাড়গুলো প্রাকৃতিকভাবে খনিজ উপাদান হারিয়ে কিছুটা সংকুচিত হয়ে ভেতরের দিকে বা ক্ষয়ে যেতে শুরু করে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘বোন রিসোর্পশন’ বলা হয়।
হাড়ের এই অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে ঠোঁটের চারপাশের নরম কোষগুলো, তাদের ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। যে কারণে ঠোঁট প্রাকৃতিকভাবেই অনেক বেশি পাতলা, চ্যাপ্টা বা ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া দেখায়।।
মুখমণ্ডলের ‘ফ্যাট প্যাড’ ছোট হওয়া
মুখের ত্বকের ঠিক নিচে ছোট ছোট চর্বির পকেট বা ‘ফ্যাট প্যাড’ থাকে, যা মুখমণ্ডল ও ঠোঁটকে গোলগাল, মসৃণ ও ফোলা বা ‘প্লাম্প’ রাখতে সাহায্য করে।
বার্ধক্যে মধ্যাকর্ষণ শক্তি এবং হাড়ের ক্ষয়ের কারণে এই ‘ফ্যাট প্যাড’গুলো আকারে অনেক ছোট হয়ে যায় এবং নিচের দিকে নেমে আসে।
এই অভ্যন্তরীণ ফ্যাট বা চর্বির কুশনটি নষ্ট হওয়ার কারণে ঠোঁটের সুনির্দিষ্ট বর্ডার বা রেখাটি ঝাপসা হয়ে যায়। আর ঠোঁট অনেক বেশি পাতলা দেখায়।
মুখের পেশির দুর্বলতা ও পুনরাবৃত্তিমূলক নড়াচড়া
ঠোঁটকে ঘিরে থাকা প্রধান গোলাকার পেশিকে বলা হয় ‘অরবিচুলারিস ওরিস’
পেশির অবক্ষয়: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পেশির তন্তু বা আঁশগুলো প্রাকৃতিকভাবে ছোট ও দুর্বল হয়ে পড়ে, যা ঠোঁটকে পাতলা দেখায়।
পুনরাবৃত্তিমূলক গতি: প্রতিদিন কথা বলা, হাসা, ধূমপান করা কিংবা স্ট্র দিয়ে তরল বা পানি পানের সময় ঠোঁট যে বারবার গোল করা হয়, সেই নড়াচড়ার কারণে ঠোঁটের চামড়ায় গভীর খাঁজ বা স্থায়ী বলিরেখা তৈরি হয়।
ঠোঁট বুড়িয়ে যাওয়ার গতি বাড়ে যেসব অভ্যাসে
ধূমপান: ধূমপান ত্বকের রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দেয় এবং কোলাজেন ধ্বংস করে দেয়, যা ঠোঁটের চারপাশের চামড়াকে কাগজের মতো পাতলা করে ফেলে।
সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি: ঠোঁটের ওপর কড়া রোদ লাগলে, কোলাজেন ও ইলাস্টিন তন্তুগুলোকে সরাসরি পুড়িয়ে দেয়।
পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেইশন: ঠোঁটে প্রাকৃতিকভাবে তেল গ্রন্থি না থাকায় এটি খুব দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে, যা ঠোঁটের আর্দ্রতা ও ভরাট ভাব কেড়ে নেয়।
অপুষ্টি ও অতিরিক্ত চিনি: অতিরিক্ত ফ্যাট বা চর্বি এবং চিনিযুক্ত খাবার গ্রহণে শরীরের কোষে প্রদাহ তৈরি হয়, যা বার্ধক্যের গতি ত্বরান্বিত করে।
ঠোঁটের তারুণ্য ধরে রাখার ঘরোয়া নিয়ম
এসপিএফ যুক্ত লিপবাম: কড়া রোদ থেকে বাঁচতে প্রতিদিন বাইরে বের হওয়ার আগে অবশ্যই এসপিএফ (SPF) বা সূর্য সুরক্ষা সমৃদ্ধ লিপবাম ব্যবহার করা উচিত।
হায়ালুরোনিক অ্যাসিডের আর্দ্রতা: ঠোঁট আর্দ্র রাখতে হায়ালুরোনিক অ্যাসিড যুক্ত ‘ময়েশ্চারাইজিং লিপ কেয়ার প্রোডাক্ট’ ব্যবহার করা উপকারী।
পর্যাপ্ত পানি পান: ঠোঁটের ভেতরের কোষগুলোর সতেজতা বজায় রাখতে এবং শুষ্কতা দূর করতে সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।
স্ট্র পরিহার ও ধূমপান বর্জন: ঠোঁট গোল করার পুনরাবৃত্তিমূলক গতি এড়াতে স্ট্র দিয়ে পানি বা ড্রিংকস পান বন্ধ করা এবং ধূমপান পুরোপুরি বর্জন করা উচিত।





